স্মার্টফোন একসময় জনপ্রিয়তা হারাবে। স্মার্টফোনের জায়গায় চলে আসবে নতুন প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ শুরুও হয়ে গেছে।

বর্তমানে পৃথিবীর ১০ জন মানুষের মধ্যে ৮ জন স্মার্টফোন ব্যবহার করে। স্মার্টফোন বর্তমানে আমাদের জীবনে অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে। এটি ছাড়া এখন আর আমরা একটা দিনও অতিবাহিত করতে পারিনা। কেননা, এটি আমাদের জীবনের প্রায় সবধরণের কাজকে চারকোণা একটি কাঁচের স্ক্রিনের ভেতর নিয়ে এসেছে। এখন আর আমাদের গান শোনার জন্য, ছবি তোলার জন্য, গেম খেলার জন্য, হিসেব করার জন্য আলাদা আলাদা যন্ত্রের প্রয়োজন হয়না। সবই আমরা এই স্মার্টফোনে করতে পারি। এমনকি, কোন স্থানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতাও আজকাল স্মার্টফোন দিয়ে নির্ণয় করা যায়।

এভাবেই, প্রতিটি ক্ষেত্রে স্মার্টফোন জুড়ে গেছে আমাদের জীবনের সাথে।

কিন্তু, এই স্মার্টফোন খুব বেশিদিন হয়নি আমাদের জীবনের অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিংশ শতকের শুরুতে অ্যাপলের সিইও স্টিভ জবস আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তাদের প্রথম আইফোনের সাথে, যেখানে ভালো মানের ক্যামেরা সঙ্গযুক্ত থাকার পাশাপাশি হাতের স্পর্শে সব কাজ করা যায়। এর আগ পর্যন্ত মোবাইল ফোন আমাদের জীবনে প্রয়োজনীয় ছিলো, তবে জীবনের সাথে এভাবে জুড়ে ছিলোনা।

এই আবিষ্কারের পর থেকে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের সাথে মিশে যায়। এখন সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে, প্রতিদিনের রুটিন, কাজের প্রয়োজনীয় তথ্য সবকিছুর জন্য স্মার্টফোনের প্রয়োজন।

যেভাবে কাজ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স; source: Redshark News

কিন্তু, প্রযুক্তি সবসময় গতিশীল। সে কখনো এক জায়গায় থেমে থাকতে পারেনা। সেই নিয়ম অনুসারে, এই অতিপ্রয়োজনীয় স্মার্টফোনের স্থানও কেউ দখল করে নিবে। এখন কথা হচ্ছে, কে দখল করে নিবে সেই স্মার্টফোনের জায়গা?

২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতিটা স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ২ জনের মধ্যে ১ জন চায়, ২০২০ এর মধ্যে স্মার্টফোনের পরিবর্তে নতুন কিছু আসুক। ব্যবহারকারীদের চাহিদা বিবেচনা করে প্রযুক্তিবীদেরা বলছেন, আগামীতে আমরা ইন্টারনেটে প্রবেশের পরিবর্তে ওখানে বসবাস করা শুরু করবো। সেক্ষেত্রে, স্মার্টফোনের জায়গা দখল করে নিতে পারে ভারচুয়াল রিয়েলিটি(Virtual Reality), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (Augmented Reality), আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স (Artificial Intelligence) ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি; source: Ksat

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সমন্বয়ে কম্পিউটার সিস্টেমের মাধ্যমে কোন একটি পরিবেশ বা ঘটনার বাস্তবভিত্তিক বা ত্রিমাত্রিক চিত্রভিত্তিক রুপায়ন হল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। অন্যভাবে বলা যায়- কৃত্রিম পরিবেশ থেকে প্রায় বাস্তবের মত অনুভব করাকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বলে। কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম পরিবেশকে এমনভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়,যা ব্যবহারকারীর কাছে সত্য ও বাস্তব বলে মনে হয়।

