প্রকৃতির আদিমতম দুটি লক্ষ্যের একটি খেয়ে বেঁচে থাকা। আর এটি সকল প্রাণীর বেলাতেই প্রযোজ্য। আর যাযাবর আদিম মানুষ নিরন্তর ছুটে চলা থেকে থিতু হয়েছিল চাষ করে ফসল ফলানোর নিমিত্তেই। সেখান থেকেই শুরু সমাজ আর আজকের সভ্যতা। সেই চাষাবাদ ভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ এককালে কেন্দ্রীভূত হয়ে নগর সভ্যতার যাত্রা শুরু।

মহাকালের স্রোতে ভেসে নগর সভ্যতা ফুলে ফেঁপে উঠে উল্টো এখন গ্রামীণ জীবনের টুঁটি এমনভাবে চেপে ধরেছে যে নাগরিক মানুষের মুখে খাবার যোগানোই দায় হয়ে পড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা জনসংখ্যা আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অদূর ভবিষ্যতেই খাদ্য ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। তখন এই সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে নগর খামার। আজ আমরা এই নগর খামার নিয়েই একটু আলোচনা করবো।

জনসংখ্যা আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অদূর ভবিষ্যতেই খাদ্য ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে, তাই শুরু হোক শহুরে খামার; Image Source: Agritecture

পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৭.৬ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়নে উন্নীত হবে। এর মধ্যে আবার দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা হবে শহরবাসী। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ খাবার। একদিকে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে কমছে আর অন্যদিকে অল্প জমিতে বেশি ফসল ফলাতে ব্যবহার হচ্ছে নানা রাসায়নিক। উৎপাদন বাড়াতে প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস করা হচ্ছে, বিপুল পানি ব্যবহার হচ্ছে, নানাবিধ দূষণ বাড়ছে। আমাদের প্রয়োজন নতুন কোনো সমাধান।

ইট কাঠের জঙ্গলে বন্দী শহরবাসী; Image Source: Wired

শহুরে জীবন বলতে আমরা বুঝি প্রতি ইঞ্চিতে ঘন সন্নিবেশিত হয়ে গড়ে ওঠা ভবন, সূর্যের আলো পৌঁছাতে না পারা আর ধোঁয়াশা। গ্রামের পরিচ্ছন্ন, মুক্ত আর নির্মল পরিবেশের তুলনায় শহুরে পরিবেশ বিষাক্ত, অস্বাস্থ্যকর এবং দূষিত। তবে এই ধারণায় আস্তে আস্তে ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে শহুরে খামার ধরণের কিছু অগ্রসর চিন্তাভাবনার কল্যাণে।

নগর খামারের ধারণা আস্তে আস্তে বিকাশ লাভ করছে যখন সামাজিক উদ্যোক্তারা নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে অপ্রথাগত উপায় ও জায়গায় খাদ্য উৎপাদন করছেন। ছাদ থেকে ব্যালকনি, অফিস লবি থেকে বিশ্বযুদ্ধ আমলে বানানো এয়ার রেইড শেল্টার সর্বত্রই উল্লম্ব খামার জায়গা করে নিচ্ছে। চলুন আমরা দেখি কিভাবে স্থানীয় কৃষি শহুরে জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।

নগর খামার পরিণত হচ্ছে সামাজিক আন্দোলনে; Image Source: Matter Of Trust

শহুরে খামার ব্যবস্থার কারণে মানুষের তাজা খাবার পাওয়ার সম্ভবনা বেড়েছে। ভোক্তার যত কাছে উৎপাদন হবে, খাবার পরিবহনের দূরত্ব তত কম হবে এবং ভোক্তা তত বেশি তাজা খাবার পাবে। ফলে খাবার দীর্ঘক্ষণ সতেজ রাখতে রাসায়নিকের ব্যবহারও তত কমবে। এমনকি হাতের কাছে খাদ্য বেশি পাওয়া গেলে পরিবেশের চরম শত্রু প্লাস্টিক ব্যবহারও অনেক কমে যায়। শুধু তাই নয়, স্থানীয় কৃষি কর্পোরেট দৈত্য আর বহুজাতিক কোম্পানিদের টপকে স্থানীয় অর্থনীতিকেও পুষ্ট করে তোলে। নগর খামার বা স্থানীয় কৃষির আরেকটি সুন্দর দিক আছে।

শহুরে জীবন বড্ড আত্মকেন্দ্রিক, এমনকি পাশের ফ্লাটের প্রতিবেশীর সাথেও যোগাযোগ কালেভদ্রে। স্থানীয় খামারের পণ্য লেনদেনের কল্যাণে এই যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়। আর কে না জানে যে সুখী জীবনের অন্যতম রসদ হল পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া। আর সবুজ রঙ মানুষের মনে প্রশান্তি দেয়। আর মানুষ যখন সরাসরি জানতে পারে যে তাদের প্রিয় খাবার কোথা থেকে আসে তখন সেই পরিবেশকে আরও সুন্দর করার চিন্তাও তার মাথার মধ্যে কাজ করে।

শহুরে খামারগুলো যোগাযোগও বাড়ায়; Image Source: Vox

নগর খামারের প্রধান অন্তরায়

নগর খামার ব্যবস্থাকে খাদ্য বিপ্লব ঘোষণা করার আগে আসুন আমরা জেনে নেই এর প্রধান অন্তরায় গুলো কি কি হতে পারে।

