আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানবজাতির উত্তরোত্তর কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। আজ মানুষ এমন অনেক কাজই করতে পারছে, যা হয়তো পনেরো বা বিশ বছর আগেও অনেকে কল্পনাও করতে পারত না। আরো আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হলো, এটা তো কেবল শুরু। অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে আরো অকল্পনীয় সব উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কি মানুষের কেবল উপকারই করছে? কোনো ক্ষতিই কি করছে না? এ প্রশ্নের উত্তরটি আসলে আপেক্ষিক। বলা যেতে পারে, সব শ্রেণীর মানুষই কম-বেশি উপকৃত হচ্ছে। আর সেই উপকৃতের তালিকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রয়েছে এমন অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধীও, যারা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো অপরাধ সংঘটিত করতে পারে। সেক্ষেত্রে মানবজাতির সিংহভাগ অংশের ক্ষতি হলেও, উপকার কিন্তু ঠিকই হচ্ছে ওই গুটিকতক অপরাধীর।

ফিউচার ক্রাইমস বইয়ের প্রচ্ছদ; Image Source: Amazon

আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে ভবিষ্যতের অপরাধজগতকে প্রভাবিত করবে, এ ব্যাপারে আমাদের অনেকেরই কৌতূহলের অন্ত নেই। আর সেই কৌতূহল মেটাতে সক্ষম মার্ক গুডম্যান রচিত “ফিউচার ক্রাইম” বইটি। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কর্মজীবন শুরু করা গুডম্যান পরবর্তীতে ৭০টিরও বেশি দেশে কাজ করেছেন এফবিআই, ইউএস সিক্রেট সার্ভিস, ইন্টারপোল ও পুলিশের হয়ে।

এভাবে অপরাধবিজ্ঞান সম্পর্কে তিনি লাভ করেছেন অগাধ জ্ঞান। তাছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপরও তার রয়েছে অসাধারণ দখল। এই দুইয়ের মিশেলে তিনি রচনা করেছেন “ফিচার ক্রাইম” বইটি। সেখানে যেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করা রয়েছে ভবিষ্যতের সকল অপরাধ পন্থা সম্পর্কে, প্রযুক্তি যেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।

চলুন পাঠক, জেনে নিই গুডম্যানের মতে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে অপরাধীরা ঠিক কীভাবে কাজে লাগাবে প্রযুক্তিকে।

অনলাইনে অর্থ চুরি

অনলাইনে অর্থ চুরি বা সাইবার হিস্ট প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, আর এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ক্রেডিট কার্ড ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির, যেমন বিটকয়েনের পক্ষে কি অনলাইনে অর্থ লেনদেনের শ্রেয়তর উপায় হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডে হওয়া চুরির অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকলেও, বিটকয়েন চুরি গেলে তা ফিরে পাবার আশা এখন পর্যন্ত নেই বললেই চলে।

বাড়ছে অনলাইনে অর্থচুরির প্রবণতা; Image Source: YouTube

এযাবতকালের সবচেয়ে বড় বিটকয়েন চুরির প্রকাশিত ঘটনা ঘটেছে টোকিওর এমটি জক্স এক্সচেঞ্জে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা সব মিলিয়ে ৪৬০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যমানের বিটকয়েন হারিয়েছে। এখন অবধি সেই অর্থের কোনো হদিস মেলেনি, এবং মেলার সম্ভাবনাও শূন্যের কাছাকাছি।

তার মানে দেখা যাচ্ছে, গোপনীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ লেনদেন খুবই সুবিধাজনক হতে পারে। এমনকি নিরাপত্তার দিক থেকেও ক্রিপ্টোকারেন্সি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগিয়ে থাকে। কিন্তু একবার যদি দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ক্রিপ্টোকারেন্সি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়, যেমনটি হয়েছে টোকিওতে, তাহলে তা আর ফিরে পাবার আশা না করাই ভালো।

ডিভাইস হ্যাকিং

একটা সময় পর্যন্ত হ্যাকিং কেবল পিসি ও স্মার্টফোনেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন ইন্টারনেট অফ থিংস, রোবটস, ড্রোন, চালকবিহীন গাড়ি প্রভৃতির মাধ্যমে হ্যাকিং বাস্তব জগতেও প্রবেশ করে ফেলেছে। এবং ভবিষ্যতে এর গন্ডি আরো বিস্তৃত হবে।

আজকের দিনে ইন্টারনেটের আকার যদি একটি গলফ বলের সমান হয়, আগামীকাল হয়তো তা হবে একটি সূর্যের সমান। কারণ তখন আমরা কেবল পিসি বা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই সংযুক্ত থাকব না, বরং আমাদের সংযোগ থাকবে সম্ভাব্য সকল ডিভাইসেই।

