আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আগামী তিন দশকের মধ্যে আমাদের এই পৃথিবীর হয়তো আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং তার অধিকাংশই ইতিবাচক ক্ষেত্রে। কিন্তু নেতিবাচক সম্ভাবনাগুলোকেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। যেমন অনেক বিশেষজ্ঞেরই আশঙ্কা, বর্তমান সময়ে প্রতিদিন আমরা যে পরিমাণ পানি অপচয় করছি, তাতে পৃথিবী পৃষ্ঠে নিরাপদ পানি আর খুব বেশি দিন থাকবে না। ২০৫০ সালের আগেই হয়তো পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষ প্রচন্ড পানির অভাবে ভুগতে থাকবে।

এমতাবস্থায় ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা হাজির হয়েছেন বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা আশা করছেন ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে নিরাপদ পানির অভাব সৃষ্টির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা সম্ভব হবে।

পৃথিবীব্যাপী পানি সংকটের হার; Image Source: World Resources Institute

তাদের পরিকল্পনার প্রধান দিক হলো বিশ্বব্যাপী পানি ব্যবস্থায় ক্রমাগত যে চাপ পড়ছে, তা হ্রাস করা। এর মানে হলো, যেসব বর্জ্য পদার্থ পানির সাথে মিশে পানিকে দূষিত ও বিষাক্ত করে তোলে, সেগুলোর উৎপাদনের পরিমাণও সীমিত করা, যাতে অপেক্ষাকৃত বেশি পানি সুপেয় অবস্থায় থাকে। এর পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য হলো দৈনন্দিন প্রয়োজনে পানির ব্যবহার কমানো এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসাও। যাতে পানির উৎসগুলোর সুব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

পানির ব্যবস্থাগুলোতে তখনই চাপ পড়ে, যখন পানির চাহিদা এত বেড়ে যায় যে, ব্যবস্থাগুলো তা মেটাতে পারে না। আমরা এই মুহূর্তে মূলত পৃথিবী পৃষ্ঠে পাওয়া যায় এমন মোট পানির ৪০ শতাংশ ব্যবহার করি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, এই শতক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যাই এক্ষেত্রে প্রভাবিত হবে।

এ প্রসঙ্গে ম্যাকগিল ডিপার্টমেন্ট অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের টম গ্লিসন বলেন,

আমাদের সন্ধানে এমন কোনো সিলভার বুলেট (জাদুকরী শক্তি বা অস্ত্র অর্থে) নেই যার মাধ্যমে আমরা পানির অভাবজনিত এই সংকট মোকাবেলা করতে পারবো। পানির অভাবে ভুগছে এমন জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে কমিয়ে আনা হয়তো সম্ভব, কিন্তু তা বাস্তবায়িত করতে হলে শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত প্রয়াসের প্রয়োজন।


টম গ্লিসন, অধ্যাপক, ম্যাকগিল ডিপার্টমেন্ট অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

পৃথিবীব্যাপী সুপেয় পানির পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান; Image Source: ISIS Neutron and Muon Source

তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি ৬টি ভিন্ন কৌশলগত প্রয়াসের কথা প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে নিরাপদ পানির অভাব দূর করা সম্ভব। তারা এই কৌশলগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করেছে- কঠোর পদক্ষেপ এবং হালকা পদক্ষেপ। কঠোর পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পানির শ্রেয়তর প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে অবকাঠামো গড়ে তোলা। আর হালকা পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়েছে নিরাপদ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনার সামাজিক দিকসমূহের উপর।

মোট দুইটি কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে: একটি হলো বিভিন্ন কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক আধারে পানি সংরক্ষণ, এবং অন্যটি হলো সামুদ্রিক পানির নির্লবণীকরণের পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ।

আনুমানিক হিসাব মতে, পানির আধারগুলোর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে অন্তত ৬০০ ঘনকিলোমিটার করা উচিত। এটি সম্ভব বিদ্যমান আধারগুলোকে সম্প্রসারিত করে এবং একই সাথে নতুন পানির আধার গড়ে তোলার মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া বাস্তুতান্ত্রিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, কেননা আধারসমূহ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক পানির প্রবাহকে বিঘ্নিত করে। তাছাড়া বিদ্যমান আধার সম্প্রসারণ কিংবা নতুন আধার তৈরি করা, উভয়ই যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ ব্যাপার, যা সকল দেশের সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে পানির নীলবর্ণীকরণ প্রক্রিয়ার মাত্রা বাড়াতে হবে; Image Source: New Atlas

সামুদ্রিক পানির নীলবর্ণীকরণ প্রক্রিয়া মূলত উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যবহৃত হবে। সেজন্য নতুন নীলবর্ণীকরণ কারখানা গড়ে তুলতে হবে কিংবা বিদ্যমান কারখানাগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্প্রসারিত করতে হবে। পানির অভাব সৃষ্টি দূরীকরণে পানি প্রক্রিয়ার পরিমাণ অন্তত ৫০ গুণ বৃদ্ধি করতে হবে।

নীলবর্ণীকরণ প্রক্রিয়াও অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ ব্যাপার হবে, কেননা এজন্য প্রয়োজন উচ্চমানের শক্তি এবং দূষিত পানি অবমুক্তির ব্যবস্থা। বর্তমান ব্যবস্থায় উত্তাপ প্রদানের মাধ্যমে পানির নীলবর্ণীকরণে ৪৬ শতাংশ পানি উদ্ধার করা সম্ভব, যেজন্য প্রতি কিউবিক মিটারে ৭ থেকে ১৮ কিলোওয়াট ঘণ্টা পানি প্রক্রিয়াজাত প্রয়োজন। হালকা পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে সেচের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি, সেচের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, ঘরে এবং শিল্পক্ষেত্রে পানি ব্যবহারের উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস করা।

কৃষিক্ষেত্রে পানির ব্যবহার সীমিত করতে হবে; Image Source: World Atlas

ঘরে এবং শিল্পক্ষেত্রে পানির ব্যবহার সীমিতকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, কেননা মানুষ সাধারণত যেভাবে জীবনযাপন করে অভ্যস্ত তা সহজে পরিবর্তন করতে চায় না। এছাড়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হলো পানি সংকট রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস করা।

ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির পরামর্শ অনুযায়ী, পানি সংকট মোকাবেলায় ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা কোনোভাবেই ৮.৫ বিলিয়নের বেশি হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে হার, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা ১৩.৫ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতেই হবে; Image Source: World Atlas

২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮.৫ বিলিয়নের নিচে রাখতে চাইলে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হতে হবে ০.০০৫ শতাংশ। অথচ এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হলো ১.৭ শতাংশ। তাই বলাই বাহুল্য, আরোপিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুবই দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু তারপরও বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট আশাবাদী।

তাদের মতে, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে, কিন্তু তাই বলে এটি একেবারে অসাধ্য কিছুও নয়। পানি সংকট রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে সঠিক পরিবার পরিকল্পনা এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর জনসংখ্যা অবশ্যই সহনীয় মাত্রায় রাখা সম্ভব হবে, আর সেক্ষেত্রে পানি সংকট থেকেও পৃথিবীকে বাঁচানো যাবে।