পোশাক সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালের স্রোতে ভেসে পোশাক আর শুধু প্রয়োজন না, এটি ফ্যাশন আর সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। আদি কাল থেকেই সময়ের সাথে সাথে পোশাকের বিবর্তন হয়েছে। ২০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ যে পোশাক পড়ত সেটা আমাদের কাছে সেকেলে হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি ভাবে আরও ২০০ বছর পর আমাদের উত্তরপুরুষদের কাছে বর্তমানের পোশাকও সেকেলে মনে হবে।

আর দিনকে দিন যেভাবে প্রযুক্তি আমাদের গ্রাস করে ফেলছে তাতে সাদামাটা পোশাকও তার হাত থেকে রেহাই পাবে বলে মনে হয়না। আমরা স্মার্ট হয়েছি। আমাদের বাড়িঘর, আসবাবপত্রও স্মার্ট করে ফেলছি, তাহলে পোশাকই বা বাকি থাকবে কেন? নানারকম গবেষণা চলছে নতুন জমানার পোশাকে নানা প্রযুক্তির সমাহার ঘটিয়ে তাকে আরও কার্যকর করার জন্য। আজ আমরা তেমনই কিছু ধারণার ব্যাপারে জানার চেষ্টা করব।

রং বদলে ফেলতে পারা কাপড়

অধিকাংশ মানুষই নিজের কাপড়ের রংয়ের ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে। সবাই চায় ফিটফাট থাকতে। সেই শখের কাপড়ে যদি কোন দাগ লেগে যায়, বা আশেপাশে যদি একই নকশার একই কাপড় অন্য কেউ পরে তাহলে উৎফুল্ল মনটা দমে যেতে বাধ্য। তখন আমরা সবাই একটাই কথা ভাবি, “ইশ যদি কাপড়ের রংটা একটু গাঢ় হতো তাহলে দাগ বোঝা যেত না।” বা হয়তো ভাবি “সামনের লোকটাকেও আজ এই জামটাই পরতে হলো!!?? কেন যে অন্য জামাটা আজ পড়লাম না!”

আচ্ছা কেমন হতো যদি সাদা রংয়ের জামাকে হুট করে গাঢ় বাদামী রংয়ে বদলে ফেলা যেত? বা ফুলকো ডট দেয়া জামাকে নকশা বদলে স্ট্রাইপ দেয়া নকশা করে নেয়া যেত? এর জন্য মনে হয় খুব বেশি দেরি করতে হবেনা। ইতিমধ্যে ‘দ্য আনসিন‘ নামের একটি লন্ডন ভিত্তিক নকশা প্রতিষ্ঠান এমন কাপড় নিয়ে গবেষণা করছে যা একটি মোবাইল আপ্লিকাশনের মাধ্যমে রং পরিবর্তন করতে পারবে।

পোশাক ইচ্ছা মত রঙ ও নকশা বদলাতে পারবে; Image Source: vice.com

যোগাযোগে সক্ষম জিনস

কোন একটি প্রযুক্তি কনফারেন্স যেয়ে যদি মানুষজনকে হাতঘড়ির মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করতে দেখে ভড়কে যান তাহলে কাউকে হাঁটুতে থাবা মেরে উবার ডাকতে দেখলে কি করবেন? কিন্তু এমনটাই হতে যাচ্ছে।

পরের বছর গুগল, লেভির সাথে মিলে প্রোজেক্ট জ্যাকার্ড চালু করতে যাচ্ছে, পরিবাহী তন্তুর মাধ্যমে জিনস তৈরি করে স্পর্শের মাধ্যমে খুব সাধারণ কিছু কাজ করিয়ে নেয়াই এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। যেমন- সেলফি তোলা, ফোন সাইলেন্ট করে দেয়া, উবার ডাকা, কল আসলে সেটা রিসিভ করা বা কেটে দেয়া, এমনকি লাইট বা ফ্যান চালু করা বা বন্ধ করা।

পোশাকেই ওয়াই ফাই সংযোগ দেয়া যাবে; Image Source: blog.avira.com

অন্য ডিভাইসকে চার্জ দিতে পারা পোশাক

আপনার ফোনকে চার্জ দিতে পারে এমন জ্যাকেট ইতোমধ্যে বাজারে চলে এসেছে। গত বছর টমি হিলফিঙ্গার এমন একটি জ্যাকেট বাজারে ছাড়ে যার সাথে ছোট্ট একটি বহনযোগ্য ব্যাটারী আছে এবং পিঠের দিকে সোলার প্যানেল সংযুক্ত করা আছে।

