আমাদের রোজকার দুনিয়ার প্রতিটা পদক্ষেপে জ্বালানি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। আর এই জ্বালানির বিশাল একটা অংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। তেল, গ্যাস, কয়লা সবই জীবাশ্ম জ্বালানির অন্তর্ভুক্ত। আর এই জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহার আমাদের নীল গ্রহটিকে ছারখার করে দিচ্ছে। এই দায় আমরা কেউই এড়াতে পারিনা। কেউ কেউ ইনিয়ে বিনিয়ে দাবী করতে পারে যে সে সারাদিন বাসায় শুয়ে থাকে আর মোবাইলে চ্যাটিং করে, গাড়ি চালিয়ে বা রান্না করে বা অন্য কোন ভাবে সে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করেনা। কিন্তু সেই বেচারা আসলে ভুল ভাবনায় ডুবে আছে।

ছোটবেলা থেকে আমরা পড়ে আসছি যে, শক্তির কোন সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, খালি এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তন হতে পারে। তাই ওই বেচারা গ্যাস, তেল ব্যবহার না করলেও গরমের হাত থেকে বাঁচতে ফ্যান তো চালাচ্ছে বা মোবাইলে চার্জ তো দিচ্ছে, যার বিদ্যুৎ আসছে তেল, গ্যাস বা কয়লা পুড়িয়েই। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায় আসলে সকলের উপরেই বর্তায়।

আমাদের শক্তির উৎস দুই রকম, একটা নবায়ন যোগ্য না, যেমন গ্যাস, তেল, কয়লা যেগুলো নির্দিষ্ট পরিমানে পৃথিবীতে আছে আর একটা হচ্ছে নবায়ন যোগ্য উৎস যেমন সূর্যের আলো, পানি, বাতাস যা আসলে ব্যবহার করে শেষ করা যাবেনা।

নবায়ন অযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক

নবায়ন অযোগ্য শক্তি বা জীবাশ্ম জ্বালানি মূলত আসে কোটি কোটি বছর আগে মরে যাওয়া গাছপালা ও প্রাণী মাটি বা সাগরের নিচে প্রচণ্ড চাপে তেল, গ্যাস বা কয়লায় রূপান্তরিত হয়ে। এই পৃথিবীর সকল জীবই কার্বন নির্ভর অণু দ্বারা গঠিত। তাই এই জ্বালানিও হয় কার্বন নির্ভর। এই জ্বালানি পোড়ালে কার্বন মুক্ত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড বা কার্বন মনো অক্সাইড হিসেবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে যা পরিবশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এখানে সবথেকে ক্ষতিকর দুটি দিক নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বায়ু দূষণ

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে বায়ুমণ্ডলের ক্ষতি হয় সব থেকে বেশি। এরি মধ্যে পৃথিবী রক্ষাকারী ওজোন স্তর অনেকখানি পাতলা হয়ে গেছে। কার্বন-দাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউসের মত কাজ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে ফলে দুই মেরুর বরফ গলে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে বিশাল স্থলভূমি ডুবিয়ে দিতে পারে। বিভিন্ন শহরে বায়ু দূষণ এতটাই মারাত্মক আকার নিয়েছে যে সেখানে শ্বাস নেয়া আর দিনে ৫টা সিগারেট খাওয়া একই কথা। বাতাসে সালফার-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে যা এসিড বৃষ্টির কারণ।

বায়ুদূষণ এখন মাত্রাহীন হয়ে পড়েছে; Image Source: energyinfrapost.com

পানি দূষণ

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে যে বর্জ্য তৈরি হয় তা পানিকে ব্যাপক পরিমাণে দুষিত করে। তাছাড়া সাগরপথে তেল, কয়লা পরিবহনের সময়েও প্রচুর পরিমাণে তেল, কয়লা পানিতে ছড়িয়ে পড়ে, এতে পানির অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় যা জলজ বাস্তুসংস্থাপনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধু তাই না, মাটির ভিতরে থেকেও এই বর্জ্য ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে।

এই সকল ক্রমবর্ধমান হুমকিই আমাদের বাধ্য করছে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করতে। এখানে আমরা এমন কিছু বিকল্প জ্বালানি নিয়েই আলোচনা করব। যার অনেক গুলোই বেশ কাল্পনিক মনে হবে।

