মানুষ যখন বৈদ্যুতিক বা স্বয়ংক্রিয় যানবাহন নিয়ে কথা বলে তখন তারা আসলে বলে গাড়ির কথা। কিন্তু শুধু গাড়ি না, এই পরিবর্তন আসবে মোটরসাইকেলের দুনিয়াতেও। সারা দুনিয়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্বচালিত মোটরসাইকেলের এক ঝলক দেখতে পায় যখন BMW স্বচালিত ১২০০ জিএস মোটরসাইকেলের একটি ভিডিও প্রকাশ করে।

ওই ভিডিওতে দেখা যায় যে মোটরসাইকেলটি নিজে নিজেই চালু হয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে চলে একটি জায়গায় এসে থেমে যায়। একটি মোটরসাইকেলের জন্য ভিডিওটি এমন আহামরি কিছু হতো না, যদি না বাইকটি কোন মানুষ চালিয়ে নিয়ে আসত। ভিডিওটি চমকে ভরা ছিল কারণ মোটরসাইকেলটি কোন চালক চালায়নি, সে নিজে নিজেই চলেছে। 

বিএমডব্লিউ চমক দিয়েছে স্বচালিত বাইক এনে; Image Source: ADV Pulse

সম্প্রতি ২০১৯ সালের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত ‘কনস্যুমার ইলেকট্রনিক শো’ এ ১২০০ জিএস মডেলের আরও চকচকে নতুন সংস্করণ প্রদর্শিত হয়। তবে এই বাইকের স্বচালিত বৈশিষ্ট্য এর চালককে স্বচালিত বাইকের নিজে নিজে চলতে পারার অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য দেয়া হয়নি। এই বৈশিষ্ট্য মূলত চালকের নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয়েছে। 

স্বচালিত গাড়ি আর স্বচালিত মোটরসাইকেলের উদ্দেশ্য এক না। গাড়ির ক্ষেত্রে স্বচালিত গাড়ি এর আরোহীকে নিজে নিজে চলতে পারা গাড়িতে চড়ার অনুভূতি দেয়, সেখানে তার বসে থাকা ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই। কিন্তু স্বচালিত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু অন্য রকম।

এই বাইক তার আরোহীই চালাবে, তবে এর স্বয়ংক্রিয় বৈশিষ্ট্য একে অন্য লেনে চলে যাওয়া ঠেকবে বা চলতি পথে সামনে কোনো কিছু চলে আসল নিজে থেকেই ব্রেক করবে। তারমানে মোটরবাইকের স্বয়ংক্রিয় বৈশিষ্ট্য গুলো মূলত এর নিরাপত্তার দেখভাল করবে।

নিরাপত্তার কথা সবার আগে ভাবা হয়েছে; Image Source: autodevot.com

তারমানে এই নয় যে BMW কোম্পানি কখনো স্বচালিত মোটরবাইক নিয়ে কাজ করবেনা। তারা এটা করতেও পারে বা অন্য কোনও কোম্পানি ভবিষ্যতে এই দায়িত্ব নিতে পারে। তবে অধিকাংশ মোটরবাইক প্রেমীর বাইক পছন্দ করার প্রধান উদ্দেশ্য একে নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করা, নিষ্ক্রিয় হয়ে বাইকের পিঠে বসে থাকা নয়।

বিশেষ করে যারা বেশি টাকা খরচ করে দামী বাইক কেনে তারা অবশ্যই চাইবে না বাইককে নিজে নিজে চলতে দিয়ে বাইকের পিঠে অলস বসে থাকতে। কিছু মানুষ আছে যারা অফিসে আসা যাওয়া বা টুকিটাকি কাজ করার জন্য বাইক কেনে। তারা হয়তো খুশি হবে যদি সেই বাইক নিজে নিজেই চলে। তবে এমন ব্যবহারকারীরা সাধারণত কম দামী হালকা বাইক কেনে। এই ধরণের বাইকে স্বচালিত বৈশিষ্ট্য যোগ হতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। 

এমনই হবে সামনের দিনের মোটরসাইকেল; Image Source: Cycle World

স্বচালিত বৈশিষ্ট্য মূলত আগে বিলাসবহুল বাইকগুলোতে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বাড়াতে যুক্ত করা হবে। আপনি হয়তো কিছু দিনের মধ্যে BMW বা এই রকম বিলাসবহুল বাইকে নিরাপত্তার কারণে বা চলন্ত অবস্থায় দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে স্বয়ংক্রিয় বৈশিষ্ট্য যুক্ত হতে দেখতে পারেন। 

