প্রিয় মর্ত্যবাসী,


আমার নাম ওসাইনি, আমি ১৫ বছর বয়সী আর তোমরা যাদের জলচারী বল তেমনই এক কিশোর। আমি রিও ডি জেনেরিওর উপকূল থেকে সামান্য দূরে একুয়ারিয়া নামের এক ডুবো খামারে ২০৫০ সালে জলের নিচে জন্মেছি। আমি আমার দাদুর কাছ থেকে মর্ত্যবাসী কিভাবে মাটিতে বেঁচে ছিল তা শুনেছি। বিশ্বাস কর, সেই গল্পগুলো বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়েছে আমার। তারা নাকি তাদের শহরগুলোকে প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার বদলে পণ্যের মত ব্যবহার করে শেষ করে দিয়েছে।

রূপকথার মতো এই গল্প ভিনসেন্ট কালেব এর। না, তিনি কোন কল্পকাহিনীর লেখক না, তিনি একজন বেলজিয়ান আর্কিটেক্ট। তিনি ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি শহরের পরিকল্পনা করেছেন যা হবে পানির ভিতরে, আর তৈরি হবে থ্রি-ডি প্রিন্টেড প্লাস্টিকের আবর্জনা থেকে। আজ আমরা এই আপাত অসম্ভব কিন্তু খুবই কৌতূহল উদ্দীপক শহরের কথা জানবো।

রূপকথার শহর; Image Source: Dezeen

বিকল্প মাথা গোঁজার ঠাই

আমাদের পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি এবং এটা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বাড়তি জনসংখ্যার মাথা গোঁজার ঠাই মিলাতে গড়ে উঠছে একের পর এক শহর আর গগনচুম্বী অট্টালিকা। ব্যস্তানুপাতিক হারে কমছে চাষের জমি আর অরণ্য। পরিবেশের কথা না ভেবেই গড়ে তোলা হচ্ছে কলকারখানা। আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোথাও বেমালুম ভুলে আমরা সব ফেলছি নদী আর সাগরের পানিতে। এই আবর্জনার একটা বড় অংশ হল প্লাস্টিক যা মাটিতে মিশে যায়না। এর সাথে মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত আছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। এর ফলে মেরুর বরফ গলছে, পানির উচ্চতা বাড়ছে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাই সামান্য জমিটুকুও ডুবে যাবার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশাল বিশাল গগনচুম্বী অট্টালিকা তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কিন্তু এই সকল ভবনও নানা রকম আবর্জনা তৈরি করবে তাই এই সমাধান খুব বেশি স্মার্ট না।

বর্তমান শহরের চিত্র; Image Source: World Atlas

এখানেই সবার থেকে আলাদা ভিনসেন্ট কালেব। সবার হাঁটা পথে না হেঁটে তিনি একটু অন্যভাবে ভেবেছেন। তিনি মানুষের থাকার জন্য যে বিকল্প বাসস্থানের কথাই খালি ভেবেছেন তা নয় বরং কিভাবে এই দূষিত পরিবেশকে আরেকটু বাসযোগ্য করা যায় সেটাও ভেবেছেন।

এই স্বপ্নদ্রষ্টা এমন বিস্ময়ে ভরপুর এমন এক শহরের কল্পনা করেছেন যা অনেক দিক থেকেই সাইন্স ফিকশনের উপন্যাসকেও হার মানায়। প্রথমত এই শহর তৈরি হবে একেবারে সাগরের মাঝে, যা এখনো আমাদের কাছে কষ্টকল্পনা। দ্বিতীয়ত এই শহর তৈরি হবে সোজা কথায় বলতে গেলে আবর্জনা দিয়ে। তিনি এই আবর্জনা আর এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে থ্রি-ডি প্রিন্টিঙের মাধ্যমে নির্মাণ উপকরণ বানিয়ে সেটা দিয়ে তার স্বপ্নের শহর নির্মাণ করতে চান। তিনি তার স্বপ্নের শহরের নাম দিয়েছেন ‘একুয়ারিয়া’।

