গত এক শতকে বাণিজ্যিক বিমান চালনা এক লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছে। যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে প্রথম তালিকাভুক্ত উড়ান ছিল ১৯১৪ সাকের পয়লা জানুয়ারি, আর তাও ছিল মাত্র একজন যাত্রী নিয়ে ফ্লোরিডার সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে টাম্পা পর্যন্ত। যদিও এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল তারপরও প্রথম যাত্রীবাহী বিমান আত্মপ্রকাশ করতে করতে ১৯৫১ সাল অব্দি লেগে যায়। তবে এই ঘটনাই আকাশ ভ্রমণের ইতিহাস পাল্টে দেয়।

বর্তমানে ৭৫% আমেরিকান তাদের জীবনের কোন না কোন সময়ে একবার হলেও আকাশ ভ্রমন করেছেন, আর এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সারা পৃথিবীতেই আকাশ ভ্রমণ আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বিমান সংস্থাগুলো পৃথিবী ব্যাপী প্রতিবছরে প্রায় ৩০ লাখ উড়ানে ৩০ কোটির বেশি যাত্রী পরিবহন করছে। আর এই সংখ্যা এতো দ্রুত বাড়ছে যে খুব তাড়াতাড়ি আকাশ পথ যাত্রী পরিবহনের সবথেকে ব্যস্ত পন্থায় পরিণত হবে।

বদলে যাবে বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; Image Source: FlightGlobal

তাহলে এই আকাশ ভ্রমণের চেহারা কেমন হবে ১০,২০ না ৩০ বছর পরে? কম জ্বালানী খরচ করে আরও দ্রুতগামী বা সৌরশক্তি চালিত বিমান কিংবা বড় জানালা ও নান্দনিক সজ্জার বিমান? সম্ভবনার কোন শেষ নেই। যেহেতু প্রযুক্তি দিনকেদিন উন্নত হচ্ছে তাই স্বাভাবিক ভাবেই বিমান শিল্পও উন্নত হবে, এখন আমাদের বুঝতে হবে সম্ভবনার মাঝে কোন গুলো বাস্তবেই হবে আর কোনগুলো নিছক কল্পকাহিনীর গল্প।

জানালা বিহীন বিমান কাঠামো

মনে করুন আপনি বিমানে উঠে আবিস্কার করলেন সেখানে কোন জানালা নেই বরং বিমানের দেয়ালে খেলা করছে নানা রকমের ডিজিটাল ছবি। কখনো শান্ত নীল আকাশ আর সাদা মেঘ, আবার কখনো সোনালি আভার মায়াবী সূর্যাস্ত। ‘সেন্টার ফর প্রসেস ইনোভেশন’ এর মতে এমন কিছু দেখতে আপনাকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবেনা, আগামী দশ বছরের মধ্যেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে আসবে বিমানের জানালা বিহীন কাঠামো; Image Source: Centre for Process Innovation

এমন জানালা বিহীন বিমান আপনাকে তাজ্জব করে দিলেও বিমান সংস্থা গুলো এর মাধ্যমে অনেক লাভবান হবে। জানালা না থাকলে বিমানের কাঠামো আরও পাতলা, হালকা ও মজবুত করা সম্ভব। এটি যেমন উৎপাদন খরচ কমিয়ে দেবে তেমনি বিমান পরিচালনা ব্যয়ও কমাবে কারণ হালকা বিমান ওড়াতে জ্বালানী খরচ কম হবে। ফলে সামগ্রিক ভাবে বিমান ভাড়াও কমে আসবে।

বিমানে জানালা না থাকার কারণে যাত্রীগণ বিমানের অভ্যন্তরীণ বিনোদনের দিকে নজর দিতে পারবেন, আলাদা আলাদা টাইম জোনের সাথেও সহজে অভ্যস্ত হতে পারবেন, ডিজিটাল পর্দায় নানা কোন থেকে বাইরের ছবিও দেখতে পারবেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে যাত্রীরা জানালা ছাড়া কোন বিমানে চড়তে রাজি হবেন কিনা? সময়ই আসলে এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

পাইলট বিহীন বিমান

আমরা কিন্তু আমাদের অজান্তে নানা রকমের স্বচালিত যান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেক দিন ধরেই ব্যবহার করে আসছি। আমরা এলিভেটরে উঠি, এয়ারপোর্ট ট্রামে চড়ি কিন্তু কখনো খেয়াল করিনা যে এগুলোতে কোন অপারেটর নেই। এখন চালক বিহীন গাড়ি নিয়ে যে হারে গবেষণা আর পরীক্ষা চলছে তাতে অল্প কয়েক বছরের মাঝে রাস্তায় চালক বিহীন গাড়ি দেখা অসম্ভব কিছু না। তাহলে বিমানই বা বাদ যাবে কেন?