অগমেন্টড রিয়েলিটি

অগমেন্টেড রিয়েলিটি হলো এমন এক প্রযুক্তি, যাকে বাস্তব জগতের এক বর্ধিত সংস্করণ বলা যেতে পারে। আপনি বাস্তবে যা দেখবেন, তার উপর কম্পিউটার নির্মিত একটি স্তর যুক্ত করে দেবে অগমেন্টেড রিয়েলিটি। আর তখন সেই বাস্তব এবং ভার্চুয়ালের সংমিশ্রণে তৈরি হবে এক নতুন অনুভূতি, সব কিছুকে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। অগমেন্টেড রিয়েলিটি যা দেখতে চাওয়া হবে, তা-ই চাহিদা অনুযায়ী দেখাবে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি কাজ করে মূলত ক্যামেরার মাধ্যমে। বিশেষধরনের ক্যামেরার সেন্সরের মাধ্যমে চারপাশের বস্তুগুলোর দূরত্ব ত্রিমাত্রিক ভাবে নির্ণয় করা হয়। তারপর সে দূরত্ব প্রসেস করে সেখানে ত্রিমাত্রিক অগমেন্টেড এলিমেন্ট যুক্ত হয়।

যেভাবে কাজ করে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; source: Trendin Tech

আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তা শক্তিকে কম্পিউটার দ্বারা অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। মানুষ যেরকম বুদ্ধিমান, মেশিন কে সেইরকম বুদ্ধিমান করার এই প্রচেষ্টাই হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স । সোজা ভাষায় বলতে গেলে, কম্পিউটার বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বুদ্ধিমত্তা  দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা , শিক্ষা গ্রহন সমস্যার সমাধান, রাগ, হাসি, কান্নার মত নানা অনুভূতি যন্ত্রের মাঝে প্রতিস্থাপন করা যাতে যন্ত্র যা তার পরিবেশকে অনুধাবন করতে পারে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে ।

অ্যাপল স্মার্ট ওয়াচ; source: Apple

পরিধেয় প্রযুক্তি

যেসকল প্রযুক্তি পরিধান করে স্মার্টফোনের মতো কাজ করা যায়, তাদের পরিধেয় প্রযুক্তি বলে। নতুন এই প্রযুক্তি আলাদা করে যন্ত্র বহন করার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিচ্ছে মানুষকে। বর্তমানে স্মার্টফোনের চেয়েও উন্নত ধরনের প্রযুক্তি আমাদের পরিধানে এসে যাচ্ছে। আইওটি, ডাটা সায়েন্স, বিগ ডাটা অ্যানালিটিক্স ও ক্লাউড অ্যাডভান্সমেন্ট ওয়্যারেবল টেকনোলজির নতুন নতুন দিক খুলে দিচ্ছে প্রতি নিয়ত।

উপরের প্রযুক্তিগুলো হয়তো দখল করে নিতে পারে স্মার্টফোনের স্থান, আবার না-ও করতে পারে। তবে, সেক্ষেত্রে অন্য কোনো নতুন কোনো প্রযুক্তি দখল করে নিবে এর স্থান।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করে; source:Medium

কেননা, সময়ের সাথে সাথে মানুষের চাহিদা সবসময় বেড়েই চলে। সে কখনো থেমে থাকেনা। সেই চাহিদার কারণে মানুষ এখন আর স্মার্টফোনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেনা। তারা চাইছে স্মার্টফোনের বিকল্প প্রযুক্তি, যেই প্রযুক্তি হবে সহজে বহনযোগ্য। পাশাপাশি, এই প্রযুক্তি হবে স্মার্টফোন থেকে আরো বেশি বুদ্ধিসম্পন্ন, গতিশীল ও সহজে নির্দেশনা বুঝে নেবার ক্ষমতাসম্পন্ন। এক্ষেত্রে হয়তো এমনও কিছু আবিষ্কার হয়ে যেতে পারে, যাকে বহন করার প্রয়োজন পড়বেনা।

মানুষের চাহিদা, কল্পনা ও বিজ্ঞান কখনোই সীমা মেনবে চলেনা। অসীমের স্বপ্নে তারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে তৈরী করেছে এমন অনেক কিছু, যা একসময় ছিলো মানুষের কল্পনাতীত। সেই নিয়মের ধারাবাহিকতায় আগের চেয়ে আরো উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে নতুন কী আবিষ্কার হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। সেক্ষেত্রে, সবচেয়ে আগ্রহ স্মার্টফোনের দিকে। কারণ, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রযুক্তি হলো স্মার্টফোন। এখন দেখা যাক, সেই স্মার্টফোনের জায়গা কে দখল করে নেয় ।

Feature Image Source: Trendin Tech