মহাশূন্য ভিত্তিক সৌরশক্তি

সূর্য যে বিশাল শক্তি বিকিরণ করে তার খুবই ক্ষুদ্র অংশ আমরা ধরে রেখে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। আর এই শক্তিও আসে আমাদের বায়ুমণ্ডলে নানা বাধা পেড়িয়ে। মহাশুন্য ভিত্তিক সৌরশক্তির ধারণায় মহাকাশে সৌরখামারে বিশাল আয়না বসানো হবে যা তীব্র ও নিরবিচ্ছিন্ন সৌরবিকিরণ সংগ্রহ করে ছোট ছোট সৌরসংগ্রাহকে প্রতিফলিত করবে, তারপর সেটা মাইক্রোওয়েভ বা লেজার বীম আকারে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেবে। ফলে সৌরশক্তির জন্য বিশাল এলাকা নিয়ে সোলার প্যানেল বসাতে হবেনা।

সরাসরি মহাশূন্য থেকে সৌরশক্তি আহরণ; Image Source: EarthSky

মনুষ্য শক্তি

আমরা যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়লেও প্রতিনিয়ত আমাদের কিছু কায়িক পরিশ্রম করতেই হয়। আমরা আগেই জেনেছি শক্তি আসলে ক্ষয় হয়না, রূপান্তরিত হয় মাত্র। তাই আমাদের হাঁটার সময়ের গতিশক্তিকে যদি আমরা তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে ওই গতিশক্তিটা অপচয় না করেই তাকে ব্যবহার করতে পারি। সেক্ষেত্রে মোবাইল চার্জ বা হেয়ার ড্রায়ারের জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের উপর নির্ভর না করলেও চলবে।

সাগরের জোয়ার

আমরা ইতিমধ্যে পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা জানি যেখানে পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কিন্তু পানির স্রোতের সব থেকে বড় যে উৎস সেই জোয়ারের স্রোতকে এখনো কাজে লাগানো যায়নি। বিজ্ঞানীরা হন্যে হয়ে এমন একটি উপায় খুঁজছেন যেখানে জোয়ারের সময় সৃষ্টি হওয়া শক্তিশালী স্রোতকে বিশেষ ভাবে ডিজাইন করা টার্বাইনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত করে সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা।

জোয়ারের শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন; Image Source: Thai Trade and Industry Media TTIM

হাইড্রোজেন

নাসা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে এমন একটি ইঞ্জিন তৈরি করার যা জ্বালানি হিসেবে বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন ব্যবহার করবে। বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন পোড়ালে তা থেকে দূষণের মাত্রা প্রায় শুন্য। রাশিয়া ইতিমধ্যে হাইড্রোজেন চালিত বিমান তৈরি করেছে। এই হাইড্রোজেনকে গাড়ির জ্বালানি কোষ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে পেট্রোলিয়াম ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে যাবে।

লাভা থেকে প্রাপ্ত জিওথার্মাল তাপ

উচ্চ তাপমাত্রার লাভা যখন পানির সংস্পর্শে আসে তখন যে বাস্প নির্গত হয় তাকে জিওথার্মাল তাপ বলে। এই বাস্পকে টার্বাইনের মধ্যে চালিত করে শক্তি উৎপাদন করা যায়। আইসল্যান্ডে এই বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে উত্তপ্ত ম্যাগমার গর্তে পানি প্রবাহিত করে ৮৪২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বাস্প তৈরি করে জিওথার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের টার্বাইনের মধ্যে দিয়ে চালিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

জিও থার্মাল পদ্ধতি; Image Source: Daily Mail

সৌরশক্তি

নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসগুলোর মধ্যে সব থেকে কার্যকরী হল সৌরশক্তি। সূর্যের আলো অদূর ভবিষ্যতে শেষও হয়ে যাবার ভয় নেই। জার্মানি এখনই প্রায় ২০ টা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের সমান বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকেই উৎপাদন করছে যা তার চাহিদার ৫০%। স্পেনও চাহিদার প্রায় ৫০% সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করছে। সৌরকোষ নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে যেন কোষগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

সোলার প্যানেল; Image Source: MIT Energy Initiative

জৈব জ্বালানি

২০০২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে ৫০০%। গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ইথানল বা বায়োডিজেলের ব্যবহারও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখন বায়োডিজেলের জন্য এক ধরণের শৈবাল ব্যবহৃত হয় যার ৫০% ই জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগে আর এই শৈবাল জন্মানোর জন্য আলাদা করে কোন যত্ন নিতে হয়না।

জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। এটা নিয়ে এখন মানুষ অনেক সচেতন। তাই বিকল্প জ্বালানির জন্য চলছে নিত্যনতুন গবেষণা। এই গবেষণার সফলতার উপরেই নির্ভর করছে আমাদের পরিবেশের ভবিষ্যৎ।