২০১৪ সালে এলিজাবেথ বয়েডের যখন ব্রেকআপ হলো, তিনি ঠিক করলেন তার প্রাক্তন প্রেমিককে নিজের সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল থেকে ব্লক করবেন। কেননা ব্রেকআপের পর প্রাক্তনের সকল পোস্টই তাকে অনেক যন্ত্রণা দিচ্ছিল, এবং তিনি চাচ্ছিলেন এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। তাই তিনি একে একে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টুইটার থেকে ব্লক করে দেন প্রাক্তনকে।

এরপরও প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে। অবশেষে বয়েডের বোধোদয় হলো যে এখনো একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিন্তু রয়েই গেছে, যেটির কথা তিনি ভুলে গিয়েছেন। তিনি লগ ইন করলেন তার লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্টে, এবং দেখতে পেলেন তার প্রাক্তন সবে নতুন একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছে।

“একটি নোটিফিকেশন পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি তাকে সেখান থেকে ব্লক করিনি,” বলছিলেন বয়েড। “ওই পর্যায়ে আমি ইতিমধ্যেই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ভুলে জীবনে মুভ অন করেছি। কিন্তু হ্যাঁ, এরপরও তাকে একটু স্টক করার সুযোগটা আমি একদমই হাতছাড়া করিনি!”

ব্রেকআপের পর প্রাক্তনকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক করে দেয়া খুবই স্বাভাবিক একটি প্রবণতা; Image Source: Highsnobiety

এই যে বয়েডের ডিজিটাল ব্রেকআপ এবং সেখান থেকে লিঙ্কডইনের বাদ পড়ে যাওয়া, এটি কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং চলতি শতকের প্রযুক্তি নির্ভর দম্পতিদের অধিকাংশের বেলায়ই এমন নজির দেখা যায়। তারা বিচ্ছেদের পর নিজেদের প্রাক্তনকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার কিংবা স্ন্যাপচ্যাট থেকে ব্লক করে দিলেও, ব্রেকআপ-প্রুফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে রয়ে যায় লিঙ্কডইন।

বয়েডের মতো অনেকের ক্ষেত্রেই যেটি হয়, তারা স্রেফ ভুলে যায় লিঙ্কডইনের কথা। কারন এটি তো আর দশটা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়। এটি মূলত পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেয়া একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ২০১৬ সালে যেটিকে ২৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে নিজের করে নেয় মাইক্রোসফট।

২০১৬ থেকে মাইক্রোসফটের অধীনে রয়েছে লিঙ্কডইন; Image Source: Getty Images

এছাড়া এমন আরো অনেকে আছে, যাদের কাছে লিঙ্কডইন থেকে তাদের প্রাক্তনকে ব্লক না করা একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো লিঙ্কডইনে ব্যক্তিগত কনটেন্ট শেয়ার দেয়ার ক্ষেত্রে থাকা সীমাবদ্ধতা। অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেখানে প্রাক্তন কী করছে, কী ভাবছে, কাদের সাথে ঘুরছে এই সমস্ত কিছুই নতুন নতুন স্ট্যাটাস আপডেট কিংবা ছবি-ভিডিও’র মাধ্যমে দেখা যায়, লিঙ্কডইনে তা সম্ভব হয় না। তাই বয়েড যে যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে তার প্রাক্তনকে অন্য সব জায়গা থেকে ব্লক করেছিলেন, লিঙ্কডইনের বেলায় সেটি খাটে না।

“প্রাক্তনেরা কী করছে না করছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেগুলো দেখাটা খুবই কঠিন। কিন্তু লিঙ্কডইন একেবারেই ব্যতিক্রম। এখানে আপনার প্রতি মুহূর্তের আপডেট পাওয়া যাবে না,” বলছিলেন ২৪ বছর বয়সী যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অ্যাবি হোমার। তার ভাষ্যমতে, অনেক দিন যাবত প্রেম করার পর যখন তার প্রেমিকের সাথে ব্রেকআপ হলো, সেই প্রেমিকও তাকে অন্য সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছিল, ব্যতিক্রম কেবল লিঙ্কডইন। “কারণ আপনি এখানে কেবলই কিছু নির্দিষ্ট মাইলফলক দেখতে পাবেন।”

এছাড়াও প্রাক্তনকে লিঙ্কডইন প্রোফাইল থেকে ব্লক না করার পেছনে আরো বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে বলেও মনে করেন ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিদ্যার অধ্যাপক কেলি ক্যাম্পবেল। তার মতে, প্রাক্তনের সাথে লিঙ্কডইনে যুক্ত থাকার মানে তাকে এই সংকেত দেয়া যে, তারা আর আপনার ব্যক্তিজীবনের অংশ নয়।

