ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে। আবার স্মার্ট টেলিভিশন, স্মার্টফোন, স্মার্ট বাড়ি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন গাড়ি এগুলো ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পের উপরে বিশাল প্রভাব বিস্তার করছে। আর এগুলোর চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবার পিছনে আছে আরও বড়, নতুন ও উদ্ভাবনী পণ্যের উপরে ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। ফলে এই শিল্পের আরাম করে বসে থাকার উপায় নেই, প্রতিনিয়ত গবেষণা করতে হয় এমন সব পণ্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবার জন্য যা কেবল মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েই ক্ষান্ত হবেনা, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা রকম সমস্যা বা চাহিদা সহজে ও কম খরচে পূরণ করতে পারবে।  এই শিল্পকে যতটা চাকচিক্যময় মনে হয় বাইরে থেকে আসলে এর পথ এমন কুসুমাস্তীর্ণ নয়। প্রতিটি সফল ও হৃদয়গ্রাহী পণ্যের পিছনে আছে অসংখ্যবার ব্যর্থ হওয়া প্রোটোটাইপের করুণ গল্প। প্রযুক্তিগত বাঁধা, অসহিষ্ণু ভোক্তা, পণ্য জনপ্রিয় না হবার ভয় চাহিদা কমে যাবার ভয়, এমন আরো অনেক কারণ এই শিল্পের প্রতি পদে বাঁধার সৃষ্টি করে। আজ আমরা এই শিল্পের উপরে প্রযুক্তির প্রভাবের নানান দিক নিয়ে আলোচনা করব।

ভোক্তা পর্যায়ের ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পের চ্যালেঞ্জ

স্মার্টফোন বিপ্লব শেষ হয়ে গিয়েছে বলা যায়। ২০১৬ সালের পর থেকে স্মার্টফোনের বৈশ্বিক চাহিদার পারদ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছে। পুরো এক দশক ধরে স্মার্টফোনের চাহিদার অবিশ্বাস্য ঊর্ধ্বগতি বজায় ছিল। এশিয়ার বাজার বিবেচনা করলে এই চাহিদা ভারতে ছিল ৮০% ও চীনে ছিল ৮৯%। এখন প্রায় সবার হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে যাবার ফলে এই পাগলাটে চাহিদা এখন কমতির দিকে। আগে প্রযুক্তিটি নতুন ছিল, ভোক্তার কাছে চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছিল তাই দাম সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও মানুষ স্মার্টফোন পেতে পাগল ছিল। যখন হাতে ফোন এসে গেছে তখন তারা সেটি নিয়েই খুশি আছে, কিছুদিন পর পর আবার টাকা খরচ করে নতুন সংস্করণ কেনার পিছনে আগ্রহ গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া আর কারো মাঝেই নেই।  শুধু স্মার্টফোনের বাজারেই যে ক্রমান্বয়ে চাহিদা অধঃগতির প্রভাব পড়ছে তা কিন্তু না বরং অন্যান্য সেক্টর গুলো এই একই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। একদম নতুন কোন ধারণা বাজারে ওলটপালট না আনলে বা অবিশ্বাস্য অফার না পেলে চাহিদার অধঃগতি সহজে কমবে না। 

ভোক্তার চাহিদা সব সময় এক রকম থাকেনা; Image Source: matrixprotection.com

ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে নতুন ধারা: এ.আই. আসছে আপনার কাছে

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, টেলিকমিউনিকেশন, বিপণন সর্বক্ষেত্রে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। ভোক্তা সেবা ও অভিজ্ঞতার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্র ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে চলে যাচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন প্রোগ্রাম ও বিগ ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রাহকদের আরও উন্নত সেবা ও অভিজ্ঞতা দিতে কাজ করে যাচ্ছে। মেশিন লার্নিং ও ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এর মাধ্যমে মানুষের সাহায্য ছাড়াই কথা বলতে দক্ষ এমন প্রোগ্রাম তৈরি করা হচ্ছে। এই সব প্রোগ্রামের সুবিধা হল অজানা কোন তথ্য অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে জেনে নিয়ে গ্রাহকের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে সেবা ও তথ্য প্রদান সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন প্রোগ্রাম, মানুষের থেকেও ভালো গ্রাহক সেবা দিতে পারবে।

ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে; Image Source: TechFunnel.com

আপনি পোকেমন গো গেমটি খেলেছেন?

