মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে, নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিজ্ঞানের যত উৎকর্ষ সাধন হয়েছে, প্রযুক্তিরও ততই উন্নতি হয়েছে, আর তার সুফল লাভ করেছে মানুষ। সেই সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষের আবিষ্কৃত অধিকাংশ প্রযুক্তিই কোনো না কোনোভাবে আজকের দিনেও অবশিষ্ট রয়েছে। কেবল সেগুলোর রূপ পরিবর্তন ঘটেছে বা সম্প্রসারণ ঘটেছে।

তবে এ কথা বলার উপায় নেই যে আজ থেকে একশো বছর আগে মানুষ যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করত, সেগুলো সব তারা আজকের দিনেও হুবহু অবিকৃত রূপেই ব্যবহার করে থাকে। আর তাই এ কথা বলাই বাহুল্য যে, আজ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেসব প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, ভবিষ্যতে তার মধ্য থেকে অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এই বিলুপ্তিটি হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঘটবে। এখন আমরা আলোকপাত করব সেরকম কিছু বর্তমান প্রযুক্তির ব্যাপারেই, অদূর ভবিষ্যতে যেগুলোর অস্তিত্ব কেবল জাদুঘরেই সংরক্ষিত থাকবে।

ডিজিটাল ক্যামেরা; Image Source: Getty Images

ডিজিটাল ক্যামেরা

মাত্র বছর দশেক আগেও ডিজিটাল ক্যামেরা দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কিন্তু এখন ডিএসএলআরের আগমনের পর অধিকাংশ মানুষই সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরার কথা ভুলতে বসেছে। তাছাড়া এখন তো আবার মোবাইল ফোনেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরা থাকছে, যা দিয়ে এইচডি ফরম্যাটে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। অনেকে তো এমনকি মোবাইল ফোন দিয়েও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলছে, আর আইফোন ফটোগ্রাফির জন্য বিশেষ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হচ্ছে। তাই এটি মোটামুটি নিশ্চিত যে ডিজিটাল ক্যামেরা এখন মূমুর্ষূ অবস্থায় রয়েছে।

হার্ড ড্রাইভ; Image Source: Getty Images

হার্ড ড্রাইভ

কম্পিউটার সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছানোর পর থেকেই হার্ড ড্রাইভ খুবই প্রয়োজনীয় একটি জিনিস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সেই দিন আর বেশি দূরে নেই, যখন মানুষের কাছে হার্ড ড্রাইভের আর বিশেষ কোনো আবেদনই থাকবে না। কারণ সবাই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও ফাইল ক্লাউডেই সংরক্ষণ করতে পছন্দ করবে। তাই আলাদা করে আর কোনো শারীরিক স্টোরেজ ডিভাইসের দরকার হবে না।

পেপার ম্যাপ; Image Source: Getty Images

পেপার ম্যাপ

আগে মানচিত্র মানুষের কত প্রয়োজনীয় একটি জিনিসই না ছিল। প্রচুর খেটেখুটে একেকটা শহর, দেশ কিংবা মহাদেশের মানচিত্র তৈরি করা হতো, যা মানুষকে সঠিক পথের হদিস দিত। কিন্তু এখন আর সেরকম কাগজের মানচিত্রের কোনো দরকারই পড়ছে না। গুগল ম্যাপ কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ম্যাপের মাধ্যমে স্যাটেলাইট থেকেই যেকোনো জায়গার সঠিক অবস্থানসহ ট্রাফিক, আবহাওয়া ইত্যাদি সকল তথ্য জেনে নেয়া সম্ভব হচ্ছে।


ফ্যাক্স মেশিন; Image Source: Shutterstock

ফ্যাক্স মেশিন

এ কথা ভাবলে অবাকই লাগে যে, এখনো ফ্যাক্স মেশিনের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণ মানুষ এগুলো ব্যবহার না করলেও, বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে, যেমন সংবাদপত্রের অফিসে আজও ফ্যাক্স মেশিনের ছোটখাট ব্যবহার হচ্ছে। তবে এমন অনেক অফিসও আজকাল দেখা যাবে, যেখানে ফ্যাক্স মেশিন হয়তো আছে, কিন্তু মাসের পর মাস ধরে এটির কোনো ব্যবহারই হয়নি। এই ইমেইলের যুগে কেনই বা তা হবে! সুতরাং, আর পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ফ্যাক্স মেশিন বিলুপ্ত হয়ে গেলে অবাক হবেন না যেন!