ড. কেলি ক্যাম্পবেল; Image Source: Twitter

“একটি পেশাদার সাইটে কনট্যাক্ট হিসেবে প্রাক্তনকে রাখার মাধ্যমে আপনি তাকে এ বার্তা পাঠাচ্ছেন যে এভাবেই তাকে আপনি দেখেন। তাদের সাথে আপনার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই, রয়েছে কেবল পেশাদার সম্পর্ক।”

তবে সকল প্রেমিক-প্রেমিকাই যে এমন, তা কিন্তু নয়। কিছু প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের লিঙ্কডইন প্রোফাইল থেকেও তাদের প্রাক্তনকে ব্লক করে দেয়। এমনই একজন হলেন নিউ ইয়র্কের অধিবাসী মায়া নিমনিশট। বিচ্ছেদের পরও বেশ কয়েক বছর তিনি তার প্রাক্তনকে ব্লক করেননি।

কিন্তু একবার যখন তিনি একটি প্রমোশনের জন্য তার লিঙ্কডইন আপডেট করলেন, তখন তিনি আবিষ্কার করলেন যে তার প্রাক্তন তার প্রোফাইলটি ঘুরে দেখেছে। তখন তিনি আরো একটি বিষয় উপলব্ধি করলেন যে, প্রাক্তনের সাথে তো তিনি সরাসরি যুক্ত নেই লিঙ্কডইনে। তার মানে তার প্রাক্তন নির্ঘাৎ তাকে স্টক করে। তাই আর দেরি না করে তিনি প্রাক্তনকে ব্লক করে দেন।

এর কারণটা নিমনিশটের কাছে খুবই সোজাসাপটা। “যদি আপনার এমন ধরনেরই ব্রেকআপ হয় যে প্রাক্তনকে আপনি সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ব্লক করে দিতে বাধ্য হবেন, তাহলে আমার মনে হয় না এমনটি ঘটবে যে তার পেশাদার জীবনের সাফল্য দেখে আপনি হাততালি দেবেন।”

লিঙ্কডইনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে এগিয়ে রাখা হয় পেশাদারিত্বকে; Image Source: Linkedin

ব্রেকআপের প্রভাব লিঙ্কডইনে না পড়ার পেছনে আরো একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে লিঙ্কডইনে ব্লক করার ফিচারটি অনেক দেরিতে আসা। যদিও লিঙ্কডইন চালু হয়েছে সেই ২০০৩ সালে, এমনকি ফেসবুক, টুইটার ও স্ন্যাপচ্যাটেরও আগে, তারা ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত ব্লক ফিচারটি যোগ করেনি। তা-ও সেটি তারা করেছিল প্রচুর সমালোচনার শিকার হবার পর।

কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এ ফিচারটি খুবই কাজে এসেছে। যেমন কেডেন রিড। ২৭ বছর বয়সী এই সরকারী কর্মকর্তা ২০১৭ সালে বাধ্য হয়েছিলেন এ ফিচারটি ব্যবহার করতে। ওই মুহুর্তে তিনি ডেট করছিলেন এমন এক নারীর প্রাক্তন প্রেমিক তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে স্টক করছিল এবং বিভিন্নভাবে তাকে হেনস্তাও করছিল। এ তালিকা থেকে বাদ যায়নি লিঙ্কডইনও। তাই অগত্যা রিড লিঙ্কডইনেও ওই ব্যক্তিকে ব্লক করে দেন।

ব্রেকআপের পরও লিঙ্কডইনে যুক্ত থাকার কিছু উপকারিতাও রয়েছে; Image Source: Sheen Magazine

তবে যারা তাদের প্রাক্তনের সাথে লিঙ্কডইনে যুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তারা কিন্তু বিভিন্ন পেশাদার ক্ষেত্রে লাভবানও হতে পারেন। বিশেষ করে যারা একই সেক্টরে কাজ করেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বয়েডের কথা। তিনি এবং তার প্রাক্তন দুজনই কাজ করেন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে। একবার এক ট্যুরে যাওয়ার সময় তার কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল, এবং তিনি লিঙ্কডইনের মাধ্যমে তার প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। তার প্রাক্তনও খুবই পেশাদারিত্বের সাথে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে বয়েড বলেন, “একজন মানুষের যখন বয়স বাড়তে থাকে, সে শিখে যায় কীভাবে ব্যক্তিজীবনকে পেশাদার জীবন থেকে আলাদা করতে হয়। মাঝখানে যথেষ্ট সময় কেটে গিয়েছে। তাই আমি নির্দ্বিধায় তার মতামত ও উপদেশের উপর আস্থা রাখতে পেরেছিলাম।”