প্রযুক্তিগত পূর্বানুমানের মতো দুরূহ কাজ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৮০-এর দশকে বসে এ কথা কল্পনাও করা যেত না যে, মানুষ তাদের পকেটে করে ছোট্ট, পোর্টেবল একটি যন্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলা যাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে সেটি মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য একটি বিষয়েই পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেই ছোট্ট যন্ত্রটি ব্যবহার করেই ইন্টারনেট বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্যবহার করা? এটি ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক বৈপ্লবিক চিন্তা।

কিন্তু বর্তমানের কথা চিন্তা করুন। মানুষের হাতে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরেক রকমের স্মার্টফোন, যেগুলো দিয়ে ওয়েব সার্ফ করা যাচ্ছে, বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন চালানো যাচ্ছে, গেমস খেলা যাচ্ছে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে। আর হ্যাঁ, এই সবকিছুর পাশাপাশি ফোন করা বা মেসেজ আদানপ্রদানের মতো প্রাথমিক কাজগুলোও করা যাচ্ছে।

দুই দশক পর স্মার্টফোনের দুনিয়ায় আসবে আমূল পরিবর্তন; Image Source: T3

সব মিলিয়ে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে এমন সব পরিবর্তন এসেছে, যা একটা সময় পর্যন্ত ছিল মানুষের কল্পনারও অতীত। এমনকি সাইন্স ফিকশন ছবিতে এগুলো দেখানো হলেও তা অতিরঞ্জন বলে মনে হতো। কিন্তু এখন যেহেতু সেগুলো বাস্তব। তাই আমরাও বিষয়গুলোর সাথে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।

তবে এখন যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, আজ থেকে দুই দশক পর মোবাইল ফোন কেমন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কি খুব একটা সহজ হবে? মোবাইল ফোনের বিবর্তনের যে ধারা, তা এতটাই অননুমেয় যে, পাঁচ বছর পরও মোবাইল ফোনে নতুন কী কী প্রযুক্তির সংযোজন ঘটতে পারে তা ভাবতে গেলে গলদঘর্ম হতে হয়। সেখানে দুই দশক তো বিশাল লম্বা সময়।

তারপরও চলুন পাঠক, আমাদের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খুঁজে বের করি তেমন কিছু বিষয়, যেগুলো আজ থেকে দুই দশক পরের মোবাইল ফোনে অবশ্যই দেখা যাবে।

উন্নত ব্যাটারি

স্মার্টফোনের যত উন্নতিই ঘটুক না কেন, ব্যবহারকারীদের জন্য এর ব্যাটারি আজও অনেক বড় একটি চিন্তার বিষয় হয়েই রয়ে গেছে। স্মার্টফোনগুলো আনুষঙ্গিক আর সব দিক থেকে যতটা এগিয়ে গেছে, সে তুলনায় অভিযোজন ঘটেনি ব্যাটারির। ফলে স্মার্টফোনের আধুনিক প্রযুক্তিকে যথাযথ সমর্থন জোগাতে পারছে না ব্যাটারি। একবার ফুল চার্জ দিয়ে স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বের হওয়ার পরই আবার ব্যবহারকারীকে ভাবতে হচ্ছে, আবার না কখন ব্যাটারি ডাউন হয়ে যায়!

তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, আজ থেকে দুই দশক পরের স্মার্টফোনে ব্যাটারিকেন্দ্রিক সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ন্যানো ব্যাটারি সৃষ্টির, যা কিনা বর্তমান ব্যাটারির তুলনায় একশো ভাগের এক ভাগেরও ছোট হবে, অথচ তার শক্তি ধারণক্ষমতা হবে অনেক বেশি। এছাড়া ব্যাটারি প্রস্তুতের উপাদান হিসেবেও চেষ্টা চলছে আরো কার্যকর ধাতু ব্যবহারের, যেমন লিথিয়াম মেটাল ফয়েল।