আর বিমান যাত্রাকেও আধুনিক, আরামদায়ক আর নিরাপদ করতে নিত্য নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখন টেক অফ আর ল্যান্ডিং ছাড়া বাকি সময়ে বিমানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারই বেশি হয় এখন। তখন পাইলটের কাজ শুধু ওই সব সফটওয়্যার আর নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রাংশ ঠিক মত কাজ করছে কিনা সেটা তদারক করা।

পাইলট বিহীন বিমানের আরেকটি সুবিধা হল ভূমিতে থেকেই বিমান নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যেখানে বর্তমানে বিমানের পুরো দায়িত্ব থাকে পাইলটের কাঁধে। ফলে দীর্ঘ যাত্রায় পাইলট একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হতে পারে। সেখানে ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ করলে দীর্ঘ দূরত্বের উড়ানে কিছু সময় পর পর নিয়ন্ত্রণকারী পরিবর্তন করে নেয়া যায়।

সামরিক ক্ষেত্রে এখনি ব্যবহৃত হচ্ছে চালক বিহীন ড্রোন; Image Source: PrivateFly Blog

বর্তমানে সামরিক প্রযুক্তি পাইলট বিহীন ড্রোনের বিষয়ে অনেক অগ্রসর হয়েছে। অনেক দেশ এখন বিশাল খরুচে যুদ্ধবিমানের বদলে ড্রোনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর ড্রোন গুলোও আকারে ওজনে একেবারে ফেলনা না। তাহলে বড় আকারের ড্রোন যদি হাজার মাইল দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে যাত্রী পরিবহনের বিমানও একই ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পাইলট বিহীন বিমান উড়তে দেখতেও আমাদের অনেক বেশি দিন হয়ত অপেক্ষা করতে হবেনা।

উড়ন্ত অবস্থায় জ্বালানী সংগ্রহ

একবার ভাবুন তো আপনি নিউইয়র্ক থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পর্যন্ত ২০ ঘণ্টার অধিক বিমান ভ্রমণ কোন রকম বিরতি না দিয়ে করে ফেললেন। এখন বিরতিহীন সব থেকে লম্বা বিমান ভ্রমণ হল সিঙ্গাপুর থেকে ১৮.৫ ঘণ্টা একনাগাড়ে উড়ে নিউইয়র্ক পর্যন্ত। এরজন্য ব্যবহৃত হয় সব থেকে আধুনিক আর হালকা বিমান।

কিন্তু যত হালকা হোক আর যত আধুনিকই হোক, যদি তরল গ্যাসোলিন জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাহলে এর থেকে খুব বেশি দূরত্ব একনাগাড়ে উড়ে পাড়ি দেয়া সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় পুনরায় জ্বালানী সংগ্রহ করা

উড়ন্ত অবস্থায় জ্বালানী সংগ্রহ; Image Source: History on the Net

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে হওয়া এক গবেষণা মতে, মাঝ আকাশে বাণিজ্যিক বিমানের জ্বালানী সংগ্রহ নিরাপদ ও ফলপ্রসূ হতে হলে এই জ্বালানী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে হতে হবে পুরোপুরি স্বনিয়ন্ত্রিত। আকাশে কোথায় কখন কোন বিমান কতটুকু জ্বালানী নিয়ে উড়ছে সেটা এই সিস্টেমকে নিজে থেকে বুঝে আগে কোন বিমানকে জ্বালানী দিতে হবে সেটা হিসাব করতে হবে।

মাঝ আকাশে জ্বালানী নেবার সুবিধা থাকলে বিমানকে উড্ডয়নের সময় অনেক বেশি জ্বালানী নিয়ে উড়তে হবেনা। আর এই ব্যবস্থায় ২৩% জ্বালানী খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। আর সামরিক ক্ষেত্রে এভাবে মাঝ আকাশে জ্বালানী নেবার ব্যবস্থা বেশ আগে থেকেই চালু আছে। কিছু ঝুঁকি থাকলেও এই ব্যবস্থার সুবিধা অনেক বেশি সেটা সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়ে দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে বিমান ভ্রমণ হবে আরও সাশ্রয়ী; Image Source: Video Blocks

বিমান যাত্রার প্রধান সুবিধা এটি অনেক সময় বাঁচায়। তাই দিনে দিনে আকাশ পথের ব্যবহার বাড়তেই থাকবে। আগ বাড়িয়ে আমরা হয়ত নানা রকম স্বপ্ন দেখে ফেলি যে একদিন আকাশ ভ্রমণ এমন হবে বা তেমন হবে। তবে আজ যে তিনটি বিষয়ে আমরা কথা বললাম এগুলো অনেক বেশি বাস্তব সম্মত আর এগুলো সত্যি সত্যি পেতে আমাদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবেনা।