বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার কথা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোট ছোট বাচ্চাদের ঘাড়ে নিজের থেকেও বড় আকারের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়া, শ্রেণীকক্ষে সারি বেঁধে বসে শিক্ষকের কথা শোনা, কিছুদিন পরপর পরীক্ষায় বসা আর সামান্য কিছু নম্বরের জন্য অন্যদের সাথে অস্বাস্থ্যকর একটা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া। শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু এভাবেই শিক্ষাগ্রহণ করছে বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা। তার ফলে, অনেক শিশুরই স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

হোমস্কুলিংয়ের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়বে; Image Source: Raise Smart Kid

চিরদিন কি এই অবস্থা বিদ্যমান থাকবে? একদমই না। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে ভবিষ্যৎ পৃথিবী যেমন সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করবে, সেই বদলের হাওয়া লাগবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও। ২০৫০ সাল নাগাদ শিক্ষাব্যবস্থায় ঘটবে আমূল পরিবর্তন। চলুন, দেখে নেয়া যাক, ২০৫০ সালের শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক কেমন হতে পারে।

হোমস্কুলিং পাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা

স্কুলের পাঠদান পদ্ধতির সবচেয়ে বড় গলদ হলো, সেখানে সব বাচ্চাকে সমানভাবে দেখা হয়। কিন্তু সব বাচ্চার প্রয়োজনীয়তা তো আর এক না। তাই প্রতিটা বাচ্চার দরকার একক যত্ন, যেটি কেবল হোমস্কুলিংয়েই সম্ভব। তাই হোমস্কুলিং এখনই উন্নতবিশ্বে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে যে ২.৩ মিলিয়ন শিক্ষার্থী হোমস্কুলিংয়ের সহায়তা নিচ্ছে, তার মধ্যে ২ মিলিয়নই শিশু। আর এর ফলে তাদের বাবা-মায়ের বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলার বেঁচে যাচ্ছে, যা অন্যথায় করের পেছনে ব্যয় হতো। এভাবে হোমস্কুলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার মনমতো বিষয় শিখতে এবং জানতে পারবে, তাও আবার নির্দিষ্ট কোনো সময়ে নয়, বরং যখন খুশি, যতক্ষণ খুশি।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাঠ্যসূচি হবে আলাদা ও স্বতন্ত্র; Image Source: YouTube

এর মাধ্যমে তারা একাধারে পাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা, তাদেরকে দেয়া হবে আরো শারীরিক, ব্যবহারিক এবং আবেগিক বিষয়ের শিক্ষা, এবং তারা পাবে শৈশবে পরিবারের সাথে আরো বেশি সময় কাটানোর সুযোগ। এর ফলে শিশুদের কাছে শিক্ষা আবার হয়ে উঠবে আনন্দদায়ক, অসুস্থ প্রতিযোগিতা দূর হবে, এবং ‘বুলিং’ আর থাকবে না শিক্ষাব্যবস্থার অংশ।

পাঠ্যসূচিতে আসবে নিজস্বকরণ

স্কুলে এখন যেমন সব শিক্ষার্থীকেই একই পাঠ্যসূচির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, হোমস্কুলিং ব্যবস্থায় সেটির আর প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। সকল শিক্ষার্থীর মেধা, স্মরণশক্তি ও দক্ষতা তো এক নয়। কোনো শিক্ষার্থী অল্প পড়েই কোনো পড়া মনে রাখতে পারে, আবার কোনো শিক্ষার্থীর অনেক সময় লাগে। কোনো শিক্ষার্থী ব্যবহারিক খাতে অন্যদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। এভাবে বছর শেষে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়।

কিন্তু পাঠ্যসূচিতে নিজস্বকরণ আসায়, প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাঠ্যসূচি হবে একদমই স্বতন্ত্র। সেখানে তার শক্তিমত্তা ও দুর্বলতার দিকগুলোতে নজর দেয়া হবে। যেসব বিষয়ে সে দক্ষ, সেগুলো বেশি বেশি থাকবে, আর দুর্বল বিষয়গুলো লম্বা সময় ধরে আস্তে আস্তে পড়ানো হবে যাতে সে সেগুলো দেরিতে হলেও আয়ত্ত করে নিতে পারে। এভাবে পাঠ্যসূচিতে নিজস্বকরণ পাঠদানকে আরো গতিময় করবে, শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণও হবে আনন্দময়, সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থা হবে আরো কার্যকর।

আসবে আরো ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম

প্রযুক্তির সহায়তায়, জ্ঞান ও তথ্যের আদান-প্রদান ইতিমধ্যেই অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে আসবে আরো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। শিক্ষার্থীরা যেকোনো প্রয়োজনে একজন শারীরিক শিক্ষকের আগে সহায়তা নিতে পারবে অনলাইনের, এবং অনলাইন থেকেই তারা ৯০ শতাংশ বিষয়ে শিখে নিতে পারবে। তাছাড়া পাঠদান পদ্ধতিতে যুক্ত হবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। ফলে শিক্ষার্থীদেরকে কেবল গৎবাঁধা পড়া মুখস্ত করতে হবে না। সরাসরি পাঠ্যসূচির বিষয়টির অভিজ্ঞতা তারা পাবে, সেটিকে অনুভব করতে পারবে। সব মিলিয়ে ওই বিষয়ে তাদের শিক্ষা সম্পূর্ণতা লাভ করবে।