আপনি গেমপ্রেমী না হলেও পোকেমন গো গেমের নাম নিশ্চই শুনেছেন। অনেক জনপ্রিয় এই গেম কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এ.আর. এর উপরে ভিত্তি করে বানানো।  এ.আর. প্রযুক্তিতে বানানো এই গেমের প্রতি মানুষের তুমুল আগ্রহ ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির সম্ভবনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে ২০১৮ সালের দিকেই গুগল বা লেনোভোর মতো কোম্পানিগুলো তাদের স্মার্টফোনগুলোতে এ.আই. ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ক্যামেরার ক্ষেত্রে ডেপথ সেন্সিং ক্যামেরা ও ফিজিক্যাল এনভায়রনমেন্ট ম্যাপিং ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ.আই. প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনিতেই ছবি তোলার ব্যপারে মানুষ তুলনামূলক বেশি আগ্রহী থাকে, এ.আই. প্রযুক্তি এই ছবি তোলার কাজকে পেশাদারী ফটোগ্রাফার থেকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে এর ফলে ঝিমিয়ে পড়া স্মার্টফোনের বাজার আবারো প্রাণ ফিরে পাবে। 

পোকেমন গো গেমটি অগমেন্টেড রিয়েলিটির ভাল উদাহরণ; Image Source: Variety

বাড়ির দরজা লাগাতে ভুলে গিয়েছেন?

এখনকার সবথেকে বেশি আলোচিত বিষয় আধুনিক স্মার্ট বাড়ি। প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতারা গৃহস্থালীর প্রায় সকল পণ্যেই আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এর ফলে সকল পণ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সাথে যুক্ত হচ্ছে। চাইলে দূর থেকেও এসব পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাড়াহুড়ো করে বের হতে যেয়ে বাড়ির দরজায় তালা দিতে ভুলে গেলেও দূর থেকেও দরজা লক করে দেয়া যায়। বাড়ি ফেরার আগেই কফি রেডি করে রাখা যায় বা ঘরের তাপমাত্রা পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করে রাখা যায়। ফলে ব্যবহারকারীরা স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।

দরজায় তালা দেয়া নিয়ে টেনশনের দিন শেষ হতে যাচ্ছে; Image Source: Lifewire

টিভিও স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে

ঘরের সব কিছুই যখন স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে তখন টিভি বাদ থাকবে কেন? যুগের সাথে তাল মিলিয়ে স্মার্ট টিভির চাহিদাও বাড়ছে। স্মার্ট টিভি হচ্ছে টেলিভিশন ও কম্পিউটারের যুগলবন্দী। গবেষণায় দেখা গেছে এখন মোট টেলিভিশনের ৪৮.৫ শতাংশ স্মার্ট টেলিভিশন এবং ২০২০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩৪ মিলিয়নে। স্মার্ট টেলিভিশনের সাথে সাথে আমাজন বা নেটফ্লিক্স এর মত অনলাইন ভিত্তিক স্ট্রিমিং সেবার চাহিদাও বাড়ছে। গ্রাহক চায় টেলিভিশন দেখার পাশাপাশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করতে, খেলা দেখার পাশাপাশি মেইল চেক করতে বা ফেসবুক ব্রাউজ করতে। কে ভেবেছিল ওই বোকা বাক্সটা একদিন এমন বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে? ভোক্তার চাহিদাই আসলে একে বুদ্ধিমান করে ছেড়েছে।

বন্ধু, আমার গাড়িটা কোথায়?

২০০০ সালে ‘ডুড, হোয়্যার ইজ মাই কার?’ নামের এক হলিউডি মুভিতে দেখা যায় দুই মাতাল বন্ধু আগের দিন তাদের গাড়িটি কোথায় রেখেছে সেটা মনে করার চেষ্টা করে। এখন আর এত কষ্ট করার দরকার নেই। আধুনিক গাড়িতে সেন্সর, ইন্টারনেট সেবা যুক্ত থাকে যা আপনি হাতের স্মার্টফোনের মাধ্যমে দেখতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। ফলে ভোক্তার স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। ২০২০ সাল নাগাদ গাড়ির কানেকটিভিটি যন্ত্রাংশের দাম ও সেবার বৈশ্বিক মূল্য দাঁড়াবে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে। 

স্মার্ট কার সেন্সর গাড়ি খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে; Image Source: 9to5Toys

ভোক্তা ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে এগুলোই এখন সবথেকে জনপ্রিয় ধারা। স্মার্টফোন শিল্পে ধীরগতি আসতে পারে, প্রচলিত গাড়ির মধ্যে মানুষ নতুনত্ব না পেতে পারে তবে স্মার্ট বাড়ি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ইন্টারনেট অব থিংস এইসব ক্ষেত্রে আবার প্রাণ ফিরিয়ে আনবে।