জীবনের তাগিদেই মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়েছে। আর এই পরিচলন শুরু সেই আদিম যুগ থেকে। শুরুতে কেবল নিজ পায়ের উপরে ভরসা রেখে চলাচল করলেও মানুষ খুব দ্রুত পশুর উপরে নির্ভরশীল হয়ে পরে। যান্ত্রিক শকট আসার আগ পর্যন্ত ঘোড়া, গাধা, হাতি বা উট শতশত বছর মানুষের বাহন হিসেবে সেবা দিয়েছে।

আঠারো শতকের শেষে যন্ত্র এসে ভারবাহী পশুর উপরে নির্ভরশীলতা কমায়। এরপর প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতিতে মানুষ এখন দ্রুততম সময়ে যাতায়াত করতে পারে। একটু কল্পনা করে দেখুন এই তো বেশি দিন আগের কথা নয় যখন আশি দিনে দুনিয়া ঘুরে আসতে পারাটাই রীতিমতো কল্পকাহিনী মনে হতো। আর এখন কেউ যদি ৮০ দিনে দুনিয়া ঘুরে আসতে পারবে কিনা, এটা নিয়ে ভাবতে বসলে লোকে নির্ঘাত তাকে পাগল ঠাউরে বসবে!

বর্তমান দুনিয়ায় সব থেকে দামী হলো সময়। সকলের চেষ্টাই থাকে কীভাবে সবকিছু আরও দ্রুত করা যায়। যাতায়াত ব্যবস্থাও এর বাইরে নেই। তাই তো কীভাবে আরও দ্রুত এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া যায় এটা নিয়ে কাজ করতে করতে বহু লোকের গলদঘর্ম অবস্থা। এর সাথে আরও একটি অনুষঙ্গ আছে, নিরাপত্তা।

প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা দ্রুত গতি যেমন পেয়েছি তেমনি ফ্রি হিসেবে পেয়েছি নাজুক নিরাপত্তা ব্যাবস্থা। অসংখ্য দুর্ঘটনা আর স্বজন হারানোর বেদনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিয়েও। আমাদের চোখ ভবিষ্যতে রেখে চলুন জানার চেষ্টা ৫টি অনাগত পরিবহন ব্যাবস্থাকে।

স্বচালিত গাড়ি

এটি আর ঠিক ভবিষ্যৎ কল্পনা হিসেবে নেই। নব্বইয়ের দশকের সাইন্স ফিকশন মুভিগুলোর মতো নিজে নিজে চলতে পারা গাড়ি দেখতে হয়তো খুব বেশিদিন আর অপেক্ষা করতে হবে না। গত কয়েক বছর ধরেই এই বিষয়টা বেশ হটকেকের মতো চলছে। টেসলা, ওয়েমোর মতো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কোম্পানিগুলো এই আইডিয়া প্রথম সামনে আনলেও এখন বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি বা ইলেকট্রিক পণ্য নির্মাতা কোম্পানিও স্বচালিত গাড়ির গবেষণায় কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে।

স্বচালিত গাড়ি; Image Source: Phys.org

সাম্প্রতিককালে ক্লাউড কম্পিউটিং এর ব্যাপক প্রসার আর কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টারনেট অব থিংসের ক্রমউন্নতিতে স্বচালিত গাড়ির ধারণা কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তবে সায়েন্স ফিকশনের গাড়ি আর এই স্বচালিত গাড়ির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য আছে।

ছোটবেলায় দেখা মুভির ঐ গাড়িগুলোতে হাস্যকর দেখতে রোবট বসে থাকতো, সেই আসলে গাড়িটা চালাতো। মানে গাড়িটা গোবর গণেশ হলেও ঐ রোবট ছিল বুদ্ধিমান যে কিনা বুঝে শুনে গাড়ি চালাত। কিন্তু হালের স্বচালিত গাড়ি নিজেই বুদ্ধিমান। সে ক্লাউড থেকে ডাটা নিয়ে অসংখ্য সেন্সর আর ক্যামেরার মাধ্যমে জ্যাম এড়িয়ে ভিড় বাঁচিয়ে নিজেই চলতে পারে।

রূপান্তরযোগ্য ক্যাব

এখন আমাদের বেশ পরিচিত একটা ধারণা হল রাইড শেয়ারিং। উবার, লিফট এর মত জায়ান্ট কোম্পানিগুলো সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই রাইড শেয়ারিং গাড়িগুলোতে ভবিষ্যতে রূপান্তরের ক্ষমতা থাকবে। এদের কার্যকারিতা হবে বহুমুখী। সাধারণ ট্যাক্সিগুলো ও হবে নানা কাজের কাজী। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান টয়োটা বর্তমানে ই-প্যালেট নামে নতুন এক ধরণের গাড়ি নিয়ে কাজ করছে যা সাধারণ ক্যাব থেকে পণ্য বিক্রিকারি ভ্যান বা ডেলিভারি ভ্যানে পরিণত হতে পারে।

