নিত্যদিনের যানজট আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়! নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রাস্তায় যে পরিমাণ সময় আমাদেরকে প্রতিদিন ব্যয় করতে হয়, তা আমাদের কর্মক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আমরা কোনো কাজ করতে বাসা থেকে বের হই, কর্মস্থলে গিয়ে তার অনেকটাই উবে যায়।

তাই যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি আমাদের সকলের কাছেই পরম প্রার্থনীয় একটি বিষয়। আমরা চাই, এমন সব যানবাহনের আবির্ভাব ঘটুক, যেগুলো আমাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ইতিমধ্যেই যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। তবে উন্নতির এই যাত্রা শেষ হওয়ার এখনো ঢের বাকি। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে এমন সব আধুনিক যানবাহনের আগমন ঘটবে, যেগুলো আমাদের জীবনকে করে তুলবে আরো অনেক বেশি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।

চলুন পাঠক, আর দেরি না করে জেনে নিই ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে আমাদেরকে ‘পিক-আপ’ করার জন্য অপেক্ষা করে আছে কী কী উত্তরাধুনিক যানবাহন।

অটোনোমাস কার

অটোনোমাস কার মানে হলো সেইসব গাড়ি যেগুলো চালনার জন্য আলাদা কোনো মানব-চালকের প্রয়োজন হয় না, গাড়িগুলো নিজেরাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সেই সাথে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইন্টারনেট অব থিংস এবং লিডার উদ্ভাবনের বদৌলতে অটোনোমাস কার এখন আর কোনো সুদূর কল্পনা নয়, বরং তা একটি সম্ভাব্য বাস্তবতা। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বৃহৎ গাড়ি উৎপাদনকারী কোম্পানি অটোনোমাস কার বাজারে আনার ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে। বিশ্বের কিছু আধুনিক শহরে ট্রায়াল রানও চলছে কয়েকটি অটোনোমাস কারের।

অটোনোমাস কার; Image Source: BBC

অটোনোমাস কার বিপ্লবের অগ্রপথিক হলো ওয়েমো ও টেসলা। তাছাড়া সিলিকন ভ্যালি-ভিত্তিক আত্মচালিত গাড়ির সফটওয়্যার ডেভেলপিং স্টার্ট-আপ, ড্রাইভ ডট এআই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা গ্রাহকদেরকে ফ্রিসকো, টেক্সাসে বিনামূল্যে অটোনোমাস কারে চড়ার সুযোগ করে দেবে। ধারণা করা হচ্ছে যে, কয়েক দশকের মধ্যেই অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করবে অটোনোমাস কার।

কনভার্টিবল ক্যাব কাম স্টোর

রাইড শেয়ারিং গাড়িসমূহ ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তারা তাদের প্রাথমিক কার্যপ্রণালীতে আরো নিত্য-নতুন সুবিধার ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি তাদের বৈচিত্র্যও আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে। টয়োটা ইতিমধ্যেই একটি ধারণা নিয়ে কাজ করছে, যেখানে তারা ই-প্যালেট নামক এক ধরনের যান তৈরি করবে। এটি একাধারে যেমন সাধারণ ক্যাবের কাজ করবে, তেমনই নিজেদের সুবিধামত ব্যবহারকারীরা এটিকে যেকোনো মার্চেন্ডাইজ বা পণ্য বিক্রির স্টোর কিংবা ডেলিভারি ভ্যানেও রূপান্তরিত করতে পারবে।

কনভার্টিবল; Image Source: CNN

বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, এমন গাড়িসমূহ হয়তো সকালবেলায় ক্যাব হিসেবে ব্যবহৃত হবে, বিকালবেলায় টি-শার্ট স্টোর হিসেবে, আর রাতের বেলা ফুড-ডেলিভারি ভ্যান হিসেবে। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ভ্যান ও বাসের সিটগুলোকেও ভবিষ্যতে এমন রূপান্তরযোগ্যভাবে গড়ে তুলবে যেন, সেগুলোকেও কনভার্টিবল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

ফিউচারিস্টিক সাবওয়ে

প্রযুক্তির অভাবনীয় সব ধারণার উদ্ভাবনে টেসলা এবং এর প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের কোনো তুলনাই হয় না। তাদের নতুন আরেকটি উদ্ভাবন হলো স্থানীয়ভাবে নির্মিত, ফিউচারিস্টিক সাবওয়ে সিস্টেম। ইতিমধ্যেই ধীর গতিতে সাবওয়ে সিস্টেম নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিউচারিস্টিক লুপের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে পুরোদমে।

