কোনো একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডার থেকে যন্ত্র ডাটা নিচ্ছে আবার সেখানে নানা রকম ডাটা পাঠাচ্ছে সেটা ইন্টারনেটপূর্ব যুগে সায়েন্স ফিকশনের গল্প মনে হলেও এখন সেটা বাস্তবতা। আমরা স্বীকার করি আর না করি ইন্টারনেট এখন জীবনের প্রায় প্রতিটি দিককেই নিয়ন্ত্রণ করছে, সব কাজকে সহজ করে দিচ্ছে আর এই বিপ্লবের মূলে আছে ইন্টারনেট অব থিংস (IoT)। সবকিছুরই যেমন একটা শুরু থাকে, তেমনি আইওটি এরও পথচলা শুরু বেশ ঢিমেতালে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আর যুগের চাহিদা মেনে এর পথচলার গতি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে।

কিভাবে এলো আইওটি?

যদিও ইন্টারনেট অব থিংস শব্দটি খুব বেশি পুরনো নয় তবে এর শিকড় কিন্তু বেশ গভীরে প্রেথিত। দুটি আলাদা যন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগের সূচনা কিন্তু হয়েছিল ইন্টারনেট এর জন্মেরও বহু বহু বছর আগে, সেই টেলিগ্রাফ আবিস্কারের সময় থেকেই। এরপর কালের স্রোতে আস্তে আস্তে ইলেকট্রনিক্সের আধুনিকায়নের সাথে সাথে যন্ত্র থেকে যন্ত্রে যোগাযোগের সীমা বা ব্যপ্তি বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ছিল দ্বিপাক্ষিক কিংবা সীমিত পরিসরে একই ধরনের যন্ত্রের মাঝে।

আর ইন্টারনেট অব থিংস, এই শব্দটির জন্য কাউকে কৃতিত্ব দিতে হলে তিনি হবেন কেভিন অ্যাশটন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এর অটো-আইডি সেন্টারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কেভিন অ্যাশটন সর্বপ্রথম ইন্টারনেট অব থিংস শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি যখন প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল এ ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তখন সেখানকার সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের জন্য বানানো একটি প্রেজেন্টেশান এ এই শব্দটি ঢুকিয়ে দেন। কেন?

লিপস্টিকের একটি নির্দিষ্ট শেড না পাবার হাহাকারে! কী রকম? তিনি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলে কিছু নতুন পণ্য লঞ্চ করার দায়িত্বে ছিলেন এবং খেয়াল করলেন তার বাসার পাশের দোকানে লিপস্টিকের একটি নির্দিষ্ট শেড পাওয়া যায় না। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলে বলেন শেষ হয়ে গিয়েছে আবার সাপ্লাই চেইনের দায়িত্বে থাকা লোকেরা বলে স্টকে অনেক পণ্য আছে, হয়তো ঐ দোকানে দেয়া সব পণ্য বিক্রি হয়ে গেছে।

এরপর তার ভাবনায় আসলো কিভাবে এই সকল পণ্য সঠিকভাবে ট্র্যাক করা যায় যেন তিনি বুঝতে পারেন কোথায় কোন পণ্য কী পরিমাণে আছে। সেই একই সময়ে RFID (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) ট্যাগ এর উপরেও কাজ হচ্ছিলো যেগুলো কিছু ডাটা সংরক্ষণ করতে পারে এবং তারবিহীন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ডাটা স্থানান্তর করতে পারে। অ্যাশটন ভাবলেন এই RFID ট্যাগ তার কোম্পানির সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের কাজে ব্যবহার করা যায় যাতে প্রতিটি পণ্য কোন জায়গায় কী পরিমাণে আছে সেটা জানা যায়।


কেভিন অ্যাশটন। আইওটি শব্দের জনক; Image Source: lgcnsblog.com

অ্যাশটনই প্রথম যিনি আমাদের যোগাযোগের ব্যাপ্তি (connection) যে অনেক গভীর সেই বিষয়ে ধারণা দিয়েছিলেন। এরপর এলজি ইলেকট্রনিক্স ২০০০ সালে একটি ফ্রিজ বাজারে আনে ইন্টারনেট ডিজিটাল ডাইওস নামে যেটা কিনা ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত ছিল। আর এটাই ছিল বাজারে আসা প্রথম ইন্টারনেটযুক্ত পণ্য যেটা RFID ট্যাগ স্ক্যান করার মাধ্যমে এর মধ্যে কী কী পণ্য কী পরিমাণে আছে তার হিসাব রাখতে পারতো।