সিডি; Image Source: Getty Images

সিডি

ভেবে দেখুন তো, শেষ কবে সিডি কিনেছেন? যদিও বা কিনে থাকেন, তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, গাড়ির ট্রাংকে রেখে দেয়ার জন্য। কারণ আজকাল মানুষ পাইরেসির যুগে গান কেনে খুবই কম, ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নেয়ই বেশি। তবে ইদানিং পাইরেসির থেকেও তারা স্ট্রিমিং সার্ভিসের মাধ্যমে গান শোনাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে পাইরেসি কমলেও, সিডির যুগে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

ডিভিডি প্লেয়ার; Image Source: Getty Images

ডিভিডি ও ব্লু রে প্লেয়ার

মানুষ সিডি কেনা বাদ দিলেও, কিছুদিন আগ পর্যন্তও ডিভিডি ও ব্লু রে কিনত ঠিকই। কারণ সেরা মানের চলচ্চিত্রের জন্য ইন্টারনেট তখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু স্ট্রিমিং সার্ভিসের আগমনের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে ডিভিডি ও ব্লু রে প্লেয়ারের প্রচলনও। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম কিংবা এইচবিও নাউতেই যদি সম্ভাব্য সেরা ভিডিও কোয়ালিটিরব চলচ্চিত্র দেখা যায়, তা-ও খুবই সীমিত খরচে, তাহলে মানুষ কেন কিনবে ডিভিডি বা ব্লু রে?

ক্যালকুলেটর; Image Source: Getty Images

ক্যালকুলেটর ও অ্যালার্ম ক্লক

আজকাল পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজে ক্যালকুলেটর ব্যবহৃত হয় না বলেই চলে। কারণ সকল মোবাইল ফোনেই বিল্ট ইন ক্যালকুলেটর থাকে। আর যাদের উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন ক্যালকুলেটরের প্রয়োজন, তারাও চাইলেই স্টোর থেকে সেরকম ক্যালকুলেটর অ্যাপ ইনস্টল করে নিতে পারে।

অপরদিকে শারীরিক অ্যালার্ম ক্লকের কাজও করে দিচ্ছে মোবাইল ফোনই। এতে শুধু অ্যালার্ম সেট করাই যায় না, পাশাপাশি স্টপওয়াচ, রিমাইন্ডার প্রভৃতি ফিচারও থাকে। আর যারা আরো উচ্চতর ক্ষমতার ঘড়ি চায়, তাদের জন্য রয়েছে স্মার্ট ওয়াচ, যাতে হার্টবিট মাপা থেকে শুরু করে কতটুকু হাঁটা বা দৌড়ানো হয়েছে, সবই পরিমাপ করা যায়।

আইফোন হোম বাটন; Image Source: Apple

মোবাইল ফোনের বাটন

তথাকথিত বাটন ফোন তো ইতিমধ্যেই বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে, এবং এখন মোবাইল ফোনে যে একটি বা দুইটি বাটন থাকে, সেগুলোও একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছে। আজকাল আইফোনে হোম বাটন থাকছে না। এছাড়া অনেক অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের মডেল থেকেও বাটন সুবিধা তুলে নেয়া শুরু হয়েছে। এভাবে একদিন হয়তো কোনো মোবাইল ফোনেই আর বাটনের অস্তিত্ব থাকবে না। অর্থাৎ মানুষের আর মোবাইল ফোনের কোনো কিছুই চাপা লাগবে না, কেবল স্পর্শের মাধ্যমেই তাদের কাঙ্ক্ষিত কাজটি হয়ে যাবে।

ফেসিয়াল রিকগনিশন; Image Source: Apple

পাসওয়ার্ড

এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ডিভাইস কিংবা অনলাইন আইডিতে ঢোকার ক্ষেত্রেই পাসওয়ার্ড অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু একসময় পাসওয়ার্ডও তার গুরুত্ব হারাবে। ইতিমধ্যেই অ্যাপলের ফেস আইডি, মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ হ্যালো প্রভৃতি মুখচ্ছবি চিহ্নিতকরণ প্রযুক্তি রয়েছে। ভবিষ্যতে আরো উদ্ভাবনী সব প্রযুক্তির আগমন ঘটবে। ফলে পাসওয়ার্ড হিসেবে বিভিন্ন শব্দ, সংখ্যা, চিহ্ন মনে রাখার ঝামেলা আর করতে হবে না।

রিমোট কন্ট্রোল; Image Source: Shutterstock

রিমোট কন্ট্রোল

রাগের মাথায় রিমোট কন্ট্রোল আছড়ে ভাঙা, কিংবা পছন্দের চ্যানেল দেখার জন্য বোনের সাথে রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি? সেসব দিনের অবসান ঘটতে চলেছে শীঘ্রই। অ্যামাজন একোর মতো অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি আসছে, যেগুলোতে ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসকে যেকোনো কাজ করতে নির্দেশ দেয়া সম্ভব।

তাছাড়া আজকাল তো স্মার্টফোন দিয়েও টিভি কিংবা এসি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভবিষ্যতে তাই আলাদা করে আর রিমোট কন্ট্রোলও ব্যবহার করা লাগবে না, এবং ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে সেটির পেছনে বারবার হাত দিয়ে বাড়ি মারারও প্রয়োজন পড়বে না!