সহজেই হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি; Image Source: Threatpost

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে গাড়ির কথা। বিশ বছর আগেও কেউ চিন্তাই করতে পারত না যে তাদের গাড়িও হ্যাকড হতে পারে। কিন্তু আজ একটি সাধারণ গাড়িতেই অন্তত ২৫০টি মাইক্রোচিপ থাকে, যেগুলোকে দূরে বসেও হ্যাক করা সম্ভব। ধরুন, আপনি হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, আর ঠিক তখনই কেউ একজন আপনার গাড়িয়ে একটি এয়ারব্যাগ স্থাপন করে দিল, কিংবা আপনার গাড়ির ব্রেক বিকল করে দিল – এগুলো কিন্তু খুবই সম্ভব।

তাছাড়া প্রায় সকল ডিভাইসের সাথেই জিপিএস সংযুক্ত থাকবে বলে, ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে যেকোনো দূরত্বে থেকেও কোনো ডিভাইস ও ডিভাইসের মালিকের অবস্থান বের করে ফেলা সম্ভব হবে। অর্থাৎ উন্নত হ্যাকাররা চাইলে যেকোনো ব্যক্তির উপর সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করতে পারবে। তারা কখন কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সবকিছুই তাৎক্ষণিকভাবে জেনে নিতে পারবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অপরাধ

একটা সময় আসবে, যখন মানুষ নিজ হাতে কোনো অপরাধ না করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এক্ষেত্রে কাজে লাগাবে। এমন একটি উদাহরণ আমরা দেখেছি ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডায়। সেখানের এক ছাত্রের নামে এসেছিল তার রুমমেটকে খুন করার অভিযোগ, কারণ রুমমেটটি নাকি তার প্রেমিকার সাথে ডেট করেছিল।

তো সে যা-ই হোক, রাগের মাথায় ছাত্রটি খুন তো করে ফেলেছিল, কিন্তু তারপর তার মাথায় চিন্তা আসে মৃতদেহ কোথায় লুকাবে। বলাই বাহুল্য, এটিই ছিল তার জীবনের প্রথম খুন, তাই খুন পরবর্তী এসব খুঁটিনাটি সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানই ছিল না। উপায়ন্তর না দেখে সে তার আইফোনটি হাতে নিয়ে সিরিকে জিজ্ঞেস করেছিল, মৃতদেহ কোথায় লুকাব। এবং সিরিও ইন্টারনেট ঘেঁটে মৃতদেহ লুকানোর বেশ কিছু উপায় বাতলে দিয়েছিল তাকে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সহজেই সম্পাদন করা যাবে অপরাধ; Image Source: Getty Images

তাহলে বুঝতেই পারছেন, ১৮ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র যদি সিরির মতো অতি সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মৃতদেহ লুকানোর ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে যখন সিরির চেয়েও হাজারগুণ বেশি দক্ষতাসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব ঘটবে, তখন সেগুলো মানুষকে তাদের অপরাধ সম্পাদনে কত বেশি সহায়তা করবে!

নিউরোহ্যাকিং

আজকাল আমরা এফএমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে নিউরোহ্যাকিং ও অন্যের মনের কথা পড়তে পারার ব্যাপারে শুনে থাকি। এই প্রযুক্তিগুলোও অনেক নতুন নতুন অপরাধকৌশল তুলে দিতে পারে অপরাধীদের হাতে।

নিউরোহ্যাকিং; Image Source: Threatpost

প্রথমেই বলা যায় মেমোরি হোস্টেজের কথা। একজন অপরাধী দূরে বসেই কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে বসানো মাইক্রোচিপ হ্যাক করে, তার স্মৃতিশক্তির দখল নিয়ে নিতে পারে। আর তারপর সে মস্তিষ্কের মুক্তিপণ দাবি করতে পারে, যেভাবে বর্তমান সময়ে সশরীরে কোনো ব্যক্তিকে অপহরণ করে তার মুক্তিপণ দাবি করা হয়ে থাকে।

তাছাড়া যদি ব্রেইন ওয়েভ পড়েই কোনো ব্যক্তির মনের কথা জেনে ফেলা যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কের মাইক্রোচিপ হ্যাক করে মাত্র ৩০ শতাংশ তথ্যকে কাজে লাগিয়েই শতভাগ তথ্য জেনে নেওয়া সম্ভব। এভাবে কোনো একজন ব্যক্তির অগোচরেই তার মস্তিষ্ক থেকে তার অনেক বিষয়ে, যেমন তার এটিএম পিন নাম্বার বা দাপ্তরিক গোপন তথ্য জেনে নেওয়া যাবে।