বর্তমান পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭.৩ বিলিয়নের কাছাকাছি। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০ বিলিয়ন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক কমে আসলেও রোগশোক ঘটিত মৃত্যুহার অনেক কমে যাবার কারণে জনসংখ্যার লাগাম টেনে ধরা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। খুব বেশিদিন আগের কথা না যখন সামান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বসন্ত অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল।

মধ্যযুগে ইউরোপে প্লেগের মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার কথা আমরা সবাই জানি। অশিক্ষা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের পশ্চাৎপদতা নানা কারণে সামান্য অসুখে প্রচুর প্রাণহানি হতো। এখন বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। অনেক কঠিন অসুখেও প্রাণহানি হয়না বললেই চলে।

ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপের জনসংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছিল; Image Source: FactRetriever

তাই বলে কি আমরা আসলেই চিন্তামুক্ত? যেভাবে বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা এমনকি অমরত্বের চিন্তা শুরু করে দিয়েছি, আসলেই কি আমরা এতটা বিপদমুক্ত? উত্তর হয়তো ‘না’। রোগশোককে আমরা এখনই বশে এনে ফেলেছি এটা বলা যাবে না।

হয়তো অজানা কোন অসুখ আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে। আজ আমরা এমনই কিছু ঘাতকের কথা জানবো যাদের বিষয়ে আমাদের জ্ঞান শূন্য, হয়তো এসব রোগ এখনও সম্ভবনার মাঝেই আছে, তারা নাও আসতে পারে আবার এসে ব্ল্যাক ডেথের মতো মৃত্যুর চাদরও বিছিয়ে দিতে পারে।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ই-কোলাই

বহুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে আসছেন এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উত্থান সম্পর্কে। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মিলকেন ইনস্টিটিউট স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড: ল্যান্স প্রাইসের মতে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে পশু উৎপাদন ও মানব ওষুধ হিসেবে এন্টিবায়োটিকের অতিমাত্রায় ব্যবহার ও অপব্যবহারের কারণে।

তিনি বলেন “আমরা সবাই জানি যে যত  বেশি এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হবে তত বেশি এর প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরির সম্ভবনা বাড়বে”। তার মতে, হয় অর্থনৈতিক কারণে, নয়তো আরো ভালো এন্টিবায়োটিক ভবিষ্যতে আসবে এই ধারণা নিয়ে আইনপ্রণেতা বা প্রয়োগকারীরা এন্টিবায়োটিকের এই অতিব্যবহারের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ তৈরি করতে গড়িমসি করছেন যা রীতিমতো মূর্খতার সামিল।

এন্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার একে অকার্যকর করে ফেলছে; Image Source: Pensive Webizen

ড: প্রাইস মনে করেন এমন যৌগের সংখ্যা খুব বেশি না, যেগুলো মানুষকে মেরে না ফেলে খালি ব্যাকটেরিয়াকে মারবে। আর যদি সেই সংখ্যা বেশিও হয় তবুও ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করতে খুব একটা আগ্রহী না। কারণ তারা চায় মানুষ যেন প্রতিনিয়ত তাদের ওষুধ কেনে। যে ওষুধ বহু বছর পরে কয়েকদিন গ্রহণ করলেই ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে বাঁচা যাবে, সে ওষুধ বানালে তো ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা লাটে উঠবে। 

সমস্যা হলো এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ভবিষ্যতে এসে আমাদের আক্রমণ করবে এমনটা না, তারা ইতিমধ্যে এসে গেছে। গত বছর ২৩ হাজার মানুষ এমন ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এমন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। এর মধ্যে খুব সহজপ্রাপ্য হলো ই-কোলাই। এটি পাওয়া যায়না এমন কোন জায়গা নেই। এটি যখন সকল এন্টিবায়টিক প্রতিরোধী হয়ে যাবে তখন এর ছোটখাটো সংক্রমণেও অসংখ্য মানুষ মারা যাবে।

ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া; Image Source: The Independent

