প্রযুক্তি আমাদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে, কিংবা প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারছি – প্রযুক্তির গুণগান করতে গিয়ে এ ধরনের কথা আমরা প্রায়ই বলে থাকি। কিন্তু সেগুলো কি কেবলই কথার কথা? মোটেই না। বাস্তবিকই প্রযুক্তি আমাদেরকে আজ সভ্যতার এমন এক দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে, যা অতীতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই অলীক ও অবাস্তব বলে মনে হতো।

এ তালিকা থেকে বাদ পড়েনি স্বয়ং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক অনেক গবেষকও। আজকাল আমরা নিত্যদিন যেসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলেছি, শুরুতে সেগুলোর কার্যদক্ষতা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এবং বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও সাফল্য সেসব ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণে সমর্থ হয়েছে।

চলুন পাঠক, আজ এই লেখার প্রথম পর্বে জেনে নিই কম্পিউটার, গাড়ি, টিভি ও টেলিফোন সম্পর্কিত কিছু ভবিষ্যদ্বাণী, যা পরবর্তীতে আর ধোপে টেকেনি।

প্রযুক্তি বিষয় অনেক ভবিষ্যদ্বাণীই ভুল প্রমাণিত হয়েছে; Image Source: The Guardian Nigeria

কেউ বাড়িতে কম্পিউটার রাখতে চাইবে না

কম্পিউটার হলো আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় আশির্বাদ, যা পরবর্তীতে আরো অনেক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করেছে। এখন কর্মক্ষেত্রের বাইরেও, প্রযুক্তিপ্রেমী প্রায় সকল মানুষের বাড়িতেই একটি পারসোনাল কম্পিউটার রয়েছে, কিংবা তারা সবসময় তাদের সাথে একটি ল্যাপটপ বহন করে থাকে।

অথচ মজার ব্যাপার হলো, প্রথম প্রথম অনেকেই কম্পিউটারের বিস্তৃত সম্ভাবনা সম্পর্কে আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, কম্পিউটারের ব্যবহার বুঝি খুবই নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই তো ১৯৪৩ সালে আইবিএমের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থমাস ওয়াটসন বলেছিলেন, “আমার মনে হয় বিশ্বব্যাপী মাত্র পাঁচটির মতো কম্পিউটারের বাজার আছে।”

পারসোনাল কম্পিউটার; Image Source: Tek Revue

তবে সে-ও তো সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কথা। তখন যদি কেউ কম্পিউটারের অপার সম্ভাবনা সম্পর্কে বুঝে না থাকেন, তাকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ১৯৭৭ সালেও কম্পিউটারকে চিনতে ভুল করেছিলেন ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা কেন ওলসেন। তিনি বলেছিলেন, “কোনো কারণই নেই যে কেউ তাদের বাড়িতে একটি কম্পিউটার রাখতে চাইবে।”

অথচ আজ বিশ্বব্যাপী দুই বিলিয়নেরও বেশি পারসোনাল কম্পিউটার রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন অন্তত তিন বিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে।

গাড়ি কেবলই খামখেয়ালি, মানুষের মস্তিষ্ক এর সাথে তাল মেলাতে পারবে না

রাস্তায় বেরিয়ে দেখুন, চারিদিকে গাড়ির ছড়াছড়ি। এত বেশি গাড়ি চলছে রাস্তায় যে, বিশাল বড় যানজট তৈরি হয়ে রয়েছে শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে, যা ডিঙিয়ে সময়মতো নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানো আপাত অসম্ভব ব্যাপারই বটে। অবশ্য এ কথাও স্বীকার করতেই হবে যে, ইঞ্জিনচালিত এসব গাড়ি আমাদের জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে, দূরকে করেছে আপন।

অথচ ১৯০৩ সালে মিশিগান সেভিংস ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হেনরি ফোর্ডের আইনজীবী হোরেস র‍্যাকহ্যামকে তার অর্থ নিরাপদে রাখার জন্য সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “ঘোড়া সবসময়ই থাকবে, কিন্তু অটোমোবাইল কেবলই একটি খামখেয়ালী উদ্ভাবন।”

অটোমোবাইল; Image Source: WallpaperUP

এর পরের বছরই, ১৯০৪ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত একজন মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ ও একজন চিকিৎসকের মধ্যকার বিতর্ক নিয়ে। তাদের বিতর্কের বিষয়বস্তু ছিল উচ্চগতিতে অটোমোবাইল চালনা, যেহেতু মস্তিষ্ক তার সাথে তাল মেলাতে পারে না।

সেই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, “এটি এখনো প্রমাণিত হয়নি যে আমাদের মস্তিষ্ক কত দ্রুত ভ্রমণে সক্ষম। এটি যদি নিজে থেকে আট মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিই অর্জন করতে না পারে, তাহলে ঘণ্টায় ৮০ মাইল গতিতে চলতে গেলে সেক্ষেত্রে মস্তিষ্ক মোটেই সাড়া দেবে না, এবং তার ফলে বিভিন্ন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।”

