অজানাকে জানার অদম্য কৌতূহল মানুষের। বিশেষত অনাগত ভবিষ্যৎ কেমন হবে, এ ব্যাপারে যেন তাদের আকাশচুম্বী আগ্রহ। আর সেই অনাগত ভবিষ্যৎ যদি তাদের মৃত্যু পরবর্তী কোনো সময় হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই।

আজকের এই দিনে যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি পৃথিবীর বুকে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, তাদের অধিকাংশেরই জীবনাবসান হবে ২১০০ সালের অনেক আগেই। আর যারা বেঁচে থাকবে, তাদের মাঝেও সবকিছু অনুধাবনের মতো পর্যাপ্ত শারীরিক ও মানসিক শক্তি আর অবশিষ্ট থাকবে না। তাই তাদের পক্ষে জানা এ-ও সম্ভব হবে না যে, আসন্ন শতকটিতে কী অপেক্ষা করে রয়েছে মানবজাতির জন্য, এবং কোন কোন নতুন অভিজ্ঞতাই বা লাভ করতে চলেছে তারা।

তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে যাদের জানার অসীম আগ্রহ রয়েছে, তাদের জন্য একটি সুখবর হলো, এখনই তারা প্রাথমিক কিছু ধারণা লাভ করতে পারবে আসন্ন শতকটি সম্পর্কে। ভাবছেন, কীভাবে তা সম্ভব হবে? এক্ষেত্রে তাদের পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে কিছু প্রশ্ন ও কিছু পরিসংখ্যান। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, পাঁচটি প্রশ্ন ও পরিসংখ্যান তাদেরকে সাহায্য করবে। এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসবে যে পরিসংখ্যানগুলো, সেগুলোর মাধ্যমে কল্পনাপ্রবণ মানুষ চাইলেই অনুমান করে নিতে পারবে ২১০০ সালের পৃথিবী সম্পর্কে।

তাহলে পাঠক, চলুন আর দেরি না করে একে একে জেনে নিই কী সেই পাঁচটি প্রশ্ন, আর সেগুলোর উত্তরে বেরিয়ে আসা পরিসংখ্যানগুলোই বা কী।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি কীভাবে অব্যহত থাকবে?

জনসংখ্যা বৃদ্ধি; Image Source: BBC

দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে জাতিসংঘ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গাণিতিক হিসেবের মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল যে, ২১০০ সাল নাগাদ এই পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ১১.২ বিলিয়ন। তবে এটি কোনো নিশ্চিত তথ্য নয়, বরং নিছকই একটি পূর্বানুমান মাত্র। এর বাইরেও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে চলতি শতক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর জনসংখ্যা এমনকি ১৬.৬ বিলিয়ন পর্যন্ত উঠে যাওয়ার। তাছাড়া খুব ক্ষীণভাবে হলেও এমন সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, ২১০০ সাল নাগাদ হয়তো পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৭.৩ বিলিয়ন, যা এমনকি পৃথিবীর বর্তমান (২০১৭ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য) জনসংখ্যা ৭.৫ বিলিয়নের চেয়েও কম। তবে জাতিসংঘ প্রকাশিত সব ধরনের দৃশ্যপটই একটি ব্যাপার নিশ্চিত করছে যে, অন্তত ২০৫০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।

মানুষের গড় বয়স কেন বাড়ছে?

মানুষের গড় বয়স; Image Source: BBC

এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, আমরা পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকছি, এবং তুলনামূলক অনেক কম সন্তান জন্ম দিচ্ছি। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত, পৃথিবীর অনেক দেশেই মানুষ এমনকি তাদের ৫০তম জন্মদিন উদযাপনের আশাটুকুও করতে পারত না। বয়স ৪০ এর ঘরে থাকতেই মারা যেত অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু আজ, পৃথিবীর গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ৭২ বছরের কাছাকাছি, এবং ২১০০ সালে তা বেড়ে ৮৩ বছরে উত্তীর্ণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা মানে পৃথিবীতে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এবং বংশবৃদ্ধির হার নিম্নগামী হওয়া মানে হলো তুলনামূলক কম নতুন মানুষের আবির্ভাব ঘটছে ওইসব বৃদ্ধদের স্থলাভিষিক্ত হতে। এর ফলে তথাকথিত জনসংখ্যা পিরামিড পরিণত হচ্ছে মৌচাকে!