ফিউচারিস্টিক সাবওয়ে; Image Source: The Guardian

টেসলা শেষ করে ফেলেছে শহরে তাদের প্রথম দফা টানেল নির্মাণের কাজ, যা গাড়ি কিংবা পথচারীদেরকে ঘন্টায় ১৫০ মাইল বেগে চলাচলের সুযোগ করে দেবে। এই সিস্টেমের ফলে সাধারণ মানুষকে আর যানজটের ঝক্কি পোহাতে হবে না। পাশাপাশি কিছুদূর পরপর বাহন পরিবর্তনও করতে হবে না তাদেরকে। তবে এই নতুন প্রযুক্তিকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্তও বলা যাচ্ছে না। এখনো হয়তো এটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে যখন এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, আর প্রচুর মানুষ একসাথে টানেলে প্রবেশের চেষ্টা করবে, তখন যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটবে না, সে নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ এ প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচালেও, তাদের নিরাপত্তা বিধানে অক্ষম।

হাইপারলুপ

ভবিষ্যৎ পৃথিবীর আরেকটি কার্যকরী যাতায়াত ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে হাইপারলুপ। এটি মূলত সিল করা এক ধরনের টিউব বা টিউব-সিস্টেম, যার মাধ্যমে একটি পড বায়ু প্রতিরোধক অবস্থায় দ্রুতগতিতে ছুটে চলতে পারবে। টেসলা এবং হাইপারলুপ ওয়ান হলো সবচেয়ে বড় দুইটি কোম্পানি, যারা হাইপারলুপ সৃষ্টির পেছনে কাজ করে চলেছে।

হাইপারলুপ ব্যবহার করে যাত্রীরা ঘন্টায় ৬০০ মাইলেরও বেশি বেগে যাতায়াতের সুযোগ পাবে, যা বর্তমানের সবচেয়ে দ্রুতগতির ট্রেনেরও দ্বিগুণের বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেই হাইপারলুপ প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে স্যান ফ্রান্সিসকো এবং বাল্টিমোর।

হাইপারলুপ; Image Source: Getty Images

এছাড়া টেসলা নেভাডায় ৫০০ মিটারের একটি টেস্ট ট্র্যাকও গড়ে তুলেছে। তবে হাইপারলুপ নির্মাণে আরো অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে আছে। যেমন হাজার হাজার মাইল জমির উপর দিয়ে ভ্যাকুয়াম টিউব তৈরি করা, এবং সেজন্য বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করা। তাছাড়া হাইপারলুপকে সব সময় একটি সোজা রেখা বরাবরও চলতে হবে, যাতে করে যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে না পড়ে। পরিবেশগত সুরক্ষার দিকটিও মাথায় রাখতে হবে, অন্যথায় প্রশাসন হাইপারলুপকে চূড়ান্ত অনুমোদন না-ও দিতে পারে।

ফ্লাইং ট্যাক্সি

ফ্লাইং ট্যাক্সি বা গাড়ির চিন্তাটি সর্বপ্রথম এসেছে বিভিন্ন সাইন্স ফিকশন উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে। আর তখন থেকেই মানুষ স্বপ্ন দেখে এসেছে, একদিন বাস্তবেই এটির দেখা মিলবে। আশার কথা হলো, অবশেষে তাদের সেই স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। উবার, বোয়িং, এয়ারবাসের মতো বিশাল বিশাল সব কোম্পানি ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিকে বাস্তব করে তোলার জন্য কাজ করে চলেছে। এমনকি এই প্রযুক্তির ব্যাপারে উৎসাহের কমতি নেই সিলিকন ভ্যালির স্টার্ট-আপদের মাঝেও। উবার পরিকল্পনা করেছে ২০২৩ সালের মধ্যে ফ্লাইং ট্যাক্সির কার্যক্রম শুরু করে দেয়ার, আর এক্ষেত্রে তারা সহায়তার জন্য জুটি গড়ে তুলেছে স্বয়ং নাসার সঙ্গে।

ফ্লাইং ট্যাক্সি; Image Source: The Telegraph

এই দুইয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, উবার নাসাকে জানাবে তাদের আর্বান এভিয়েশন রাইডশেয়ার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে। এরপর নাসা সেটিকে তাদের এয়ারস্পেস ম্যানেজমেন্ট কম্পিউটার মডেলিংয়ে ব্যবহার করে যাচাই করে দেখবে যে ছোটখাট এয়ারক্র্যাফটগুলো শূন্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।