দিন দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের শ্রম দেবার জায়গাও তত সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তিবিদরা অবশ্য দাবি করেন কষ্টসাধ্য ও বিপদজনক কাজ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই তারা ভারী কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি মানুষের উচিত তার মেধাকে আরও সৃষ্টিশীল কাজে ব্যবহার করা। 

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো খুব সহজেই কায়িক শ্রম থেকে যান্ত্রিক শ্রমে পরিণত করা যায়। বিশেষ করে কলকারখানায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট কাজ। কলকারখানার মালিক পক্ষও চায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করতে। এতে ঝুঁকি কমে, উৎপাদন বাড়ে, খরচ কমে। আমাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে কোন ধরণের চাকরি মানুষের হাত থেকে যন্ত্রের হাতে চলে যাবে, তাহলে আমরাও বলবো কারখানার এসেম্বলি লাইন বা উৎপাদন বা মোড়ক লাগানোর কাজের কথা।

তবে এর বাইরেও কিছু চাকরি আছে যা মানুষের হাতছাড়া হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কাছে। আজ আমরা তেমন কিছু কাজের কথা জানবো যা ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষের হাতছাড়া হতে পারে।

বীমার অবলিখন

বীমার ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে কেউ যখন বীমার আবেদন করেন তখন বীমা কোম্পানি চাহিদা বিশ্লেষণ, অবলিখন ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে দেখে তাদের কোন পণ্য গ্রাহকের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ। এখন আস্তে আস্তে এই বিশ্লেষণের জন্য বুদ্ধিমান সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ছে। আর মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, বিগ ডাটার কারণে বিশেষণধর্মী কাজে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার যে পারদর্শিতা দেখাচ্ছে তাতে বীমার কাজে অবলিখনের কাজ পুরোপুরি যন্ত্রের হাতে দিয়ে দিলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

বীমা অবলিখনের কাজ হয়ে যেতে পারে স্বয়ংক্রিয়; Image Source: XpertRule

গুদাম ও উৎপাদন সম্পর্কিত কাজ

যেখানে একই কাজ বার বার পুনরাবৃত্তি করা হয় সেই ধরণের কাজ সবার আগে স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। গুদামে মালামালের হিসাব রাখা ও আনা নেওয়া করা এবং পণ্য উৎপাদন লাইনে মূলত এক কাজ বার বার করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে প্যাটার্ন রিকগনিশন বা পর পর করে যেতে হয় এমন কাজে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা মানুষের থেকে অনেক দ্রুত ও নির্ভুল ফলাফল দেয়।

তাই গুদাম কর্মী ও উৎপাদন কর্মীদের থেকে ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যবহার বেশি হবে। এতে কাজ যেমন দ্রুত ও নির্ভুল ভাবে সমাধা হবে তেমনি মানুষ কর্মী থেকে অনেক কম খরচ হবে নিরাপত্তার পিছনে।

গ্রাহক সেবা বা কাস্টমার সার্ভিস

গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহারের বিশাল সম্ভবনা আছে। এই ক্ষেত্রে কাজ যে একেবারেই হয়নি তা না তবে গ্রাহক সেবাকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় এখনো করা যায়নি। এখন যেটুকু ব্যবহার হয় তাতে বরং গ্রাহকরা সন্তুষ্ট হবার বদলে মন খারাপ বেশি করে কারণ তাদের চাহিদা বা সমস্যা একটি রোবট বা বট সফটওয়্যার বুঝতে পারে না। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে, ফলে কিছু বছর পরেই হয়তো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গৎবাঁধা কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবার বদলে গ্রাহকের কথা শুনে তার সমস্যা ঠিক করে বুঝে কার্যকর সমাধান বা বুদ্ধি দিতে পারবে।

কাস্টমার সার্ভিসে দেখা যেতে পারে নানা রকম বট সফটওয়্যার; Image Source: ZDNet

উৎপাদন লাইনে বিবর্তন

অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে আছে উৎপাদন লাইনে ব্যবহার করা রোবোটগুলো। বহু আগে থেকেই এরা ব্যবহৃত হচ্ছে আর প্রতিনিয়ত আগের থেকে আরো উন্নত রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এখনো উৎপাদন লাইনের অনেক কাজ মানুষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। যেমন মান নিয়ন্ত্রন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটাও স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে ভিজুয়াল ইমেজ সিকিং প্যাটার্ন ব্যবহার করে কোন পণ্য শতভাগ মানসম্পন্ন কিনা তা যাচাই করা যাবে। যদিও এখানে প্রযুক্তিগত উন্নতির অনেক জায়গা আছে। আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন আছে। তবে এর সমাধান পেতে খুব বেশি দেরি হবার কথা না।

উৎপাদন লাইনে রোবটের ব্যবহার আগে থেকেই আছে; Image Source: Automated Production Ltd

ফাস্টফুড সার্ভিস

পরের দশকেই ফাস্টফুডের সম্পুর্ন উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের হাতে চলে যাবে। এখনই উন্নত দেশের ফাস্টফুড চেইনশপ গুলোতে বুদ্ধিমান কিয়স্ক রাখা হয় যার মাধ্যমে খাবারের ফরমায়েশ দিলে সাথে সাথে খাবার সামনে চলে আসে। আর এটা করা কঠিন কিছু না, পর্দায় সামান্য কয়েকটি স্পর্শের মাধ্যমেই এটি করা যায়।

তবে পুরো দোকান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে এখনো যায়নি। এখনো দোকানে কয়েকজন মানুষ থাকে রান্না, তদারকি ও পরিষ্কার করার কাজে। তবে এখানেও হাত দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবটের মাধ্যমে ২০ বছরের মধ্যে সম্পুর্ন ফাস্টফুড দোকান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে চলে যাবে।

ফাস্টফুডের দোকানেও হয়ত আর মানুষ থাকবেনা; Image Source: thestreet.com

বিতরণ ব্যবস্থা

অনেক আগে থেকে পিয়ন এসে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতো। এর পর ধীরে ধীরে পিজ্জা থেকে শুরু করে আসবাবপত্র অব্দি নানা রকম জিনিস বাড়িতে এসে দিয়ে যাওয়া শুরু হয়। বিপুল পরিমাণ মানুষ এই বিলি ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। এই সব মানুষও তাদের চাকরি হারাতে পারে ২০ বছরের মধ্যে। এখানেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি বা ড্রোনের মাধ্যমে পণ্য নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেয়া হবে।

পণ্য ডেলিভারি দেবে ড্রোন; Image Source: KunstelKikel

যে সব কাজ পুনরাবৃত্তি হয় সেগুলো স্বয়ংক্রিয় করে ফেললে সব থেকে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। আগে যেসব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু সেগুলো সেগুলো ছিল শুধুই যান্ত্রিক। কোন রকম চিন্তা ভাবনা ছাড়া বিরামহীন ভাবে এক কাজ করে যেত যন্ত্রগুলো। ২০ বছর পরে এই যন্ত্র গুলোই হবে বুদ্ধিমান। একটানা কাজের সাথে সাথে যাচাই বাছাই করতে পারবে। তখন হয়তো অনেক মানুষই তার চাকরিটা হারাবে। তবে যুগের চাহিদা মেনে নিতে হবে। আর হুট করে তো একদিন সব হবেনা। আস্তে আস্তে সময় নিয়ে এই পরিবর্তন আসবে। মানুষ আগে থেকে বুঝতেও পারবে। তাই মানুষ বিকল্প কাজের সন্ধান নিশ্চই করে নিতে পারবে।