মাত্র বছর পাঁচেক আগের কথা। তখনো অ্যামাজন কেবলই ছিল একটি দারুণ জনপ্রিয় অনলাইন রিটেইলার, এবং বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অনলাইন ওয়েব হোস্টিং কোম্পানিদের একটি। এছাড়া তাদের নিজস্ব কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইসও ছিল, যার মধ্যে প্রধান হলো কিন্ডল ই-বুক রিডার। অনলাইন বুক স্টোর হিসেবে যাদের পথচলা শুরু হয়েছিল, নতুন ও প্রযুক্তি নির্ভর প্রজন্মের জন্য তারা যে এমন কিছু একটা নিয়ে হাজির হবে, তাতে নতুনত্ব থাকলেও বিস্ময়ের উপাদান খুব বেশি ছিল না।

তবে সেই অ্যামাজন যে আজ প্রযুক্তি জগতে এক নবযুগের সূচনা করে ফেলল, ব্যক্তিগত কম্পিউটিং ও যোগাযোগের আঙ্গিনায় স্টিভ জবসের আইফোনের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিতে সমর্থ হলো, এর অন্তরালের রহস্য কী? কীভাবে এক সময়কার অনলাইন রিটেইলার অ্যামাজন এখন আরো বড় কিছু হয়ে উঠল? এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের। আরো সুস্পষ্ট করে বলতে গেলে, অ্যামাজনের একো স্মার্ট স্পিকার এবং অ্যালেক্সা ভয়েস রিকগনিশন ইঞ্জিনের।

অ্যামাজন একো; Image Source: Rakuten

শুরুর দিকে সবকিছুই যেন ছিল এক রোমাঞ্চকর কল্পকাহিনীর মতো। ২০১৪ সালে নভেম্বর মাসে একো বাজারে ছাড়ে অ্যামাজন। অ্যালেক্সা ভয়েস রিকগনিশন ইঞ্জিন সমৃদ্ধ এই ডিভাইসটিকে বলা চলে আলাদিনের প্রদীপের দৈত্যের উচ্চ প্রাযুক্তিক সংস্করণ, যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে মানবকন্ঠে নির্দেশিত যেকোনো বাক্য শ্রবণ করে, ইন্টারনেট কানেক্টেড ডেটাবেজে মিলিয়ন মিলিয়ন শব্দ স্ক্যান করে, মুহূর্তের মধ্যেই একটি ফলাফল হাজির করতে সক্ষম।

এখন, প্রায় ৫০ মিলিয়ন একো ডিভাইস বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর, অ্যামাজনের এই অসাধারণ প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ৮০টি দেশে – আলবানিয়া থেকে শুরু করে জাম্বিয়া পর্যন্ত, এবং দৈনিক গড়ে তা ১৩০ মিলিয়ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।

আলেক্সান্দ্রিয়ায় অবস্থিত প্রাচীন মিশরীয় লাইব্রেরির নাম থেকে অনুপ্রাণিত অ্যালেক্সাকে যেকোনো গানের অনুরোধ করা যেতে পারে। এছাড়া সে মুহূর্তের মধ্যেই দিতে পারে যেকোনো স্থানের আবহাওয়া বার্তা, কিংবা যেকোনো খেলার লাইভ স্কোর আপডেট। চাইলে সে আপনাকে কৌতুক শোনাতে পারবে, আপনার ট্রিভিয়া প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, কিংবা আপনাকে আস্ত কোনো সংবাদ বা কাহিনীও শুনিয়ে দিতে পারবে।

আলেক্সান্দ্রিয়ার এই প্রাচীন মিশরীয় লাইব্রেরি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই নামকরণ হয়েছে অ্যালেক্সার; Image Source: Wikimedia Commons

তবে মজার ব্যাপার হলো, অ্যামাজন নিজে কিন্তু এই ভয়েস-রিকগনিশন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেনি। এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটেছে আরো কয়েক দশক আগেই, এবং মূলধারার ভয়েস অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে এর আবির্ভাবও ঘটেনি অ্যামাজনের হাত ধরে। অ্যালেক্সার কয়েক বছর আগে থেকেই বাজারে ছিল অ্যাপলের সিরি এবং গুগলের অ্যাসিসট্যান্ট। তাছাড়া অ্যামাজন যখন অ্যালেক্সা নিয়ে এলো, ঠিক ওই সময় মাইক্রোসফটও এনেছিল কর্টানা।

