ছোট আকারের ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র থেকে শুরু করে মহাকাশে পাড়ি দেয়া মহাকাশযান, জীবনের সব দিকেই প্রযুক্তির জয়জয়কার। আর এই প্রযুক্তিও সময়ের সাথে সাথে আরও আধুনিক ও কার্যকর হয়ে উঠছে। একটু নজর দিলেই বুঝতে পারি যে অনেক সুন্দর সুন্দর ভাবনাগুলো আস্তে আস্তে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। আজ আমরা একটু চোখ বুলাবো গাড়ি নির্মাণ শিল্পের দিকে।

এমনিতেই নতুন প্রযুক্তি আর নকশার গাড়ির প্রতি সবারই একটু বাড়তি আগ্রহ থাকে। এখন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে নজর দিয়েছে, বেশ কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে ছেড়েছে। এখন তাদের নজর চালকবিহীন গাড়ির দিকে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে এই প্রযুক্তির উন্নয়নে। এবার চলুন দেখা যাক এই গাড়ি ২০৫০ সাল নাগাদ কোথায় পৌঁছাতে পারে।

বাজারে চলে এসেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি; Image Source: The National Interest

২০২০: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়ালিটি

আচ্ছা আপনি এমন একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা কল্পনা করুন তো, যেখানে আপনি শুধু আরাম করে বসে থাকবেন, আপনাকে গাড়িটি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা! আপনি না ভাবলেও ভক্সওয়াগণ কিন্তু এমনটাই ভাবছে, আর এজন্য তারা নকশা করেছে চার ধরণের বৈদ্যুতিক গাড়ির একটি পুরো সিরিজ। যেখানে ছোট গাড়ি থেকে শুরু করে ছোট আকারের বাস পর্যন্ত আছে।

এই সিরিজের মধ্যে সবথেকে আকর্ষণীয় হচ্ছে ‘আই. ডি. ভিজিয়ন‘, যাকে নিয়ে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে এটি পরিবেশ বান্ধব, নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রার জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

প্রচলিত গাড়ির ধারণা বদলে দেবে ভক্সওয়াগন আই. ডি. ভিজিয়ন; Image Source: The Verge

এখানে চালক এমন কেউ না যে গাড়িটি চালাবে বরং তার কাজ নেভিগেশন সিস্টেমে তার যাত্রা পথ ঠিক করে দেয়া। এর কন্ট্রোল সিস্টেম নানা ধরণের কাজের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভয়েস বা নানা অঙ্গভঙ্গি অনুসরণ করে কমান্ড নেবে আর সেই মত কাজ করবে। লাইভ ডিসপ্লের বদলে এতে ভার্চুয়াল পর্দা থাকবে চালক ও অন্যান্য যাত্রীর সামনে এবং এই পর্দা স্বয়ংক্রিয় ভাবে সমন্বিত হবে যাত্রীদের সামনে। তার মানে আপনি চাইলে বাইরের ট্রাফিক জ্যাম না দেখে নীল সাগরের ঢেউ দেখতে পারবেন।

এখন পর্যন্ত এটি ধারণা আর নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ভক্সওয়াগণ কোম্পানি আশা করছে ২০২২ সাল নাগাদ এই গাড়ি বাজারে ছাড়তে। এবং অবশ্যই সবথেকে বেশি নজর থাকবে নিরাপত্তার দিকে।

২০৩০: চালক ছাড়া আরামের যাত্রা

২০১৭ সালে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি অডি ধারণা দেয় ‘অডি এইকন বা Audi Aicon’ নামে এক স্বচালিত গাড়ির যেটা ২০৩০ সাল নাগাদ উৎপাদনে যাবে। এটি বেঁটে ধরণের আধুনিক ডিজাইনের সেডান গাড়ি। এর ভিতর অনেকটা বসার ঘরের মত আরামদায়ক। চারজনের বসার জায়গা সম্বলিত গাড়িটিতে কোন স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেল থাকবেনা! 