আর্কটিক বরফের ভাঁজে লুকানো অতিপ্রাচীন ভাইরাস

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মেরুর বরফ গলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা এখন খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তবে সবাই আলোচনা করে বরফ গলে যাবার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে। কিন্তু এক সুপ্ত দৈত্যের কথা সবাই ভুলে যায়। সেটা হল বরফের ভাঁজে হাজার হাজার বছর লুকিয়ে থাকা অতি প্রাচীন কিছু ভাইরাস। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা সাইবেরিয়ার গভীর বরফের ভিতরে লুকায়িত ৩০০০০ বছরের পুরনো এক দৈত্যাকৃতির ভাইরাসকে পুনরুজ্জীবিত করতে পেরেছেন। 

৩০০০০ বছরের পুরনো দানবীয় ভাইরাস; Image Source: Live Science

ভাইরাস অনেক প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে, তখন হয়তো সংক্রমণ করে না, তবে বহু বছর সুপ্ত অবস্থায় জীবিত থাকতে পারে। পরে অনুকূল পরিবেশ পেলে পুনরুজ্জীবিত হয়ে আবার ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আর বরফ খুব ভালো সংরক্ষক। এর মাঝে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোবস আর ভাইরাস দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

যদিও সাইবেরিয়াতে প্রাপ্ত দৈত্যাকার ভাইরাসটি মানুষের জন্য ভয়ংকর নয় তবু এটা একটা অশনিসংকেত। কারণ সুদূর অতীতে নিশ্চয়ই অনেক ভয়ংকর ভাইরাস ছিল যা মানুষের জন্য ভয়ংকর এবং এখনকার ভাইরাস হতে বহু গুন শক্তিশালী। তেমন কোন ভাইরাস যদি বরফের কঠিন স্তরের নীচে সুপ্ত অবস্থায় লুকায়িত থাকে আর বরফ গলে তারা প্রকৃতিতে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে তাহলে গোটা মানবজাতির জন্যই সেটা ভয়ের কারণ হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে কখন আর কোথায় এটা ঘটবে আর সেটা কতটা ভয়াবহ হবে। 

মশাবাহিত নতুন ধরণের ভাইরাস

ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার পতঙ্গ বিশারদ ড: জোনাথন ডে বলেন – “পতংবিদেরা যেহেতু পোষকবাহিত রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব নিয়ে কাজ করে সেহেতু তারা নতুন ধরণের এক অণুজীব নিয়ে শঙ্কিত”। তার এই কথার মূলে রয়েছে আওবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন। যেসব জায়গায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো সেগুলো ক্রমশ শুষ্ক ও মরূময় হয়ে যাচ্ছে। এসব জায়গায় বসবাসকারী জীবদেরও অভিপ্রয়ান ঘটছে। এর মধ্যে আছে মশাও।

আর যখনই মশার মতো পোষক নতুন কোনো এলাকায় যায় তখন সেখানকার নানা রকম প্যাথোজেন নতুন পোষকের সন্ধান পায়। যা হয়তো এতদিনে পোষকের অভাবে সুপ্ত অবস্থায় ছিল অথবা পুরোনো পোষক এই প্যাথোজেন গুলোকে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ ছিল না। নতুন পোষক আর প্যাথোজেনের এমন মিশ্রণ হঠাৎ করেই কোনো অঞ্চলে প্রাণঘাতী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এর সব থেকে টাটকা উদাহরণ ইবোলা ভাইরাস। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন অসংখ্য জীবজন্তু ও পতঙ্গকে অভিপ্রায়নে বাধ্য করছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে ইবোলার মতো বা তার চাইতে ভয়ঙ্কর কোনো ভাইরাসকে ধ্বংসলীলা চালাতে দেখার আশংকা থেকেই যাচ্ছে।

মশা বাহিত নতুন কোন ভাইরাস ডেকে আনতে পারে মহাবিপদ; Image Source: Medical News Today

হয়তো এগুলো কেবলই সম্ভবনা। তবুও আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আর নিজেদের পরিবেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যও সচেতন হতে হবে। পৃথিবীটাকে বৃক্ষ শূন্য না করে বনায়ন করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে সীমার বাইরে যেতে দেয়া উচিত না। নইলে আমাদের চরম ক্ষতি

আমরাই ডেকে আনবো।