ব্যাটারি নিয়ে চিন্তা আর থাকবে না; Image Source: T3

তাছাড়া আজ থেকে বিশ বছর পর স্মার্টফোন প্লাগ ইনের মাধ্যমে চার্জ দেয়ার প্রবণতাও অনেক কমে যাবে। তখন ওয়্যারলেস চার্জার এতটাই উন্নত হয়ে যাবে যে, যেকোনো তলকেই হয়তো ব্যবহার করা যাবে চার্জার হিসেবে।

এসবেও যারা সন্তুষ্ট নন, তাদের জন্য রয়েছে পানি দ্বারা পরিচালিত ব্যাটারি আগমনের সম্ভাবনাও। সেই ২০০৮ সালেই স্যামসাং কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল বাজারে আনার, যেটি পানির সাথে মোবাইলের আভ্যন্তরীণ ধাতব উপকরণের বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন করবে। ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ ছাড়াও, আমরা হয়তো দেখা পাব আরো উদ্ভাবনী কোনো ব্যাটারি প্রযুক্তিরও।

ফোল্ডিং ফোন ডিসপ্লে

ইতোমধ্যেই আমরা স্মার্টফোনের ডিসপ্লেতে বক্র কিনারার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি এবং আগামী দুই দশকের মধ্যে হয়তো এই প্রযুক্তি আরো অনেক বেশি টেকসই অবস্থায় চলে যাবে। ২০৪০ সাল নাগাদ কি আমরা এমন ফোন দেখতে পাব যার স্ক্রিন কাগজের মতো ভাঁজ করে পকেটে রেখে দেয়া যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই হয়তো দেয়া অসম্ভব, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বিজ্ঞানীরা ততদিনে এই প্রযুক্তিকে বাস্তবায়িত করার খুব কাছাকাছিই পৌঁছে যাবেন।

এছাড়াও আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো স্মার্টফোন ডিসপ্লের ক্ষেত্রে আরো অনেক উন্নতি দেখা যাবে। যেমন সৌরশক্তি দ্বারা পরিচালিত স্ক্রিন কিংবা হলোগ্রাফিক স্ক্রিন যা ফোনের কয়েক সেন্টিমিটার উপরে একটি চিত্রকে প্রজেক্ট করে দেখাতে পারবে।

চলে আসবে এমন ফোল্ডিং ডিসপ্লে; Image Source: T3

এছাড়াও আমরা এমন স্ক্রিন পেতে চলেছি, যা হবে আরো অনেক বেশি বুদ্ধিমান ও প্রতিক্রিয়াশীল। এমন সব স্ক্রিন, যেগুলো কাগজ বা যেকোনো ধরনের লেখা বা অঙ্কিত জিনিসকে হুবহু অনুকরণ করতে পারবে। অ্যাপল ওয়াচের মতো ডিভাইসগুলোতে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক হ্যাপটিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দুই দশকের মধ্যে হয়তো তা আরো এত বেশি উন্নতি করবে যে, আমাদের গেমস খেলা বা অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় পৌঁছে যাবে।

কনসোল কিলিং গ্রাফিকস

একটা সময় ছিল যখন আমরা স্বপ্ন দেখতাম একদিন এমন হোম কনসোলের আবির্ভাব ঘটবে, যা আর্কেড যন্ত্রের গ্রাফিকসকে টেক্কা দিতে পারবে। এরপর আসল সেই সময়, যখন পারসোনাল কম্পিউটারের মাধ্যমেই কনসোল গ্রাফিকসে নতুন মাত্রা যোগ হলো। এখন আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি দেখার জন্য যে, কবে স্মার্টফোনের গ্রাফিকস অপর সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাপিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে আরোহণ করবে।

কার্ড স্পেসে নিজের দখলদারিত্বের মাধ্যমে, এনভিডিয়া ইতিমধ্যেই চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে স্মার্টফোনকে অন্য সব কনসোলের চেয়ে শ্রেয়তর গ্রাফিকস ফলাফল সমৃদ্ধ কনসোলে পরিণত করতে এবং খুব শীঘ্রই হয়তো তারা সে লক্ষ্যে অভীষ্ট হবে।

