আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে ভবিষ্যৎ পৃথিবী খোলনলচে বদলে যাবে, ধারণ করবে একদম নতুন ও ভিন্নতর এক রূপ। ২০১৯ সালে পৃথিবীটাকে আমরা যেভাবে দেখছি, তিন দশকের সামান্য বেশি সময় পর, ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনটা থাকবে না। বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে মানুষ হিসেবে আমাদের নিয়তিতেও।

এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কথা বলছিলাম কীভাবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে আমাদের উপর নজরদারি বেড়ে যাবে, প্রথম উদার রাষ্ট্রের জন্ম হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, বিটকয়েনের কাছে হার মানবে কাগজের মুদ্রা, মানুষ জৈবিক অমরত্ব লাভ করবে এবং বাস্তবায়িত হবে প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ। এগুলো ছাড়াও ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে ঘটবে উল্লেখযোগ্য আরো কিছু ঘটনা। আমাদের দুই পর্বের এ আয়োজনের দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে সেগুলোর উপরই আলোকপাত করব।

রোবট আমাদের চাকরি ছিনিয়ে নেবে

আর মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটের পক্ষে সম্ভব হবে মানুষের উপযোগী যেকোনো শারীরিক পরিশ্রম করা। সেলুনে চুল কাটা থেকে শুরু করে রান্নাঘরে রান্না করা কিংবা রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশন করা, এতদিন যে কাজগুলোতে মানুষের একক আধিপত্য ছিল, সেগুলোতে ভাগ বসাবে রোবট। ইতিমধ্যেই মানুষের অনেক কাজ রোবটের দখলে চলে গেছে এবং যত সময় এগোতে থাকবে, এর মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে

কর্মক্ষেত্রে মানুষের জায়গা দখল করবে রোবট; Image Source: The Conversation

যখন মানব কর্মশক্তির বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হবে রোবট, তখন প্রধানত দুইটি ঘটনা ঘটবে।

প্রথমত, বেশিরভাগ মানুষই (বিশেষত যারা অশিক্ষিত বা স্বল্প-শিক্ষিত) তাদের চাকরি হারাবে। ফলে নিজেদের এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য জীবিকা নির্বাহের কোনো রাস্তাই আর তাদের সামনে খোলা থাকবে না। ফলে পৃথিবীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাসরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকবে, যাদের পক্ষে জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাটুকু পর্যন্ত মেটানো সম্ভব হবে না।

মুদ্রার অপর পিঠে দেখা যাবে যে, যারা আগে থেকেই ধনী ছিল তাদের ধন-সম্পদের পরিমাণ আরো বেড়ে গেছে এবং বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদই তাদের করায়ত্তে চলে গেছে। এমতাবস্থায় বিশ্বের ধনী দেশসমূহের সরকারের পক্ষে হয়তো সকল অধিবাসীর জন্য ন্যূনতম আয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে, কিন্তু দরিদ্র দেশের সরকার তা করতে ব্যর্থ হবে। তখন প্রধানত বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে, হয় আপনাকে উচ্চশিক্ষিত, বিচক্ষণ ও কর্মদক্ষ একজন ব্যক্তি হতে হবে যাতে আপনি নিজের প্রয়োজন নিজে মেটাতে সক্ষম হবেন, আর নয়তো আপনার জন্য কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করবে।

অটোমেটেড রোবট ট্যাক্সি; Image Source: TechSpot

দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ সুবিধা ও পণ্যের বিনিময় মূল্য অনেক হ্রাস পাবে। বর্তমানে অধিকাংশ সুবিধা বা পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের সিংহভাগ খরচ হয় শ্রমক্ষেত্রে এবং এর কারণেই যেকোনো সুবিধা বা পণ্যের মূল্য অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে যন্ত্রই সেসব শ্রমসাপেক্ষ কাজ করে দেবে, যা একসময় মানুষকে ঘাম ঝরিয়ে করতে হতো।

আর যন্ত্রের মাধ্যমে কাজগুলো করতে সময়, শ্রম ও খরচ সবই অপেক্ষাকৃত কম হবে। ফলে ঐসব সুবিধা বা পণ্য অনেক সুলভে পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্বচালিত ট্যাক্সির কথা। ট্যাক্সিরা যেহেতু নিজে থেকেই রাস্তায় পরিচালিত হবে। তাই ট্যাক্সি সুবিধা পেতে আপনাকে আর ট্যাক্সি চালককে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। ফলে ট্যাক্সি সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে এ সুবিধা দিতে পারবে।