আজ নিশ্চয়ই কারো মনে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে গাড়ি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী খেয়াল নয়, বরং এটি নিত্যদিনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। তাছাড়া আমাদের মস্তিষ্ক ঘন্টায় কেবল ৮০ মাইল গতিই না, এরচেয়েও আরো অনেক বেশি গতিতে ভ্রমণেও সক্ষম।

টিভি বেশিদিন টিকবে না

শেষ কবে টিভি দেখেছেন? কেউ হয়তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেই টিভি রিমোটটি হাত থেকে রেখেছেন, আবার কেউ বা সপ্তাহ বা মাসও পেরিয়ে গেছে বোকা বাক্সে চোখ রাখেননি। যেহেতু বর্তমানে বিনোদনের আরো অনেক মাধ্যম চলে এসেছে, তাই এখন টিভি আর আগের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয় আমাদের সকলের জীবনে।

কিন্তু তাই বলে আজ থেকে সাত দশকেরও বেশি সময় আগে এক মুভি মুঘল টিভি নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের নির্বাহী প্রযোজক ডেরিক জানুক ১৯৪০’র দশকে টিভির ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেছিলেন, “আগমনের ছয় মাসের বেশি সময় পৃথিবীর কোনো বাজারেই টিভি তার দখল ধরে রাখতে পারবে না।”

টেলিভিশন; Image Source: Wikimedia Commons

জানিয়ে রাখা ভালো, ১৯২০’র দশক থেকে মেকানিকাল টিভি সেট উৎপাদন শুরু হয়, যদিও তখন মাত্র হাজারখানেক মানুষের বাড়িতে টিভি সেট ছিল। ১৯৩৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টিভি সেট ছাড়ার পরই প্রথম টিভি সেট জনপ্রিয়তা লাভ শুরু করে।

১৯৪৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানুক যখন কথাগুলো বলেছিলেন, ততদিনে তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে একশোটিরও বেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়ে গেছে। সম্ভবত টিভিকে তিনি চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলেন বলেই টিভি সম্পর্কে এমন বিষোদগার করেছিলেন। দাবি করেছিলেন, পরপর কয়েকদিন টিভি পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকেই মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠবে।

তবে টিভি বিষয়ক এ ভবিষ্যদ্বাণীও শেষ পর্যন্ত মেলেনি। অন্যান্য অনেক বিনোদন মাধ্যম আসার ফলে তরুণ প্রজন্ম টিভির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেললেও, বয়োজ্যোষ্ঠদের কাছে টিভি আজও প্রধান বিনোদন মাধ্যম। আর তাই সার্বিকভাবেও টিভির শীর্ষস্থান অপরিবর্তনীয়ই রয়েছে। এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী ১.৪ বিলিয়ন পরিবারে অন্তত একটি করে টিভি সেট রয়েছে।

টেলিফোন কোনো কাজেরই নয়

যখন টেলিফোনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন মানুষ কীভাবে দূরের কারো সাথে যোগাযোগ করত? এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল শম্বুকগতির ডাকব্যবস্থা। কারো সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাসও অপেক্ষা করতে হতো।

সেরকম দুরবস্থা থেকে আমাদেরকে রক্ষায় টেলিফোন ঠিক কতটা অবদান রেখেছে, তা আর নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার হলো, আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল যখন প্রথম টেলিফোনের পেটেন্ট নিলেন, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অনেক বিশারদই এর গুরুত্ব ঠাহর করতে পারেননি।

১৮৭৬ সালে প্রথম আধুনিক টেলিফোনের পেটেন্ট নেন বেল। কিন্তু এরপর যখন তিনি তার সেই পেটেন্ট ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেন, কোম্পানিটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম অর্টন বলেন, “টেলিফোনের এত বেশি দুর্বলতা ও খামতি আছে যে, এটিকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করাই সম্ভব না।”

টেলিফোন; Image Source: Unsplash

একই ভাবে ১৮৯০’র দশকে ওয়েলসের স্যার উইলিয়াম হেনরি প্রিস বলেছিলেন, “আমেরিকানদের টেলিফোনের দরকার থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের নেই। আমাদের বার্তা আদান-প্রদানের জন্য প্রচুর পরিমাণে পত্রবাহক আছে।”

কিন্তু দেখুন, ছোটখাট খামতিগুলোকে দূর করে টেলিফোন কিন্তু ঠিকই নিজের জন্য একটা পাকাপোক্ত জায়গা তৈরি করে নিতে পেরেছে। আর শুধু আমেরিকানরা না, গোটা বিশ্বের মানুষই টেলিফোন ব্যবহার করছে। এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী সাত বিলিয়ন টেলিফোন সক্রিয় রয়েছে।