গ্রাফিকসে অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাপিয়ে যাবে স্মার্টফোন; Image Source: T3

স্মার্টফোন গ্রাফিকস গুণেমানে প্রতি বছরই উন্নতি লাভ করছে। তাই আগামী দুই দশকের মধ্যে তারা আজকের দিনের প্লে-স্টেশন ৪ সদৃশ কনসোলগুলোকে যে হার মানাবে, সেই বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। ভুলে গেলে চলবে না ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কথাও। ইতিমধ্যেই স্মার্টফোনে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার যে অসীম। তাই এখন আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে, কবে পুরো স্মার্টফোন জগতই ভার্চুয়াল দুনিয়ার অংশীদার হয়ে ওঠে।

সুপার নেটওয়ার্ক স্পিড

ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশে আবির্ভাব ঘটে গেছে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের। কিন্তু এই নেটওয়ার্কের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার দেখার জন্য আমাদেরকে হয়তো ২০২০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হবে। তবে যখন অপেক্ষার অবসান ঘটবে, তখন এমনকি বর্তমানের চেয়ে ৭০ গুণ দ্রুততর গতিও আমরা লাভ করতে সক্ষম হব।

নেটওয়ার্কের গতি আকাশ ছোঁবে; Image Source: T3

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি চলচ্চিত্র ডাউনলোড করে ফেলা? মিনিটখানেকের মধ্যে একটি বিশাল ফাইলের মালিক হয়ে যাওয়া? প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ পাওয়া? এই সবই আমরা পেয়ে যাব বড়জোর বছর দুয়েকের মধ্যেই। তাহলে স্রেফ একটিবার কল্পনা করে দেখুন, নেটওয়ার্কের গতি দুই দশক পর ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে!

ডিজিটাল সহযোগিতা

কর্টানা, সিরি কিংবা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্স ইতিমধ্যেই আমাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে অনেক সহজতর করে দিয়েছে। কিন্তু দুই দশক পর আমরা যেসব ডিজিটাল সহযোগিতা লাভ করতে চলেছি, সেগুলোর তুলনায় এগুলো নিতান্তই নগণ্য বিষয়।

ডিজিটাল সহযোগিতা হবে আরো ব্যাপক; Image Source: T3

আগামী দুই দশকের মধ্যে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ্লিকেশনই নয়, বরং ৯৯ শতাংশ অ্যাপ্লিকেশনেই যোগ হয়ে যাবে ডিজিটাল সহযোগিতার ব্যবস্থা। তখন আর আমাদেরকে স্মার্টফোন তালুবন্দি করে, আঙ্গুল দিয়ে স্ক্রিনে নড়াচড়া করে কোনো কমান্ড দিতে হবে না, বরং কন্ঠস্বর ব্যবহার করে কিংবা নিছকই ইঙ্গিতের মাধ্যমেই স্মার্টফোনের যেকোনো সুবিধা আমরা পেয়ে যাব।

শেষ কথা

এতক্ষণ যা যা বললাম, তার কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা নয়। সবগুলোই অনুমান। তার মানে এই নয় যে, এগুলো বাস্তবে হবে না। বরং আমরা সেগুলো হতে যত বিলম্ব হবে ভাবছি, তার অনেক আগেই হয়তো সেগুলো সম্পন্ন হয়ে যাবে। দুই দশক পর যে সময়ের কথা আমরা বলছি, তখন হয়তো স্মার্টফোনের কোনো প্রয়োজনীয়তাই আর থাকবে না। আমরা সরাসরি ছোট একটি মাইক্রোফোন ও ইয়ারপিস কাজে লাগিয়েই, ক্লাউডের মাধ্যমে যেকোনো যোগাযোগ সম্পন্ন করে ফেলতে পারব। সেক্ষেত্রে আস্ত একটা স্মার্টফোনের আর কীই বা প্রয়োজন হবে!