এমন শারীরিক ক্যাম্পাস একসময় আর থাকবে না; Image Source: Wikipedia

বিলুপ্ত হবে শারীরিক ক্যাম্পাস

এখন যেমন আমরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলেই একটি ক্যাম্পাসের কথা ভাবি, ভবিষ্যৎ পৃথিবী থেকে সম্ভবত বিলুপ্ত হবে সেধরনের শারীরিক ক্যাম্পাস। বরং ভ্রাম্যমাণ শ্রেণীকক্ষ এবং প্রকৃত বিশ্ব পরিবেশ হয়ে উঠবে এর বিকল্প নতুন ক্যাম্পাস। ফলে শিক্ষাগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে সবসময় একই স্থানে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না। তারা যেকোনো স্থান থেকেই তাদের শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে পারবে। তবে শারীরিক ক্যাম্পাসের বিলুপ্তি ঘটলেও, গ্রন্থাগার ও পরীক্ষাগার ব্যবস্থা হয়তো আরো অনেকদিন টিকে যাবে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি শ্রেণীকক্ষে বড় ভূমিকা রাখবে; Image Source: EdTech Times

শ্রেণীকক্ষে বাড়বে এড-টেকের ব্যবহার

এখনো বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শ্রেণীকক্ষেই শিক্ষকেরা তাদের শিক্ষার্থীদেরকে বই থেকে গৎবাঁধা, তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন। কিন্তু ভবিষ্যতে এড-টেক তথা শিক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়ে যাবে। বই থেকে নয়, বরং শিক্ষকেরা সরাসরি প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠ্যবিষয় শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরবেন। পাশাপাশি শ্রেণীকক্ষে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবস্থাও থাকবে।

শিক্ষকের ভূমিকা হবে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ; Image Source: firstbencher.com

আরো থাকবে বিষয়বস্তু সংস্লিষ্ট বিভিন্ন গেমস, রোবট ইত্যাদি, যা শিক্ষার্থীদেরকে ওই বিষয় আরো ভালো করে বুঝতে সাহায্য করবে। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সামনে আসবে আরো গভীরভাবে চিন্তা করা ও নিজেরা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করার সুযোগ। চিরাচরিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা দেয়ার বদলে তারা বিভিন্ন সৃজনশীল প্রজেক্ট তৈরির মাধ্যমে দেবে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ।

শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক

এতদিন শিক্ষকদের কাজ ছিল নিজেই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্ন জ্ঞান বিতরণ করা, তাদেরকে নতুন নতুন বিষয়ের সাথে পরিচিত করে তোলা। কিন্তু ভবিষ্যতে শিক্ষকদের এই ভূমিকা আর পালন করতে হবে না। বরং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিভিন্ন আগ্রহোদ্দীপক বিষয়বস্তুর সন্ধান পাবে, এবং অনলাইন ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে তারা নিজেরাই ওই বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করে ফেলবে। কিন্তু তারপরও তাদের বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন তো থেকেই যাবে।

তখন তাদের প্রয়োজন হবে একজন শিক্ষকের। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সকল বিভ্রান্তি দূর করে দেবেন, অজানা উত্তরগুলো সহজভাবে বুঝিয়ে দেবেন। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত শিক্ষক মানেই যে নিজে কোনো বিষয় শিক্ষার্থীদেরকে পড়িয়ে দেয়া, সেই প্রচলনের সমাপ্তি ঘটবে। বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হবে একই পথের পথিক। তফাৎ শুধু এই যে, শিক্ষকেরা ওই পথে আগেও হেঁটেছেন। তাই শিক্ষার্থীরা পথ হারালে তাদের কাজ হবে শিক্ষার্থীদের ভুল ধরিয়ে দেয়া, তাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া।

সামাজিক ও আবেগিক দক্ষতা পাবে সর্বোচ্চ প্রাধান্য

এখন পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক বিষয়বস্তু বেশি গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। প্রাপ্ত শিক্ষা দৈনন্দিন প্রয়োজন, সর্বোপরি কর্মক্ষেত্রে কীভাবে কাজে আসবে, তখন সেগুলোর প্রয়োগ কীভাবে ঘটাতে হবে, এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সম্যক জ্ঞান দেয়া হয় না বললেই চলে। তাই বাস্তব জগত বা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। তাদেরকে নতুন করে সব কিছু শিখতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক ও আবেগিক দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হবে।

অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা কেবল কোনো নতুন জ্ঞান অর্জন করলেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে না। বরং শিক্ষার অংশ হিসেবেই তারা এগুলোও জেনে নেবে যে অর্জিত শিক্ষাগুলো তারা ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করবে। সমাজের সাথে তারা কীভাবে মানিয়ে নেবে, বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে নিজেদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, এই বিষয়গুলোতে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হবে।