ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একটি বড় হুমকির নাম হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন, তা মানবজাতির কোনো উপকারেই আসবে না, যদি না এই পৃথিবীই আর মানবজাতির বসবাসের উপযোগী থাকে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞান থেকে শুরু করে এগুলোর উচ্চতর পর্যায়, সম্ভাব্য সকল পথেই হাঁটা হচ্ছে।

তবে গণিত নিয়ে মাথা ঘামাতে একটু যেন কমই দেখা যাচ্ছে। অনেকেরই হয়তো ধারণা, গণিতের পক্ষে আর কীভাবেই বা জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব! কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞানের অন্য সব শাখা ব্যর্থ হলেও, গণিত তথা সংখ্যা, অ্যালজেব্রা, ত্রিকোণমিতি ইত্যাদি ঠিকই পারবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে। অনেকের কাছেই হয়তো একে অবাস্তব, অলীক কল্পনা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এ-ও যে সম্ভব, কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রমাণ হয়ে যাবে তা।

সুতরাং পাঠক, চলুন আর দেরি না করে জেনে নিই গণিত কীভাবে বাঁচাতে পারে আমাদের এই পৃথিবীকে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করা হয় গাণিতিক সমীকরণের সাহায্যেই; Image Source: Getty Images

আবহাওয়া পূর্বাভাস ও জলবায়ু মডেল তৈরি

সঠিক আবহাওয়া পূর্বাভাসের মাধ্যমে আগে থেকেই জেনে নেয়া সম্ভব পৃথিবীর কোন স্থানে কখন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া দেখা দেবে। আর জলবায়ু মডেলের সাহায্যে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় যে দীর্ঘ পরিসরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আবহাওয়া পরিবর্তনের ধরন কেমন হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জলবায়ু মডেল তৈরিতে বিগত কয়েক দশকে আমরা প্রভূত উন্নতি করেছি, আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ প্রাপ্য গণিতেরই। আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস অনেকাংশে নির্ভর করে কম্পিউটারের উপর, কেননা কম্পিউটারের মাধ্যমে আবহাওয়ার আচরণ পরিবর্তনের বিভিন্ন জটিল সমীকরণের সমাধান বের করা হয়।

সুপার কম্পিউটারকে শক্তিশালী করে তুলতে প্রয়োজন হবে গাণিতিক জ্ঞান; Image Source: Autodesk

অপরদিকে জলবায়ু মডেল তৈরিতে কাজ করে গ্লোবাল সার্কুলেশন মডেল (জিসিএম), যেখানে তাপমাত্রা, বায়ুচাপ ও বায়ুর আর্দ্রতা জটিল সমীকরণের হিসাব মিলিয়ে সমুদ্র ও জলবায়ুর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়ার ধরন বের করা হয়। এভাবেই গণিতের সাহায্যে আমরা আগেভাগেই জেনে যেতে পারি আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কে, যা ভবিষ্যতে আমাদেরকে আরো বেশি উপকৃত করবে।

সুপার কম্পিউটারকে আরো শক্তিশালী করা

যেমনটি আগেই বলেছি, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন পরিমাপে কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ কাজে কম্পিউটারকে ব্যবহারে কেবল বিদ্যুৎ শক্তিই কিন্তু যথেষ্ট নয়। বরং কম্পিউটারকে আরো বেশি কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন গণিতের। গণিতের সাহায্যে একাধারে যেমন সম্ভব কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধন, তেমনই কম্পিউটারে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম নতুন করে তৈরি করাও। গণিতের সাহায্যে অপটিমাইজিং কম্পিউটারের গতিকে আরো চাঙ্গা করা হচ্ছে। আর এধরনের কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ শক্তির পরিমাণও হ্রাস করা সম্ভব।

নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার গণিতের উপর নির্ভরশীল; Image Source: Grantham Institute

নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার

বিশ্বব্যাপী কার্বনের পরিমাণ কমানোর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সঠিক স্থানে বায়ুচালিত কিংবা সৌরচালিত ফার্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। আর এক্ষেত্রে গণিতবিদদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। কেননা তারাই প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে খুজে বের করার চেষ্টা করছেন পৃথিবীর কোন কোন জায়গায় বায়ু ও সৌরচালিত ফার্মগুলো স্থাপন করা উচিৎ হবে।

পরিবর্তনের জন্য তৈরি হওয়া

জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন মাত্রায় আমাদেরকে প্রভাবিত করবে, এবং এজন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে এ ব্যাপারে জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিয়ে অভিযোজন ঘটাতে পারবে, সেই নকশাটি আমাদের জানা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গণিতবিদেরা তাদের সম্ভাব্যতার সূত্রকে কাজে লাগাচ্ছেন, এবং সে অনুযায়ী নীতিনির্ধারকদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও জানা থাকা প্রয়োজন জলবায়ু পরিবর্তন তাদেরকে কীভাবে আঘাত হানবে। এক্ষেত্রেও তারা কম্পিউটার বিশ্লেষণের পাশাপাশি গণিতবিদদের উপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে।

তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব গণিতের মাধ্যমে; Image Source: Education Week

বৃহৎ তথ্যকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত লক্ষ লক্ষ তথ্য প্রতিদিন গবেষকদের কাছে এসে জমা হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে কোনটি যে কাজে লাগবে আর কোনটি কাজে লাগবে না, তা তো আগে থেকে জানা থাকা সম্ভব নয়। তাই প্রাপ্ত সকল তথ্যের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রয়োজন। মানুষের সাধারণ জ্ঞানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব নয়। এগুলোকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত করতেও প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের গাণিতিক জ্ঞান। সঠিক গাণিতিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যদি সকল তথ্যকে ভবিষ্যতের জন্য মজুদ করে রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তীতে সেগুলো কোনো কাজেই আসবে না।

নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হবে গণিতের মাধ্যমেই; Image Source: Grantham Institute

নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন

পৃথিবীতে কার্বনের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বিদ্যমান প্রযুক্তিসমূহ যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি নতুন ধরনের বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োজন। কোন ধরনের নতুন প্রযুক্তি প্রয়োজন, আর কীভাবে সেগুলো গড়ে তোলা হবে, সেগুলো নির্ধারণও অন্য কোনো বিশেষায়িত জ্ঞানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কেবল উন্নত গাণিতিক মস্তিষ্কের মাধ্যমেই এইসব আপাত অসম্ভব সমস্যার কার্যকরী সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব। তারা বিভিন্ন লজিস্টিক প্রক্রিয়া, নেটওয়ার্ক বিশ্লেষন, পরিসংখ্যানগত মডেল এবং গণিতের অন্যান্য বিভিন্ন অনুষঙ্গের মাধ্যমে এ কাজটি করতে পারবেন।

গণিতকে সকলের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা

একটি কথা স্বীকার করতেই হবে যে, গণিতের একার পক্ষে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বেশিরভাগ শাখাই যেহেতু একটি অপরটির সাথে জড়িত, তাই কেবল গণিতের পক্ষে কিছু সম্ভব না। আবার অন্যান্য শাখার বিশেষজ্ঞের পক্ষেও গাণিতিক উচ্চতর দক্ষতা ব্যতীত কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই নিজ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী কিংবা প্রকৌশলী, সকলেই গণিতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে শুরু করবে।

এভাবে গণিত অপরিহার্য হয়ে ওঠায় সবাই গণিতকে আপন করে নিতে থাকবে, ফলে গণিত হয়ে উঠবে সার্বজনীন। আর যত বেশি মানুষ গণিতে দক্ষ হয়ে উঠবে, পৃথিবীর বেঁচে যাওয়ার সম্ভাব্যতাও তত বাড়বে।