রূপান্তরযোগ্য ক্যাব; Image Source: TechKurrent

তারমানে সকালে আপনি যে ক্যাবে চড়ে অফিসে গেলেন, বিকালে দেখলেন সেই গাড়িই রাস্তার পাশে টিশার্ট বিক্রি করছে আবার সেই একি গাড়ি রাতে আপনাকে পিজ্জা ডেলিভারি দিয়ে যাচ্ছে! একটু খোলসা করে বলা যাক।

ধরুন, একটি ভ্যানগাড়ি যার সিটগুলো একপাশে সরিয়ে বেশ সুন্দর ফাঁকা জায়গা তৈরি করা যায়। আবার ঐ সিটগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে এমনভাবে সাজানো যায় যে, কখনো সেটা তাকের আকার ধারণ করে আবার কখনো বসার সিটের আকার ধারণ করে। একই গাড়ি আলাদা আলাদা কাজে ব্যবহার করা গেলে সেটা যেমন অর্থ সাশ্রয়ি যেমন হয় তেমনি তিন গাড়ির কাজ এক গাড়িতে হলে জ্যাম ও কম হয়।

ভবিষ্যতের সাবওয়ে

এলন মাস্ক আর তার কোম্পানি টেসলা পরিবহনের বেশকিছু ধারণার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে যা শুরুতে পিলে চমকানো হলেও আস্তে আস্তে কাজের জিনিস বলেই মনে হচ্ছে। এরই একটি হচ্ছে ভবিষ্যতের পড ভিত্তিক সাবওয়ে। লস এঞ্জেলেসে ইতিমধ্যে এর জন্য লুপ তৈরি শুরু হয়ে গেছে।

ভবিষ্যতের সাবওয়ে; Image Source: Stockfresh

এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে অনেকটা কনভেয়ার বেল্টের মত চলমান অংশ থাকবে যা এর উপরে থাকা মানুষজন নিয়ে ১৫০ কিমি গতিতে চলতে থাকবে। শুনে বেশ উত্তেজক মনে হলেও এর নিরাপত্তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। যেমন এই গতিতে চলমান থাকলে এর উপরে মানুষ উঠবে কিভাবে? তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই আইডিয়াটা খারাপ না।

হাইপারলুপ

এলন মাস্কের আরেকটি জবরদস্ত আইডিয়া। এর জন্য একটা বায়ুশূন্য টিউব বা লুপ থাকবে যার ভিতর দিয়ে একটা পড ঘর্ষণমুক্ত ভাবে ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিমি গতিতে ছুটতে পারবে। টেসলা ইতিমধ্যে নেভাদাতে ৫০০ মিটারের ট্র্যাক তৈরি করেছে। এছাড়াও বাল্টিমোর, সান ফ্রান্সিস্কো ও আরও নানা জায়গায় এই লুপ নিয়ে গবেষণা চলছে। হাইপারলুপ ওয়ান আর টেসলা এই দুই কোম্পানি হাইপারলুপ গবেষণায় সব থেকে এগিয়ে আছে।

হাইপারলুপ; Image Source: The Times

তবে হাইপারলুপেরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এত বায়ুশূন্য লুপ তৈরি অনেক ব্যয়বহুল। আর এই লুপ রাখতে হবে একদম সোজা যেন যাত্রীরা অতিরিক্ত বেগে অসুস্থ না হয়ে পরে। সেই সাথে অতিরিক্ত গতির কারণে নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে।

উড়ন্ত ট্যাক্সি

আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে দুনিয়ার কোথাও এমন একজন মানুষ নেই যে কখনো জ্যামে বসে বিরক্ত হয়ে গাড়ি শুদ্ধ উড়ে যাবার কথা ভাবেনি। এটা কিছুদিন আগেও কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী মনে হলেও বাস্তবে দেখতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে হয় না।

উবার, এয়ারবাস বা বোয়িং এর মত কোম্পানিগুলো বেশ গুরুত্ব দিয়েই এর গবেষণা করে যাচ্ছে। এই উড়ন্ত গাড়ির জন্যও শক্ত কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন গাড়ির আয়তন ছোট রেখে উল্লম্ব টেকঅফ ও ল্যান্ডিং, আরবান এয়ার স্পেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি।

উড়ন্ত ট্যাক্সি; Image Source: npr.org

আজকের জন্য যা কল্পনা, আগামীকাল সেটাই বাস্তব। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু কল্পনাকে বাস্তব করার জন্যই না বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য আর সর্বোচ্চ উপযোগিতার জন্যও দরকার। এখন দেখার বিষয় এই পাঁচটির মধ্যে কোনটি সবার আগে বাস্তবে রূপ নেয়।