বেচারা এলজি এর কপাল খারাপ কেননা মানুষজন ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি আর দামেও বেশ চড়া হবার কারণে এই ফ্রিজের বিক্রি বাট্টা বেশ কম ছিল। তারপরও এই ভারিক্কি নামের কামেল ফ্রিজই বহু সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় আর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য জিনিসেও ইন্টারনেট ব্যবহার করে নানা সুবিধা আদায় করে নেয়া যায়।


এই সেই এলজি ইলেকট্রনিক্সের ইন্টারনেট ডিজিটাল ডাইওস; Image Source: internetofthings

এরপর ঢিমেতালে, বিক্ষিপ্তভাবে ইন্টারনেট অব থিংস নিয়ে গবেষণা চলতে থাকলেও এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে ২০১০ সালে এসে। এসময় ফাঁস হয়ে যায় যে, গুগলের স্ট্রিট ভিউ প্রোজেক্ট শুধু ৩৬০ ডিগ্রি ছবিই তোলেনি সাথে সাথে মানুষের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক এর বিপুল পরিমাণ ডাটাও স্টোর করেছে। হয়তো তখন থেকেই গুগল আর শুধু ইন্টারনেটের ওয়েব পেজের ইনডেক্সের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে জাগতিক দুনিয়ারও ইনডেক্স করা শুরু করে দিয়েছে।

একই বছরে চীনা সরকার ঘোষণা করে তারা তাদের পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্যে ইন্টারনেট অব থিংস কে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেবে। ২০১১ সালে এসে বাজার গবেষণা সংস্থা ‘গার্টনার’ তাদের উদীয়মান নতুন টেকনোলজির লিস্টে ইন্টারনেট অব থিংসকে নতুন ফেনমেনন (Phenomenon) হিসেবে আখ্যায়িত করে। ২০১২ তে ইউরোপের সব থেকে বড় ইন্টারনেট কনফারেন্সের থিম ছিল ‘ইন্টারনেট অব থিংস’। এরপর থেকেই সবথেকে বড় ও জনপ্রিয় প্রযুক্তি ভিত্তিক সাময়িকীগুলো এই ফেনমেননকে ‘আইওটি’ নামে পরিচিত করা শুরু করে।

আইডিসি (IDC) ২০১৩ সালের অক্টোবরে রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, ২০২০ সাল নাগাদ ইন্টারনেট অব থিংস এর বাজার দাঁড়াবে ৮.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এরপর মানুষ নড়ে চড়ে বসে যখন গুগল ২০১৪ সালে ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে আইওটি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নেস্ট’ কে কিনে নেয়। একই বছরে লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স শো (CES) এর থিম ও ছিল ইন্টারনেট অব থিংস।

২০১৪ সালে গুগল, নেস্টকে কিনে নেয়; Image Source: tech.co

বর্তমানে ইন্টারনেট অব থিংস এর গবেষণার ক্ষেত্র

লিগ অব স্কলারস, শীর্ষ ৫০০ আইওটি গবেষকের গবেষণার উপর ভিত্তি করে ইন্টারনেট অব থিংস এর বর্তমান গবেষণার শীর্ষ ক্ষেত্রগুলোকে খুঁজে বের করেছেন। এর জন্য তারা বিবেচনা করেছেন গবেষকদের উদ্ধৃতি, জনসংযোগ, শিল্প সংযোগ আর তাদের জার্নাল এর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর। এই শীর্ষ ক্ষেত্রগুলো হলো –

  • ওয়্যারলেস সেন্সর নেটওয়ার্ক
  • ক্লাউড কম্পিউটিং
  • বিগ ডাটা
  • সর্বব্যাপী কম্পিউটিং
  • ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম
  • সাইবার-ফিজিকাল সিস্টেম
  • পারভাসিভ কম্পিউটিং
  • এম্বেডেড সিস্টেম
  • মোবাইল কম্পিউটিং
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
  • মেশিন লার্নিং
  • সিকিউরিটি
  • সিমাটিক ওয়েব
  • নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি
  • সেন্সর নেটওয়ার্ক
  • ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক
  • আরএফআইডি (RFID)
  • স্মার্ট সিটি

ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি; Image Source: axis.com

এই সকল ক্ষেত্রের গবেষণাই প্রয়োগ করা হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য হাজারো যন্ত্রের মাঝে যা আমাদের জীবনকে করছে আরও সহজ এবং গতিময়। এখন যদি আমরা এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ চিন্তা করি তাহলে সেখানে আছে সীমাহীন সুযোগ আর অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, খরচ, মান এবং আরও অনেক বিষয়। এখন দেখা যাক ইন্টারনেট অব থিংসকে আমরা কোন পথে চালিত করি।