আমরা কোথায় বাস করবো?

গ্রাম ও শহরে বাসের তুলনামূলক চিত্র; Image Source: BBC

পৃথিবীতে মেগাসিটির সংখ্যা আসলে কত, এ নিয়ে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে জাতিসংঘ বলছে, বর্তমানে পৃথিবীতে মেগাসিটির সংখ্যা ৩১, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে মেগাসিটির সংখ্যা দাঁড়াবে ৪১-এ, যেখানে বসবাসকারীর সংখ্যা অন্তত ১০ মিলিয়ন হবে। এবং ২০৫০ সাল নাগাদ, পৃথিবীর প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে দুইজনই বাস করবে শহুরে এলাকায়। চরম ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো সব মানুষকেই ঠাঁই দিতে পারবে আশ্চর্যজনক সীমিত ভূমির মাঝে। তখন শহরে বসবাসকারী জনসংখ্যা হবে ৬.৩ বিলিয়ন, এবং সম্মিলিতভাবে ওইসব শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব হবে বর্তমান মুম্বাইয়ের জনসংখ্যার ঘনত্বের সমান।

পৃথিবীর শক্তি কোথা থেকে আসবে?

মানুষের ব্যবহৃত শক্তির উৎস; Image Source: BBC

বর্তমানে মানবজাতির ভোগ করা শক্তির সিংহভাগই – ৮৬ শতাংশ – আসে ফসিল বা জীবাশ্ম থেকে প্রাপ্ত ফুয়েলের মাধ্যমে। এছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তির পরিমাণ পৃথিবীর মোট শক্তির ১০ শতাংশ, কিন্তু এর পরিমাণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তি ভোগের পরিমাণ ছিল পাঁচ বছর আগের অর্থাৎ ২০১০ সালের তুলনায় ৭.৫ গুণ বেশি। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করবে নবায়নযোগ্য শক্তি। ফলে যেসব দেশের অধীনে প্রচুর পরিমাণ খালি জমি পড়ে আছে, তারা সেসব জমিতে বায়ু ঘূর্ণন যন্ত্র এবং সোলার প্যানেল গড়ে তুলতে পারবে, এবং এর মাধ্যমে তারা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে যাবে।

ভবিষ্যতে মানুষের চাকরি কীভাবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দখলে চলে যাবে?

অটোমেশনের ফলে চাকরির বাজারে বিভাজন; Image Source: BBC

যুক্তরাষ্ট্রের মোট চাকরির বাজারের প্রায় অর্ধেকই অদূর ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী রোবট অথবা কম্পিউটারের দখলে চলে যাবে, এমনটাই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তবে এক্ষেত্রেও একটি ‘কিন্তু’ আছে। কিছু চাকরির স্বয়ংক্রিয়তা লাভের সম্ভাবনা অন্যান্য চাকরির তুলনায় বেশি। আগামী এক বা দুই দশকের ভিতরই দেখা যাবে, টেলিমার্কেটার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ট্যাক্সি চালকদের যেসব চাকরি রয়েছে, সেগুলো মানুষের হাতছাড়া হয়ে গিয়ে, চলে যাবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দখলে। ফলে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারকেও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে সৃষ্ট চাপের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। তারপরও বিদেশে শ্রম রপ্তানির মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যার ফলস্বরূপ সবচেয়ে বেশি ধাক্কাটা খাবে বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশগুলো, যারা জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে এখনই ব্যর্থ।