সবকিছুই হবে বৈদ্যুতিক

বৈদ্যুতিক বাইকের ধারণা স্বচালিত মোটরবাইকের মতো নতুন ধারণা না। বরং ২০১৪ সালেই বিখ্যাত কোম্পানি হার্লি-ডেভিডসন এই ধারণার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ওই সময়ে হার্লি-ডেভিডসন ‘প্রজেক্ট লাইভওয়্যার’ এর ঘোষণা দেয়।

এই প্রজেক্টে তারা ঘোষণা দেয় এমন একটি বৈদ্যুতিক বাইক আনার যা মাত্র চার সেকেন্ডে শূন্য থেকে ৬০ কিমি/ঘন্টা গতি তুলতে পারবে। এর নকশা এমন ভাবে করা হয় যেন একবার চার্জ দিলে ৬০ মাইল বা ৯৭ কিমি চলতে পারবে। তারা ২০২১ সালের মধ্যে এই বাইক বাজারে আনার ঘোষণা দেয়।

হার্লি-ডেভিডসন ঘোষণা দিয়েছে বৈদ্যুতিক বাইকের; Image Source: Visordown

কিছু দিন আগে হার্লি-ডেভিডসন ঘোষণা দেয় যে চলতি বছরের আগস্টেই তারা ‘প্রজেক্ট লাইভওয়্যার’ বাজারে আনতে পারবে। তারমানে তারা তাদের লক্ষ্য থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে। এই বাইক ৩.৫ সেকেন্ডেই ৬০ কিমি গতি তুলতে পারবে আর ১০০ কিমির বদলে একবার চার্জে এটি ১৭৭ কিমি যেতে পারবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে তাদের প্রাথমিক ঘোষণা থেকে আরও উন্নত করে বাইকটি বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে। 

যেহেতু এটি একটি বৈদ্যুতিক বাইক তাই এখানে কোন ক্লাচ বা গিয়ার থাকবেনা। তারমানে এখানে বাইকের কোন গর্জনও থাকবেনা। এটি হার্লি-ডেভিডসন ভক্তদের জন্য হতাশার হতে পারে। কারণ তারা এর রাজসিক গর্জন অনেক পছন্দ করে। তবে কোম্পানির প্রকৌশলীরা এই বিষয়টি নিয়ে সচেতন। তারা তাদের নকশাও এটি মাথায় রেখেই করছে। তাদের মতে “লাইভওয়্যার মডেল এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেন এটি গতি বাড়ানোর সাথে সাথে হার্লি-ডেভিডসনের বিখ্যাত গর্জন বের হয়”। 

মোটরসাইকেল প্রেমীদের কাছে এর গর্জন অনেক গুরুত্বপূর্ণ; Image Source: New Atlas

টেসলা যেমন বুদ্ধিমান বৈদ্যুতিক গাড়ি তেমনি লাইভওয়্যারও বুদ্ধিমান বৈদ্যুতিক বাইক। এর যুক্ত করা হয়েছে এইচ-ডি কানেক্ট নামে আধুনিক টেলিম্যাটিক্স ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বাইক সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য যেমন ব্যাটারির চার্জ, বিভিন্ন অংশের বর্তমান অবস্থা ইত্যাদি একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এর মাধ্যমে চালকের কাছে পৌঁছে যাবে।

বিএমডব্লিউ এর স্বচালিত বাইকের মতো হার্লি-ডেভিডসনের বাইকও বেশ দামি হবে। লাইভওয়্যারের দাম ধরা হয়েছে $২৯৭৯৯। বিএমডব্লিউ এর স্বচালিত বাইকের দাম কত হতে পারে সে বিষয়ে কোন পরিষ্কার ধারণা নেই তবে এর দামও সস্তা হবেনা এটা বলে দেয়া যায়।

স্বচালিত আর বৈদ্যুতিক বাইক বাজারে আনার মাধ্যমে বিএমডব্লিউ এবং হার্লি-ডেভিডসন অন্য কোম্পানি থেকে যেমন কয়েক যোজন পথ এগিয়ে যাবে তেমনি বাইক প্রেমীদের ভিতরেও আলোড়ন তৈরি করবে। আগেই যেমন বলা হয়েছে বাইক আর গাড়ি এক না। যারা বাইক ভালোবাসে তারা একে পাগল প্রেমিকের মতোই ভালোবাসে।

সেখানে নতুন আর উত্তেজক কোন বৈশিষ্ট্য আসা মানে তো বাইক প্রেমীদের সেটা নিজের করে না নেওয়া অব্দি শান্তি হবেনা। তাই বাজার দখল নিয়েও এই দুই কোম্পানিকে ভাবতে হবেনা। তবে শুধু বাজার দখল করাই না, এই দুই কোম্পানি মোটরসাইকেলের দুনিয়াতে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে যে হয়তো বদলে দেবে মোটরসাইকেলের ভবিষ্যৎ।