২০১৯ সালে রয়েছি আমরা। চলতি শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে, অর্থাৎ ২০৫০ সাল পর্যন্ত পৌঁছাতে এখনো তিন দশকেরও বেশি সময় লাগবে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, তাতে আন্দাজ করতে মোটেই কষ্ট হয় না যে, ২০৫০ সাল নাগাদ আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে পৃথিবী নামক সৌরজগতের ছোট্ট এই গ্রহে। কিন্তু কী কী পরিবর্তন ঘটবে? ২০৫০ সালের পৃথিবী কেমন হবে? এ সংক্রান্ত দুই পর্বের আয়োজনে আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

আরো বেশি নজরদারি

প্রতি বছরই ডিজিটাল মনিটরিং হয়ে উঠছে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুলভ ও সহজলভ্য। তাই এমনটি ভাবার কোনো কারণই নেই যে, সরকার ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো আমাদের উপর থেকে নজরদারি সরিয়ে ফেলবে। বরং সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে নজরদারি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়ার।

মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর চলবে নজরদারি; Image Source: Re-Work

খুব সম্ভবত চীনে বর্তমানে যে ধরনের জন ও সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা জারি রয়েছে, ঠিক তেমনই কিছুর দেখা মিলবে বাকি গোটা বিশ্বেও। তবে তফাৎটা হলো এই যে, ততদিনে এই ব্যবস্থাগুলোতে আরো অনেক বেশি আধুনিকায়ন ঘটবে এবং জীবনে চলার পথে প্রতিটি পদে পদে নজরদারির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো রাস্তাই খোলা থাকবে না।

জন্ম হবে প্রথম উদারবাদী সরকার ব্যবস্থার

নতুন মুক্ত রাষ্ট্র গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মুক্তভূমির স্বল্পতা। বহু বছর আগেই পৃথিবীর যাবতীয় ভূমি বিভিন্ন দেশের সরকার নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে এবং এখন তারা কেউই এক চুল পরিমাণ জমিও হাতছাড়া করতে রাজি নয়। এমনকি অর্থের বিনিময়ে ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রেও তাদের বেজায় ওজর-আপত্তি।

তবে সুখবর হলো, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির কল্যাণে বিভিন্ন কৃত্রিম দ্বীপরাষ্ট্র সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। ফলে যেসব দেশ জনসংখ্যার আধিক্যজনিত সমস্যায় ভুগছে, তারা ঐসব দ্বীপরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারবে।

কৃত্রিম দ্বীপ; Image Source: Reddit

নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, নিরাপত্তার অভাব। সেই সাথে রয়েছে বিশাল সৈন্যবাহিনীকে সহায়তা প্রদানের মতো পর্যাপ্ত অর্থের অভাবও। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন এবং সৈন্যবাহিনীর রোবটায়ন সেই সমস্যারও কার্যকর সমাধান নিয়ে আসবে। সৈন্যবাহিনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযুক্তি সেই সৈন্যবাহিনীতে উল্লেখযোগ্য শক্তি যোগ করবে, ফলে তারা অন্যান্য দেশের মানবসমৃদ্ধ সৈন্যবাহিনীর চেয়ে অনেকাংশে এগিয়েও যাবে।

বিটকয়েন হবে পৃথিবীর প্রধান মুদ্রা

অনেক অর্থনীতিবিদেরই ধারণা এই যে, বিটকয়েন খুব শীঘ্রই বিশ্বব্যাপী কাগজের মুদ্রার বিকল্প হিসেবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে। কত শীঘ্রই? অনেকে তো এমনও বিশ্বাস করেন যে, পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকটের পরপরই, যেটি কিনা আগামী ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে যেকোনো সময়ে হাজির হতে পারে। তবে এত দ্রুত বিটকয়েনের সাম্রাজ্য স্থাপিত না হলেও, ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে তা নিশ্চিতভাবেই হবে। তখন সরকারি ইস্যুকৃত অর্থকে সাধারণ মানুষ বিশ শতকের সমাজতান্ত্রিক যুগের বিষয় বলে মনে করতে শুরু করবে।

বিটকয়েন হবে পৃথিবীর প্রধান মুদ্রা; Image Source: BBC

বিটকয়েনের পাশাপাশি অন্যান্য কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সিও টিকে যাবে, বিশেষত যারা মানুষকে বাস্তবিক সুবিধা প্রদান করতে পারবে। তবে এধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিমাণ বিটকয়েনের তুলনায় ১০ শতাংশেরও কম হবে।

মানুষকে চ্যালেঞ্জ জানাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; Image Source: Development Logics

আগমন ঘটবে মানুষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার

যন্ত্রের উপর কম্পিউটারের শক্তি প্রতি দুই বছরে দ্বিগুণ হচ্ছে। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ (এখন থেকে ৩১ বছরের মধ্যে) কম্পিউটার বর্তমানের তুলনায় ৩০ হাজার গুণ দ্রুতগতি ও বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হয়ে উঠবে। তাছাড়া মানুষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো ২০৫০ সালের আগেই চলে আসবে। ২০৫০ সাল নাগাদ সর্বোৎকৃষ্ট বুদ্ধিমত্তার (সুপার ইন্টেলিজেন্স) অস্তিত্ব প্রকট হওয়াও একপ্রকার নিশ্চিত।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঘটবে প্রভূত উন্নতি; Image Credit: Eve/REX Shutterstock

মানুষ অর্জন করবে জৈবিক অমরত্ব

এর মানে হলো, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের এমন সব নিরাময় আবিষ্কার করতে সম্ভব হবেন যে, তা মানুষের আয়ুষ্কালকে অবিশ্বাস্য রকম বাড়িয়ে দেবে। এমন নয় যে তখন মানুষ অমর হয়ে যাবে, কেউ আর মারা যাবে না, কেননা তা অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাছাড়া দরিদ্র, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এত সহজে এসব সুযোগ-সুবিধা পৌঁছাবেও না। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যু কিংবা শারীরিক অথর্বতাও এড়ানো সম্ভব না। তবে এটুকু অন্তত বলা যায় যে, বর্তমান সময়ে মানুষ জীবন বলতে যে কয় বছর মনে করে, তখন তাকে নিতান্তই নগণ্য বলে মনে হবে।

সম্ভব হবে প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ; Image Source: Poison Control

প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়িত হবে

জনসংখ্যার আধিক্য বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম বড় সমস্যা, আর এর নেপথ্যে প্রধান কারণ হলো উচ্চ জন্মহার। তবে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশে ইতিমধ্যেই জন্মহার প্রাকৃতিক সংরক্ষণশীলতার হারের তুলনায় কমে গেছে (প্রতি দুইজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দুইটি শিশু) এবং ভবিষ্যতে তা আরো কমবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জন্মহার এখনো অনেক বেশি, এবং কেবলমাত্র তাদের কারণেই গোটা বিশ্বকে এখনো জনসংখ্যার আধিক্যে ভুগতে হচ্ছে।

ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সরকার হয় সন্তান গ্রহণের সীমারেখা বেঁধে দেবে (প্রতি দম্পতির একটি সন্তান) কিংবা জোরপূর্বক মানুষকে নির্বীজ করে দেবে যাতে তারা চাইলেও বংশবৃদ্ধি করতে না পারে। পদ্ধতি যেটিই হোক, তার ফলস্বরূপ ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়িত হবে। কেউ চাইলেই আর যত ইচ্ছা সন্তান পৃথিবীতে আনতে পারবে না।