কিন্তু অ্যালেক্সা ও একোর সাফল্যের কারণে, প্রযুক্তির এই বিশেষ বিভাগটিতে শীর্ষস্থানে পৌঁছে যায় অ্যামাজন। তারাই বাজারে নিয়ে আসতে থাকে বিভিন্ন ‘স্মার্ট’ হোম ডিভাইস, যেগুলো এখন অনেকের কাছেই পারসোনাল কম্পিউটার কিংবা এমনকি স্মার্টফোনের সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেভাবে গুগলের সার্চ অ্যালগরিদম অনলাইনে তথ্য ও বিজ্ঞাপনের অঙ্গনে মাইলফলক স্থাপন করেছে, ঠিক একইভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত ভয়েস কম্পিউটিংয়ের সামনেও বর্তমানে রয়েছে স্মার্ট হোম ডিভাইস ধারণাটি নিয়ে বহুদূর যাওয়ার সম্ভাবনা।

অ্যালেক্সার কারিগর ভারতের ঝাড়খন্ডের রোহিত প্রসাদ; Image Source: Zee News

অ্যামাজনের ল্যাবরেটরিতে অ্যালেক্সার প্রধান বিজ্ঞানী রোহিত প্রসাদ, যিনি অ্যালেক্সাকে এমনকি গুগল সার্চের চেয়েও এগিয়ে রাখেন। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের গ্রাহকদের জন্য তথ্যলাভকে আরো বেশি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে চেয়েছি। আর এক্ষেত্রে কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কার্যকর আর কী-ই বা হতে পারে। এটি কেবল একটি সার্চ ইঞ্জিনই নয়, যা আপনাকে একগাদা সার্চ রেজাল্ট দেখিয়ে বলবে, যেকোনো একটি বেছে নাও। এটি সরাসরি আপনাকে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে।”

একটি নতুন, কন্ঠস্বর পরিচালিত অভিজ্ঞতার সাথে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সমন্বয়ে ‘ভয়েস টেক’ প্রতিযোগিতা এখন দারুণ জমে উঠেছে। অ্যামাজন তো বটেই, পাশাপাশি গুগল, অ্যাপল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট সকলেই প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করছে এই প্রযুক্তির পিছনে। কেননা সকলের মতে, এই প্রযুক্তি হারিয়ে যেতে নয়, টিকে থাকতে এসেছে। সকল টেক জায়ান্ট মিলে বছরে তাদের মোট বাজেটের ১০ শতাংশ ব্যয় করছে ভয়েস রিকগনিশন বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে, যা প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

বাজারে প্রধান লড়াইটা মূলত গুগল ও অ্যামাজনের; Image Source: Cnet

যেহেতু এর পেছনে বিনিয়োগ এত বেশি, তাই প্রতিযোগিতার বাজারও খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। শুরুর সাফল্যের কারণে অ্যামাজন এখনো এগিয়ে রয়েছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত কানেক্টেড স্পিকারের বিশ্ব বাজারে ৪২ শতাংশ দখল ছিল তাদের। অন্যদিকে অনেকটা একোর মতোই গুগল বাজারে এনেছে তাদের গুগল অ্যাসিসট্যান্ট নামক হোম ডিভাইসটি, বাজারে যার শেয়ার ৩৪ শতাংশের মতো। তবে এই মুহূর্তে এটিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।

গ্লোবাল মার্কেট ইনসাইটস নামক একটি গবেষনা প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালে তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বিশ্বব্যাপী স্মার্ট স্পিকার বিক্রি থেকে আয় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার, যা মাত্র ২০২৪ সালের মধ্যেই ৩০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করবে। তাছাড়া মূল স্মার্ট স্পিকারের বাইরেও, টেক জায়ান্টরা এখন তাদের অন্যান্য ডিভাইসের বিক্রি বাড়াতেও সেগুলোতে ভয়েস রিকগনিশন প্রযুক্তি যোগ করছে।

যেমন: ইদানিং অ্যামাজন তাদের সকল ডিভাইসেই রাখছে অ্যালেক্সা পরিষেবা, এবং অন্যান্য সাধারণ ফিচারের পাশাপাশি অ্যালেক্সা লাভের আশায় অনেক ক্রেতাই ঝুঁকছে অ্যামাজনের ডিভাইস ক্রয়ের দিকে। ঠিক একই কাজ করছে গুগলও। পিছিয়ে নেই অ্যাপল, ফেসবুক কিংবা মাইক্রোসফটও।

ভবিষ্যতে মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে ভয়েস টেক; Image Source: interhacktives.com

সব মিলিয়ে স্মার্ট ক্যামেরার পর, ভয়েস টেকই হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবদান যা ইতিমধ্যেই বিশ্ব বাজারে ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে দিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এই প্রযুক্তি যে আরো পরিণত ও সমৃদ্ধ হবে, এবং এক সময় কম্পিউটার কিংবা স্মার্টফোনের মতোই মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। আর তার মাধ্যমে আরো একবার জয় হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের।