যখন ক্যালিফোর্নিয়ার হাই স্পিড রেললাইন অনুমোদিত হলো তখন অন্য আরও অনেকের মতো আমিও হতাশ ছিলাম। সিলিকন ভ্যালির মতো জায়গা, যা বিশ্বের সমস্ত জ্ঞানের সূচি তৈরি করে ফেলছে বা মঙ্গল গ্রহে রোভার পাঠানোর মতো অবিশ্বাস্য সব কাজ করে ফেলছে সেখানে এমন একটি রেল স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে যেটা প্রতি কিলোমিটারের হিসেবে সবথেকে ব্যয়বহুল একই সাথে ধীরতম!

এলন মাস্ক

কথাগুলো এলন মাস্কের, উদ্যোক্তা এবং টেসলা ও স্পেস-এক্স এর প্রধান নির্বাহী। তবে তার সব থেকে বড় পরিচয়, তিনি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। তবে অধিকাংশ মানুষ থেকে তার বড় পার্থক্য তিনি সবার মতো স্বপ্ন দেখে সেটা ভুলে যাননা বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগে পড়েন।

এই কথা তিনি বলেছিলেন যখন তিনি জানতে পারেন, সরকার লস এঞ্জেলস থেকে সানফ্রানসিসকো পর্যন্ত ব্যয়বহুল হাই স্পিড ট্রেন লাইন অনুমোদন করেছে। সিলিকন ভ্যালির মতো জায়গা যা সারা দুনিয়ার বেশ কয়েক কদম আগে চলে সেখানে এমন প্রকল্প তার মনপুত হয়নি। কিন্তু পছন্দ হয়নি বলে সেটা দাঁত কিড়মিড় করে জানিয়ে নিজের কাজে হেঁটে যাবার মানুষ তিনি নন। তাই নিজেই উঠেপড়ে লাগলেন এর থেকে ভাল সমাধান খুঁজে বের করার জন্য। আর তার ফলাফল হলো হাইপারলুপ।

হাইপারলুপ কী

এলন মাস্কের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, হাইপারলুপ হচ্ছে এমন একটি বায়ুশুন্য টিউব যার মধ্য দিয়ে ম্যাগনেটিক লেভিটেশন আর ভ্যাকুয়াম পাম্প ব্যবহার করে মানুষ বা মালবাহী পড দ্রুতগতিতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চলাচল করবে। এখানে ঘর্ষণ বা বায়ুর বাধা না থাকার কারণে পডের গতি শব্দের গতি ছাড়িয়ে যাবে। আর এটা শুধু দ্রুতগতিরই হবে না, সেই সাথে সস্তা ও পরিবেশবান্ধব হবে।

২০১৩ সালে মাস্ক প্রথম এই ধারণা দেন। ৫৭ পাতার এক শ্বেতপত্রে তিনি তার পরিকল্পনা এবং কিভাবে এটি কাজ করবে তার কারিগরি ব্যাখ্যা দেন। এরপরই মূলত গোটা পৃথিবী নড়েচড়ে বসে। তিনি অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও এগিয়ে আসার আহবান জানান। এর প্রেক্ষিতে বেশ কিছু কোম্পানি এই কাজে মনোনিবেশ করে।

হাইপারলুপ; Image Source: The Times

হাইপারলুপের ইতিহাস

এলন মাস্কের কল্যাণে হাইপারলুপ শব্দটা মোটামুটি ‘হাইপ’ হয়ে গেলেও এর ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরানো। গোড়া খুঁজে বের করতে গেলে বলা যায় ভ্যাকুয়াম টিউব আবিষ্কারের পর থেকেই হাইপালুপের ইতিহাস শুরু।

  • আবিষ্কারক জর্জ মেডহর্স্ট ১৭৯৯ সালে বাতাসের চাপ ব্যবহার করে কাস্ট আয়রনের পাইপের ভিতর দিয়ে পণ্য পরিবহনের একটি ধারণা দেন। তিনি ১৮৪৪ সালে লন্ডনে একটি স্টেশনও বানিয়ে ফেলেন যা ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
  • ১৮৫০ সাল নাগাদ লন্ডন, প্যারিস ও ডাবলিনে আরও বেশ কয়েকটি বায়ুচাপ কেন্দ্রিক রেলওয়ে গড়ে ওঠে। এর মাঝে লন্ডনেরটি ডাক বিভাগের জন্য বানানো হলেও এটি যাত্রীও পরিবহন করতো। ১৮৬৫ সালে ডিউক অব বাকিংহাম নিজে চড়ে এর উদ্বোধন করেছিলেন।
  • ১৮৬০ সালের মাঝামাঝি দক্ষিণ লন্ডনে ক্রিস্টাল প্যালেস রেলওয়ে গড়ে ওঠে যেটা চলত বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। ২২ ফুট ব্যাসের একটি পাখার ঘূর্ণন ট্রেনটিকে সামনে টেনে নিয়ে যেত। আবার ঐ পাখার উল্টো ঘূর্ণন ট্রেনটিকে পেছনে নিতে পারত।
  • আলফ্রেড এলি বিচের ডিজাইন করা ‘বিচ নুম্যাটিক ট্রানজিট’ ছিল নিউ ইয়র্কের বর্তমান সাবওয়ের পূর্বপুরুষ। ম্যানহাটনে ১৮৭০ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত চালু থাকা এই রেল ছিল এক কামরার শাটল যা সংকুচিত বায়ু ব্যবহার করে চলত।
  • ১৯ শতকের শেষ নাগাদ অধিকাংশ বড় শহরের চিঠি ও অন্যান্য বার্তা প্রেরণের জন্য সংকুচিত বায়ু নির্ভর টুউব সিস্টেম চালু ছিল। এখনো কিছু কারখানা, হাসপাতাল বা ব্যাংকে এই ব্যবস্থা চালু আছে।

পোস্ট অফিসে ব্যবহার করা নুম্যাটিক টিউব; Image Source: Culture Trip

  • নাসাও ১৯৬০ এর দিকে অফিসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য নুম্যাটিক টিউব সিস্টেম ব্যবহার শুরু করে। মিনেসোটার এডিনায় অবস্থিত ম্যাকডোনাল্ডস ২০১১ সাল পর্যন্ত তার কাস্টমারদের কাছে বিগ ম্যাক বার্গার ও ফ্রাই পৌঁছে দিতো এই টিউব সিস্টেমে।
  • রকেটের অগ্রদূত রবার্ট গডার্ড ১৯১০ সালে একটি ট্রেন ডিজাইন করেন যেটি বোস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক যেতে পারবে মাত্র ১২ মিনিটে। যদিও এটি নির্মাণ করা হয়নি। সম্ভবত এটি ভ্যাকুয়াম টিউবের ভিতরে চুম্বক দ্বারা ভাসমান অবস্থায় থাকবে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল।
  • বিশ শতকের শুরুর দিকে সাইন্স ফিকশন লেখক ও বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরিবহন ব্যবস্থার কথা কল্পনা করেছিলেন যা অনেকটা হাইপারলুপের মতো কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সায়েন্স ফিকশন লেখক রবার্ট হাইনলিনের কথা, যিনি ১৯৫৬ সালে “ডাবল স্টার” গল্পে প্রথম “ভ্যাকু টিউব” সম্পর্কে লিখেছিলেন।

সাইন্স ফিকশনের ভ্যাকু টিউব; Image Source: Business Insider

  • মাস্কের ম্যাগনেটিক ট্র্যাকের মতো করেই এমআইটির গবেষকরা ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে ৪৫ মিনিটে বোস্টন থেকে নিউইয়র্কে পৌঁছানো যাবে এমন একটি ভ্যাকুয়াম ট্রেনের ডিজাইন করেছিলেন।
  • ২০০০ দশকের গোড়ায় এটি-৩ একটি ম্যাগলেভ ট্রেনের ডিজাইন করে যেটিতে এলিভেটেড টিউবের ভিতর দিয়ে গাড়ি আকারের ছোট ছোট পড চলাচল করতে পারে।
  • অনেকটা একই রকম একটি প্রোজেক্ট ২০১০ সালে ব্রিটেনে প্রকাশিত হয় যা মাটির নিচে দিয়ে টিউবে করে খাদ্য পরিবহন করবে। কেবলমাত্র ধারণা হিসেবে থেকে যাওয়া এই প্রকল্পের খরচ ছিল প্রতি মাইলে ৮ মিলিয়ন ডলার।
  • এর ৩ বছর পরে এলন মাস্ক ৫৭ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রে হাইপারলুপ নিয়ে তার ধারণা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, একটি বায়ুনিরোধী পডে করে ২৮ জন মানুষ ২৯ মিনিটে নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটনডিসিতে যেতে পারবে।

এলন মাস্কের প্রস্তাবিত পডের ডিজাইন; Image Source: The Verge

  • হাইপারলুপ ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজিস নামে একটি স্টার্টআপ মাস্কের ধারণার উপর ভিত্তি করে ২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার কোয়ে ভ্যালিতে ৫ মাইল লম্বা ট্র্যাক নির্মাণ শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ঘণ্টায় ৭৬০ মাইল গতি অর্জন করা।
  • ২০১৭ এর জুলাই মাসে হাইপারলুপ ওয়ান নামের এক স্টার্টআপ কোম্পানি নেভাদার ডেভলুপ টেস্ট ট্র্যাকে সফল ভাবে পরিপূর্ণ পরীক্ষা চালায়। ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে তারা ঘণ্টায় ৭০ মাইল গতি অর্জন করতে পারলেও তাদের লক্ষ্য ঘণ্টায় ২৫০ মাইলে পৌঁছানো।

হাইপারলুপ ওয়ান; Image Source: Wired

  • ২০১৭ সালে চায়নিজ একাডেমি অফ সায়েন্সের একদল বিজ্ঞানী এলন মাস্কের ধারণার উপর ভিত্তি করে সাবমেরিন রেল প্রজেক্টের ঘোষণা দেন যার তাত্ত্বিক গতি হবে ১২৪০ মাইল প্রতি ঘণ্টায়।

এই সব স্বপ্ন হয়তো একদিন বাস্তবে রূপ নেবে আর তখন ব্যয়বহুল আকাশপথের দিকে তাকিয়ে না থেকে হাইপারলুপ ব্যবহার করেই চোখের নিমিষে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলা যাবে।