নির্মাণ কাজে প্লাস্টিক আবর্জনা

শিল্প বিপ্লবের শুরু থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক উপাদানের বাইরে নানা রকম কৃত্রিম উপকরণের ব্যবহার শুরু করে। নির্মাণ যজ্ঞের উপকরণও ধীরে ধীরে ওই কৃত্রিম উপাদানের দিকে ঝুঁকে পরে। এর প্রধান কারণ এগুলো সহজেই তৈরি করে ফেলা যায়। এগুলো প্রথমে আশীর্বাদ মনে হলেও আস্তে আস্তে এর ভয়াল রূপগুলো সামনে আসতে থাকে।

বিশেষ করে বলা যায় পলিথিন বা প্লাস্টিকের কথা। প্রথম দিকে এগুলো আমাদের জীবনকে এতটাই প্রভাবিত করে যে এর খারাপ দিক গুলো খুব সহজেই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এগুলো যে পচে মাটিতে মিশে যায়না এই সহজ কথাটাই আমরা বেমালুম ভুলে বসি। ফলশ্রুতিতে প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহার এবং যেখানে সেখানে ফেলে দেবার ফলে আমাদের প্রকৃতি মুখোমুখি হয় এক ভয়াবহ সমস্যার।

প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হওয়া আবর্জনা; Image Source: reddit.com

এই সব প্লাস্টিক মাটির নিচে জমে যেমন উর্বরতা শক্তি হ্রাস করছে তেমনি নদী নালা বেয়ে সাগরের পানিতে জমা হচ্ছে। এগুলো পানিতে মিশে যাচ্ছে না বরং স্রোতের কারণে এক জায়গায় দলা পাকিয়ে থাকছে। সারা পৃথিবীর সাগরগুলোতে এমন প্লাস্টিক আর অন্যান্য আবর্জনা জমে বড় বড় ভাগারের মত তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হল গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ

এটি আকারে পৃথিবীর কয়েকটি ছোট আকারের দেশের চাইতেও আয়তনে বড়। ভিনসেন্ট কালেব এই বিশাল আবর্জনাকেই কাজে লাগাতে চাইলেন। তিনি এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবালের সাথে এই আবর্জনাকে মিশিয়ে এর অণুগুলোকে ভেঙ্গে নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে এগুলোকে থ্রি-ডি প্রিন্টারের কালি বা উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে নানা আকারের বিল্ডিং ব্লক তৈরি করবেন আর সেগুলো একের পর এক জোড়া দিয়ে তৈরি হবে তার স্বপ্নের একুয়ারিয়া।

থ্রি-ডি মুদ্রণ প্রযুক্তি; Image Source: Fortune

তিনি তার স্বপ্নের শহরকে তৈরি করতে চান একদম স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে। যেন এর কোন চাহিদা পূরণ করতে এর অধিবাসীদের অন্যের মুখাপেক্ষি না হতে হয়। এর থাকবে নিজস্ব পানি শোধনাগার। থাকবে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। এক স্থাপনা থেকে অন্য স্থাপনাতে যাতায়াতের জন্য থাকবে নৌযান আর সেগুলো চালিত হবে নানা রকম সামুদ্রিক লতা গুল্ম থেকে প্রাপ্ত জ্বালানী দ্বারা। এর ভবন গুলো আচ্ছাদিত থাকবে নানা রকমের বাগান দ্বারা যেখানে চাষ হবে পুষ্টিকর নানা সামুদ্রিক উদ্ভিদ যেগুলো সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে একুয়ারিয়ার অধিবাসীদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ভিনসেন্ট কালেব এমন ব্যক্তি নন যে এক গাঁজাখুরি গল্প ফেঁদে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবে। তিনি শুধু তার কল্পনা জানিয়েই থেমে যাননি, বরং ভেবেছেন কিভাবে যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবসম্মত ভাবে তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া যায়। এমনকি তিনি এই সাগর শহর স্থাপনের জন্য জায়গাও ঠিক করে ফেলেছেন। তার স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ব্রাজিলের রিও-ডি-জেনেরিও শহরের উপকূলকে।

ভিনসেন্ট কালেবের স্বপ্নের একুয়ারিয়া; Image Source: Vincent Callebaut Architectures

আজ আমরা এক স্বাপ্নিক মানুষের স্বপ্নের সাথে পরিচিত হলাম। এর পরের পর্বে তার স্বপ্নের শহর নিয়ে বিস্তারিত জানবো। একটু অপেক্ষা করুন।