দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম ফাইল সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত এজন্য আমরা মোবাইল বা কম্পিউটারের মেমোরিকেই ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু আমাদের ভিতর কেউ কেউ আছে অতিরিক্ত সাবধানি। মোবাইল বা কম্পিউটারে সংরক্ষিত ডেটা যেকোনো সময় নষ্ট হয়ে বা খোয়া যেতে পারে বলে আমরা সেগুলো গুগল ড্রাইভ, আই ক্লাউড প্রভৃতিতে সংরক্ষণ করি।

আমাদের ভিতরেই অনেকে আবার নিছকই প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে আপলোড করে কিংবা মেইলে ড্রাফট করে রাখি। কারণ আমরা জানি, অনলাইনে আপলোডকৃত এসব ডেটা কোনোদিনই হারিয়ে যাবে না। আমরা যখন খুশি, যেকোনো জায়গায় বসে, স্রেফ ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমেই সেগুলোর নাগাল পেয়ে যাব।

কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, অনলাইনে আপলোডকৃত এসব ডেটা আসলে কোথায় জমা হয়? এই জিনিসটি বুঝতে গেলেই আগে আমাদেরকে জানতে হবে ক্লাউড কম্পিউটিং সম্পর্কে।

নিজেদের অজান্তেই ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের সাহায্য নিই আমরা; Image Source: Vizocom

ক্লাউড কম্পিউটিং

ক্লাউড মানে হলো মেঘ। আমরা সকলেই জানি, সূর্যের তাপে আমাদের আশেপাশের জলাশয়ের পানি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘে জমা হয়। অর্থাৎ একসময় যে পানি এই পৃথিবীর বুকে অবস্থান করছিল, সেটি পরবর্তীতে আকাশে মেঘের ভিতর গিয়ে জমা হচ্ছে। ঠিক এমনটাই ঘটে থাকে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে। যেকোনো ডেটা আমরা প্রথম আমাদের নিজেদের মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্য যেকোনো ডিভাইসের মাধ্যমে তৈরি করি। এরপর সেগুলোকে অনলাইনে আপলোড করার পর, সেগুলো গিয়ে ক্লাউডে জমা হয়।

সাধারণত আমরা বিনামূল্যেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ডেটা বিভিন্ন পাবলিক ক্লাউডে সংরক্ষণ করতে পারি। যাদের খুব বেশি ডেটা সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না, তাদের এই সীমিত ধারণক্ষমতার ক্লাউড দিয়েই বেশ ভালোরকম কাজ চলে যায়। আবার অনেক পেশাদার ব্যক্তিই আছে যাদের সংরক্ষণ উপযোগী প্রচুর পরিমাণে ডেটা আছে, যা বিনামূল্যে উপলব্ধ ক্লাউডের ধারণক্ষমতার বাইরে। সেক্ষেত্রে তারা কোনো কোম্পানির সার্ভার থেকে নিজেদের প্রয়োজনমাফিক ক্লাউড স্পেস ভাড়া নিয়ে থাকে। এভাবে অনলাইনে ডেটা মজুদ রাখার পদ্ধতিকেই বলা হয় ক্লাউড কম্পিউটিং।

ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের রয়েছে বিভিন্ন সংজ্ঞা; Image Source: Net Solutions

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে, “নানা রকমের কম্পিউটার উৎস, যেমন নেটওয়ার্ক, সার্ভার, স্টোরেজ, সফটওয়্যার এবং সার্ভিস নেটওয়ার্কের সাহায্যে ক্রেতার সুবিধা অনুসারে, তার চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে কিংবা তার প্রয়োজন হওয়ামাত্রই, সহজে ব্যবহার্য সুযোগ প্রদান বা ভাড়া দেয়ার পদ্ধতিকে বলা হয়ে থাকে ক্লাউড কম্পিউটিং।”

বর্তমানে অনলাইনে যেসব ক্লাউড দেখা যায়, সেগুলোর বেশিরভাগই আসলে খুব বড় আকারের ডেটা সেন্টার। হাজার হাজার সার্ভার সেখানে র‍্যাকে করে সাজানো থাকে। আর লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করতে হয় সেগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্য।

বৈশিষ্ট্য

ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মূলত ৩টি বৈশিষ্ট্য থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারী বা গ্রাহকের ডেটা ও বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনকে কোনো সেবাদাতার সিস্টেমে আউটসোর্স করা হয়ে থাকে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

রিসোর্স ফ্লেক্সিবিলিটি: সবার সাথে খাপ খাওয়াতে পারার সক্ষমতা। ক্লাউড কম্পিউটিং নির্দিষ্ট কোনো ক্রেতা নয়, বরং ছোট-বড় সব ধরনের ক্রেতারই চাহিদা পূরণ করতে পারে। ক্রেতা যতটুকু সার্ভিস লাভে ইচ্ছুক, সার্ভিস প্রোভাইডার সেই পরিমাণ সার্ভিসই তাকে দেবে।

যেকোনো ডিভাইস থেকে ডেটা স্থানান্তর করা যায় ক্লাউডে; Image Source: Amity Coding Club

অন ডিমান্ড: ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। ক্রেতা যখন চাইবে, তখনই সার্ভিস প্রোভাইডার তাকে সেই সার্ভিসটি দেবে।