তবে সামনের প্যানেলে এক দরজা থেকে অন্য দরজা অব্দি লম্বা সিস্টেম ডিসপ্লে প্যানেল থাকবে। প্রতিটি চাকা আলাদা আলাদা ভাবে বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত হবে। আর একবার চার্জ দিলে এই গাড়ি প্রায় ৭০০-৮০০ কিলোমিটার চলতে পারবে।

অডি এইকনের লক্ষ্য দুর্ঘটনা মুক্ত যাত্রা; Image Source: CAR Magazine

নির্মাতাদের মতে ” অডি এইকন স্বচালিত গাড়ির উন্নয়নে পথিকৃৎ হয়ে থাকবে। এর প্রযুক্তি সকল দুর্ঘটনা থেকে আপনাকে সবথেকে বেশি সুরক্ষা দেবে কারণ এই গাড়িগুলো যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সেগুলো আগে থেকেই সনাক্ত করতে পারে, যেটা মানুষের পক্ষেও আগে থেকে বুঝতে পারা প্রায় অসম্ভব। আর মানুষ চালক গাড়ি চালাতে চালাতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও এই ধরণের গাড়ি কখনো ক্লান্ত হবেনা”।

২০৪০: গাড়ি যখন সেবা

এই সময়ে যেয়ে গাড়ি একটি নির্দিষ্ট মডেলের বদলে সামগ্রিক ভাবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে ২০৪০ সাল নাগাদ আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের ৯০% গাড়ি হবে বিদ্যুৎ চালিত এবং এটা নতুন ধারা তৈরি করবে।

আর যখন প্রায় সমস্ত গাড়ি স্বচালিত হয়ে যাবে তখন কি আসলেই ব্যক্তিগতভাবে আলাদা গাড়ি নেবার প্রয়োজন থাকবে? কেন এটা সেবায় পরিণত হবেনা? ‘উবার’ বা ‘লিফট’ বা দেশের ‘পাঠাও’ এর মত কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে গাড়ি না থাকলেও গাড়ির সেবা পাবার ব্যবস্থা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে শুধু যখন প্রয়োজন তখনই গাড়ির সেবা পাবার সুযোগ আছে। এটাকে বলা হচ্ছে ‘যাত্রী অর্থনীতি’, আর ২০ বছর পরে এই “সেবা হিসেবে ব্যবহারকারী পরিবহন” কথাটাই বৃহৎ আকারে বদলে হয়ে যাবে “সেবা হিসেবে ভোক্তা পরিবহন”।

গাড়ি পরিণত হবে সেবা পন্যে; Image Source: HybridCars.com

ভক্সওয়াগণ এমনই একটি প্লাটফর্ম তৈরি করতে চায় ‘vw.OS‘ নামে, যার মাধ্যমে তারা গাড়িকে সেবা হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেবে। তারা খেয়াল করেছে, এমন সফটওয়্যার উন্নয়ন ও হালনাগাদ করা তুলনামূলক সহজ। টেসলাও অনেকটা একই ধরণের বিষয় নিয়ে কাজ করছে।

২০৫০: এবার ওড়ার পালা

ডিজাইনার থমাস লারসেন রোয়েড আশা করেন তার নকশা করা ‘চেজ ২০৫৩’ নামের কনসেপ্ট কার তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হবে। এটি একই সাথে রাস্তায় চলতে পারবে আবার উড়তেও পারবে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫৩ সাল নাগাদ এই গাড়ির দেখা পাওয়া যাবে।

চেজ ২০৫৩, যাত্রা হবে আকাশে; Image Source: MIKESHOUTS

‘চেজ ২০৫৩’ এর বহিরাবরণ তৈরি হবে কার্বন ন্যানোটিউব দিয়ে, যা একে হালকা, মজবুত ও ঘাত প্রতিরোধী করবে। এই গাড়িতে যুক্ত থাকবে যেকোন ধরনের নিঃসরণ মুক্ত একটি হাইড্রোজেন ইঞ্জিন। গাড়িটি হবে তিন চাকার এবং মজার ব্যাপার, এখানে ওজন কমিয়ে ফেলার জন্য কোনো সংযুক্ত ভারী যন্ত্রাংশ থাকবেনা। প্রয়োজন অনুসারে নানা যন্ত্রাংশ এতে যুক্ত করে নেয়া যাবে। এর ফলে গাড়ির ওজন অনেকাংশে কমে আসবে।

যদিও এইসবই এখনো ধারণা, কল্পনা ও সম্ভাব্যতার মাঝে সীমাবদ্ধ, তবে মনে রাখতে হবে প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ৪০ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। আর এখন যে গতিতে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে তাতে হয়তো ২০৫০ সাল নাগাদ আমরা যা ধারণা করছি তার থেকে বেশিও পেতে পারি।