  • প্রথম সমস্যা হলো জমি। ইট কাঠের এই জঙ্গলে যেখানে মানুষ প্রতিটা বর্গ ইঞ্চি জায়গার জন্য সংগ্রাম করছে সেখানে ফসল ফলানোর মত জমি কিভাবে পাওয়া যাবে? একবার ভাবুন তো এই ব্যস্ত নগরী ঢাকাতে আপনি চাষবাস করার জন্য ১০ একর জমি কিভাবে যোগাড় করবেন?
  • দ্বিতীয় আরেকটি বড় সমস্যা হলো আলো। অগণিত মানুষকে জায়গা করে দিতে শহরগুলো জমি তো সব শেষ করে ফেলেছেই তারপরও মানুষের চাহিদা কমেনি। এখন ভবনগুলো বাড়ছে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে। এতে করে মাটির কাছাকাছি সূর্যের আলো বলতে গেলে পৌছাতেই পারেনা। সেখানে খামার করলে গাছপালা তাদের নিজেদের খাবার তৈরি করতে সালোক সংশ্লেষণের জন্য আলোই বা কিভাবে পাবে?

তবে সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই সকল বাধা অতিক্রম করা যাবে।

কিভাবে উল্লম্ব খামার বা শহুরে খামার করা সম্ভব

স্থানীয় কৃষি বা খামার অনেক ভাবেই হতে পারে। এটা যেমন বারান্দা বা ছাদে ছোট্ট খামারের মত সহজ হতে পারে আবার তেমনি অভ্যন্তরীণ উল্লম্ব খামারের মত জটিল ব্যবস্থাও হতে পারে। উল্লম্ব খামারগুলো মূলত ঘন শহুরে এলাকার কথা মাথায় রেখেই করা হয় যেখানে অল্প জায়গাকেও ত্রিমাত্রিক ভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অধিক ফসল ফলানো যায়।

এই ধরনের খামারগুলোতে অনেকগুলো সারিতে মাটি বিছিয়ে পরপর গাছ লাগানো থাকে আর পুষ্টি সমৃদ্ধ পানি ও বাতাসের ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটা সারিতে সূর্যের আলোর বিকল্প হিসেবে ইউভি লাইট বা আলট্রা ভায়োলেট আলোর ব্যবস্থা থাকে। ফলে ছোট্ট জায়গার মধ্যে উপর নিচে সংখ্যায় বেশি গাছ থাকলেও তারা জীবনের প্রয়োজনীয় সকল উপাদান ঠিকমতো পায়।

উল্লম্ব খামার; Image Source: Civil Eats

যেসব টেকনোলজি নগর খামারের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে

হাইড্রোপনিক্স বা জলচাষ বিদ্যা

আগেই বলা হয়েছে যে নগর উদ্যান বা নগর খামারে মাটি ও প্রাকৃতিক আলো ছাড়াই চাষাবাদ করা যায়, আর এই পদ্ধতিকেই বলা হয় হাইড্রোপনিক্স। এই পদ্ধতিতে পানিতে দ্রবীভূত পদার্থ ও স্পঞ্জের মত উপাদানের ব্লক ব্যবহার করা হয় যার মধ্যে গাছের শিকড় বাড়তে পারে। এর সাথে কম শক্তির এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে উদ্ভিদ কম পানি ব্যবহার করেই দ্রুত বাড়তে পারে আর ফলনও অধিক হয়। একটু জটিল মনে হলেও এই পদ্ধতি দ্রুতই মূলধারায় প্রবেশ করছে।

অ্যাকুয়াপনিক্স

অ্যাকুয়াপনিক্স এমন একটি পদ্ধতি যেখানে মাটি ছাড়াই অ্যাকুয়াকালচারের সাথে সমন্বয় করে মাছ চাষ করা হয় ও ফসল ফলানো হয়। এটি একটি বন্ধ লুপ সিস্টেম। এখানে মাছের বর্জ্যকে গাছের জন্য সরবরাহ করা হয়। পানিতে থাকা নানা রকমের মাইক্রোবস এই বর্জ্য থেকে অ্যামোনিয়াকে নাইট্রেটে রূপান্তর করে যা গাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতি; Image Source: research.umn.edu

নগর খামার এবং ইন্টারনেট অব থিংস

উৎপাদনশীলতাকে বৃদ্ধি করতে, বর্জ্য কমাতে ও চাষাবাদের কাজে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে ইন্টারনেট অব থিংস ব্যবহার করা হয়। আইওটি ভিত্তিক স্মার্ট খামারগুলো সেন্সর ব্যবহার করে মাটি, পানি, আলো, আদ্রতা, তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে স্বয়ংক্রিয় ভাবে সেচ দেয়া বা সার দেবার মত কাজ করতে পারে। স্মার্ট গ্রিনহাউজগুলো উদ্ভিদের প্রয়োজন মত জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে অতিরিক্ত সম্পদের অযথা ব্যবহার বন্ধ হয়ে উৎপাদন খরচও কমে আসে।

নগর খামার আমাদের কৃষি ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে পারে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে এটি বর্তমান নানা পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় সাহায্য করবে। এর ফলে শহরবাসীর তাজা ও পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদাও মিটবে।