পে অ্যাজ ইউ গো: মূল্য পরিশোধের ধরনটিও অনেক বেশি সহজ। ক্রেতাকে আগে থেকে কোনো সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হয় না। সে যতটুকু সার্ভিস গ্রহণ করবে, সেই অনুযায়ী তার মূল্য পরিউশোধ করলেই চলবে।

বিভিন্ন ধরনের ক্লাউড

বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ক্লাউডকে মূলত তিনভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে:

পাবলিক ক্লাউড

যখন একটি ক্লাউড পে-পার-ইউজের ভিত্তিতে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তখন তাকে পাবলিক ক্লাউড বলে। এক্ষেত্রে ক্রেতার ক্ষেত্রে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের অবকাঠামো কিংবা সার্ভারের লোকেশন সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ থাকে না। স্ট্যান্ডার্ড ক্লাউড কম্পিউটিং মডেল অনুসারে পাবলিক ক্লাউড গড়ে উঠেছে। এধরনের ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের উদাহরণ হলো: অ্যামাজন ইসি২, উইন্ডোজ আজুরে, আইবিএম ব্লু ক্লাউড ইত্যাদি।

প্রাইভেট ক্লাউড

এগুলো হলো আভ্যন্তরীণ ডেটা সেন্টার যা বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের গোপনীয়তার কথা মাথায় রেখে গড়ে তোলা হয়, এবং সাধারণ মানুষ এগুলোর নাগাল পায় না। নাম থেকেই বোঝা যায়, এধরনের ক্লাউডকে ক্রেতা তার নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এধরনের ক্লাউড পাবলিক ক্লাউডের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকে। এক্ষেত্রে ভার্চুয়ালাইজেশন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। একটি প্রাইভেট ক্লাউডের হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানির নিজস্ব সার্ভারে হয়ে থাকে। যেমন: ইউক্যালিপটাস, ভিএমওয়্যার।

প্রতিটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই ক্লাউডের সাথে যুক্ত; Image Source: IT Pro

হাইব্রিড ক্লাউড

প্রাইভেট ও পাবলিক ক্লাউডের মিলিত রূপকে বলা হয়ে থাকে হাইব্রিড ক্লাউড। কোম্পানিগুলো সাধারণ ব্যবহারের প্রয়োজনে তাদের নিজেদের অবকাঠামো ব্যবহার করে থাকে, কিন্তু হেভি নেটওয়ার্ক ট্রাফিক কিংবা হাই ডেটা লোডের ক্ষেত্রে তারা বাইরে থেকে ক্লাউড ভাড়া করে আনে।

ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎ

ভবিষ্যতে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের জগতে বেশ কিছু বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সেগুলো হলো:

ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সাথে সাথে, ক্লাউডের ধারণক্ষমতাও ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, এমনটিই আশা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো আরো বড় বড় অনলাইন ডেটা সেন্টারের ব্যবস্থা করতে। সিসকো অ্যানালাইসিসের মতে, খুব শীঘ্রই ডেটা সেন্টারে মজুজকৃত ডেটার পরিমাণ ৩৭০ এক্সাবাইটে দাঁড়াবে, এবং সামগ্রিকভাবে ডেটা হবে ৬০০ এক্সাবাইট। এবং বছরখানেকের মধ্যেই তা ১.১ জেটাবাইটও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইন্টারনেটের মান বৃদ্ধির ফলে গ্রাহক চাহিদা বৃদ্ধি

শীঘ্রই বিশ্বের অনেক দেশে ফাইভ জি ইন্টারনেট কানেকশন চলে আসবে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনলাইনে ডেটা আপলোড করা যাবে। তাই এতদিন ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে যারা বড় আকারের ডেটা ফাইল ক্লাউডে আপলোড করত না, তারাও এখন সেগুলো আপলোডে আগ্রহী হবে। ফলে ক্লাউড ব্যবহারকারীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

শীঘ্রই বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে; Image Source: VN Express International

গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে আইও

বিগত বছরগুলোতে প্রযুক্তি দুনিয়ার বড় অংশ জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) এবং এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স)। কিন্তু ভবিষ্যতে ক্লাউড কম্পিউটিংকে আরো বেশি প্রভাবিত করবে আইওই (ইন্টারনেট অব এভরিথিং)। এটি নির্ভর করবে মেশিন টু মেশিন মিথস্ক্রিয়তা, প্রক্রিয়া, ডেটা, এবং মানুষ কীভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতে এগুলো ব্যবহার করছে তার উপর।

নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে

বিগত বছরগুলোতে সাইবার আক্রমণের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গেছে। ফলে ইতিপূর্বে ক্লাউড যতটা নিরাপদ ছিল, ভবিষ্যতে হয়তো তা আর থাকবে না। পেইড ও প্রাইভেট ক্লাউডগুলো হয়তো নিরাপদ থাকবে, কেননা সেগুলোর সার্ভিস প্রোভাইডাররা নিজেদের স্বার্থেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু পাবলিক ক্লাউডগুলোতে ব্যবহারকারীদের প্রাইভেসি অনেকটাই ক্ষুন্ন হবে। সহজেই তাদের ডেটা চুরি যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।