আপনার সাধারণ চলাচলেই ওই সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ব্যাটারী চার্জ হবে যাতে আপনি আপনার মোবাইল যুক্ত করে তাতে চার্জ দিতে পারবেন। একই সময়ে ডাচ ডিজাইনার পলিন ভ্যান ডুজেন খুব সুন্দর টিশার্ট ডিজাইন করেন যেখানে ওই একই সুবিধা আছে। সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে না, যখন আমাদের শরীর থেকেই তাপ নিয়ে অন্য ডিভাইসগুলোকে চার্জ দেবার প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে।

অন্য ডিভাইসকে চার্জ দিতে পারবে আপনার পোশাক; Image Source: Android Community

শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী পোশাক

আমাদের খুব সাধারণ একটি সমস্যা হলো আচমকা তাপমাত্রার পরিবর্তন। হয়তো তপ্ত দুপুরে বাসে বসে সিদ্ধ হচ্ছি তো পরমুহূর্তে অফিসে ঠান্ডা এসির মধ্যে ঢুকছি। তাপমাত্রার এই হুটহাট পরিবর্তন শরীরের জন্য বেশ কষ্টদায়ক। আবার অনেকে হয়তো তীব্র গরম সহ্যই করতে পারে না, কেউ আবার আছেন হালকা শীতেই থরোহরিকম্প দশা।

বেশ হতো যদি আমাদের পোশাকগুলো বেশ স্মার্ট হতো আর শরীরের চাহিদা বুঝে পোশাকের ভিতরে সঠিক তাপমাত্রা ধরে রাখতো। অদূর ভবিষ্যতে এমন পোশাক আসবে যা আপনার চাহিদা মতো তাপমাত্রা বজায় রাখবে। শুধু তাই না, এর ভিতরে রাখা চিপগুলো বিভিন্ন তথ্য ধরে রেখে আপনার ঘরের এসির কাছে পাঠিয়ে দেবে যেন আপনি ঘরে ঢোকার মুহূর্তে আপনার পছন্দের আরামদায়ক তাপমাত্রা পান।

শরীরের তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে; Image Source: Electronic Component News

আকার পরিবর্তনশীল পোশাক

রং বদলে ফেলা পোশাক খুব অসম্ভব মনে না হলেও পুরো আকার আকৃতি বদলে দেবে এমন পোশাকের কল্পনা করা একটু কঠিনই বটে। তবে কঠিন হলেও এটা একেবারে অসম্ভব না। ২০১২ সালে লাকোস্ট একটি ভিডিও ছাড়ে যেখানে তারা এমন পোশাক দেখায় যা রং বদলাতে পারে, হাতের স্লিভ বদলাতে পারে, পোশাকের দৈর্ঘ্য ও বাড়াতে কমাতে পারে। এই ধরণের প্রযুক্তি নির্ভর করে জটিল তন্তু বা সুতার

উপরে যেখানে তন্তুর আণবিক গঠন বদলে তাকে আলাদা আলাদা আকার দেয়া সম্ভব হতে পারে। ওএমসিগনাল নামে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে রালফ লোরেনের জন্য হাইটেক পোলো শার্ট তৈরি করতে চেষ্টা করছে। পলিন ভ্যান ডুজেনের গবেষণা মতে থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই রকম সুবিধা সম্পন্ন তন্তু তৈরি করা সম্ভব যা ওই তন্তু থেকে তৈরি পোশাককে যথেষ্ট নমনীয়তা দেবে আলাদা আলাদা আকার ধারণের জন্য।

ইচ্ছামত আকারও নিতে পারবে; Image Source: Fast Company

এখন আমরা হয়তো একটি সুন্দর পোশাকেই মুগ্ধ হই। একটু আরাম আর দেখতে সুন্দর, পোশাক নিয়ে এটাই আমাদের সর্বোচ্চ কল্পনা। কিন্তু একটু দূরে যদি তাকাই তাহলে হয়তো দেখবো একটি মাত্র পোশাক যা চাহিদা মতো রং বদলে ফেলতে পারে, আপনার শরীরের সাথে চারপাশের পরিবেশের তাপমাত্রার তারতম্য বুঝে সেই তাপমাত্রা কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে পোশাকের ধরণ বা আকার বদলে ফেলতে পারে, এমনকি আপনার মোবাইল বা অন্য ডিভাইসগুলোকে চার্জ ও দিতে পারে। তখন হয়তো আমরা অবাক হয়ে ভাববো, এককালে এই পোশাক কত কম কাজ করে দিত!