মানুষের সাথে রোবটের মিথস্ক্রিয়া হবে সবচেয়ে বেশি; Image Source: Tufts University – Graduate Programs

অধিকাংশ শারীরিক মিথস্ক্রিয়ার জায়গা দখল করে নেবে রোবটকেন্দ্রিক মিথস্ক্রিয়া

২০৫০ সালের মধ্যে আমরা পেয়ে যাব উন্নত, মানবসদৃশ সহযোগী, গৃহদাস এবং সেক্স রোবট। এগুলো মানুষের চাহিদা মেটাতে এতটাই সক্ষম হবে যে, মানুষ এগুলোকে ব্যবহার করেই তাদের অধিকাংশ সামাজিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে। তাছাড়া রোবটের সাথে মিথস্ক্রিয়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো, রোবটের নিজস্ব কোনো ইচ্ছাশক্তি নেই (তাদের একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো আমাদের আদেশ মানা)।

পাশাপাশি তাদের কোনো অনুভূতিও থাকবে না, অর্থাৎ তারা রাগ করবে না, বিরক্ত হবে না, এমনকি প্রচন্ড পরিশ্রমের পরও ক্লান্তি অনুভব করবে না। তাই তারাই হয়ে উঠবে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। তাদের সঙ্গ লাভের জন্য মানুষের এটা ভাবা লাগবে না যে, তাদের নিজেদের কোনো প্রয়োজন, চাহিদা বা ইচ্ছা রয়েছে কিনা। এর ফলে মানুষ রোবটের সাথে মিথস্ক্রিয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করবে। এভাবে সকল মানুষই রোবটের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ায়, আন্তঃমানবিক মিথস্ক্রিয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়বে এবং এক সময় তা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

মিথস্ক্রিয়ার প্রধান মাধ্যম হবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি; Image Source: Medium

অধিকাংশ আন্তঃমানবিক মিথস্ক্রিয়া ঘটবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভূত উন্নতি ও অসাধারণত্বের কারণে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ কাজই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় স্থানান্তরিত হবে। মানুষ তখন কেবল গেমস খেলতে বা চলচ্চিত্র দেখার জন্যই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রবেশ করবে না, পাশাপাশি তাদের অধিকাংশ অবসর সময়ও কাটাতে শুরু করবে নিজের বিভিন্ন অবতার ব্যবহার করে ভার্চুয়াল ভ্রমণের জন্য। মানুষের জীবনে অনেকাংশেই ‘সারোগেট’ ছবিটির প্রতিফলন দেখা যাবে। পার্থক্য থাকবে শুধু এটিই যে, মানুষের কোনো দ্বিতীয় শারীরিক সত্তা থাকবে না। কেবল তাদের মিথস্ক্রিয়াগুলোই হবে ভার্চুয়াল দুনিয়ার মাধ্যমে

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির আরো বেশি জনপ্রিয়তার পেছনে একটি বড় কারণ হবে এটিও যে, বাস্তব জগতে মানুষের সাথে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকতে পারে, কিংবা তারা বিভিন্ন অপরাধের শিকার হতে পারে। কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে, অন্তত মানুষের শারীরিক সত্তার জন্য।

সীমান্ত অতিক্রম হবে আরো কঠিন; Image Source: Amazon

সীমান্ত অতিক্রম এবং আন্তঃদেশ ভ্রমণ হয়ে উঠবে আরো কঠিন

অবৈধ অভিবাসী সংকট এবং জঙ্গিবাদের কারণে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ হয়ে উঠবে অনেক বেশি কঠিন ও ঝামেলার একটি বিষয়। বেশিরভাগ দেশের সরকারই তাদের দেশে ভিনদেশী প্রবেশের সুযোগ সীমিত করে দেবে। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের পক্ষে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশে প্রবেশ হয়ে উঠবে অত্যন্ত দুরূহ একটি ব্যাপার।

কিছু কিছু দ্বীপরাষ্ট্র আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে, এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণ করবে যে, আকাশপথে ছাড়া অন্য কোনোভাবেই সেখানে ভিনদেশী কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে যেহেতু দেশগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে যাবে। তাই নিরাপত্তা জোরদার করতে তারা সেই প্রযুক্তির মাধ্যমেই পাল্টা আঘাত হানবে। ফলে মানুষের পক্ষে বিশ্বভ্রমণ একসময় অবাস্তব কল্পনায় রূপ নেবে।