একটা লম্বা সময় পর্যন্ত অডিও ভিজুয়াল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মানুষের কাছে কেবল দুইটি জিনিসই পরিচিত ছিল – সিনেমা হলের বড় পর্দা, আর টেলিভিশনের ছোট পর্দা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সব হিসাব-নিকাশ পালটে দিয়েছে অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলো।

এগুলো শুধু টিভিতেই নয়, দেখা যায় কম্পিউটার, ট্যাব, মোবাইল, গেমিং কনসোল প্রভৃতিতেও। তাই ক্ষেত্রবিশেষে এটির সম্প্রচার মাধ্যম টিভির চেয়েও ছোট পর্দা। অথচ এর মাধ্যমেই বিনোদন জগতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এই স্ট্রিমিং সার্ভিস।

শুধু টিভি নির্মাতারাই এখন অনলাইনের জন্য কনটেন্ট নির্মাণ করছে না। অনলাইনের জন্য এমনকি অরিজিনাল, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হচ্ছে। আর সেগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চেও। সুতরাং, খুবই সামান্য সময়ের ব্যবধানে অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস ঠিক কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ বছরই আসতে চলেছে ডিজনির নিজস্ব স্ট্রিমিং সার্ভিস, ডিজনি প্লাস; Image Source: Getty Images

এতদিন পর্যন্ত স্ট্রিমিং সার্ভিসের অবিসংবাদিত রাজা ছিল নেটফ্লিক্স। আর তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিল অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, হুলু, এইচবিও নাউ প্রভৃতি। কিন্তু আর খুব বেশিদিন হয়তো নেটফ্লিক্সের পক্ষে তাদের শীর্ষস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কেননা এই বছরই বাজারে আসতে চলেছে ওয়াল্ট ডিজনি কর্পোরেশনের নতুন নতুন ডিরেক্ট-টু-কনজ্যুমার স্ট্রিমিং সার্ভিস – ডিজনি প্লাস, যার পক্ষে আগমনের সাথে সাথেই নেটফ্লিক্সকে হটিয়ে দিয়ে সিংহাসন দখল করে নেয়া একদমই অসম্ভব কিছু নয়।

ডিজনির শীর্ষস্থান দখলের সম্ভাবনার কারণ

কেন ডিজনি প্লাস এসেই শীর্ষস্থান দখলের যোগ্য হয়ে যাবে? এর কারণ একে তো তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, পাশাপাশি নতুন নতুন সব অরিজিনাল কন্টেন্টের সমাহারও। অথচ এর জন্য গ্রাহকদের পকেট থেকে খসবে খুবই সীমিত অর্থ। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে এই স্ট্রিমিং সার্ভিসটি, যার জন্য গ্রাহকদেরকে প্রতি মাসে গুনতে হবে মাত্র ৬.৯৯ ডলার করে। আর তার বিনিময়ে, একদম শুরুতেই তারা পেয়ে যাবে ১৫টি নতুন টিভি প্রোগ্রাম, এবং অন্তত ১০টি নতুন বা সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।

শুরু থেকেই ডিজনি প্লাসের থাকবে সমৃদ্ধ কনটেন্ট কালেকশন; Image Source: Tech Geeked

সার্ভিসটিতে ডিজনির নিজস্ব ভল্ট থেকে ৪০০টির বেশি চলচ্চিত্র তো থাকবেই, পাশাপাশি তাদের কাছে ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি থাকবে পিক্সার, লুকাসফিল্ম, মার্ভেল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, এবং টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সেরও। এই প্রতিটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাই বর্তমানে মাউস হাউজের দখলে।

যেসব ডিভাইসে দেখা যাবে ডিজনি প্লাস

ডিজনি প্লাস দেখা যাবে স্মার্ট টিভি, ওয়েব ব্রাউজার, মোবাইল ডিভাইস, গেমিং কনসোল এবং সেট-টপ বক্সে। ডিজনি ইতিমধ্যেই সার্ভিসটির ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য চুক্তি করে ফেলেছে রোকুর সাথে।

নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সম্প্রচার

ডিজনি প্লাসকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাখবে যে জিনিসটি, তা হলো একেবারেই সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত কিছু চলচ্চিত্র, যেমন অ্যাভেঞ্জার্জ: এন্ডগেম, টয় স্টোরি ৪, এবং স্টার ওয়ার্স – এপিসোড নাইন – দ্য রাইজ অব দ্য স্কাইওয়াকার, যা শুরুতে এক্সক্লুসিভলি এই স্ট্রিমিং সার্ভিসটিতেই দেখা যাবে।

অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম দেখা যাবে ডিজনি প্লাসে; Image Source: Marvel

অরিজিনাল কনটেন্ট

এছাড়া ডিজনি প্লাস হাঁটবে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, হুলুদের দেখানো পথে। তারাও তৈরি করবে একদমই নিজস্ব কিছু অরিজিনাল কনটেন্ট, যা আর অন্য কোথাওই দেখার সুযোগ থাকবে না। এক্ষেত্রে তারা প্রথমেই অর্থায়ন করছে স্টার ওয়ার্স ইউনিভার্সের আট এপিসোডের টিভি সিরিজ, দ্য ম্যান্ডালোরিয়ানে। বলাই বাহুল্য, স্টার ওয়ার্স ভক্তরা তাই দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাবে ডিজনি প্লাসকে।

মার্ভেল ইউনিভার্সের মালিকানা

তবে সামগ্রিকভাবে ডিজনি প্লাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হবে মার্ভেল ইউনিভার্সের সম্প্রচার স্বত্ব। মার্ভেলের মালিকানা বর্তমানে ডিজনির হাতে থাকার সুবাদে, মার্ভেলের চলচ্চিত্রগুলো একে একে অন্য সব স্ট্রিমিং সার্ভিস থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। এছাড়া নেটফ্লিক্সও আর মার্ভেলের কোনো চরিত্রকে নিয়ে নতুন অরিজিনাল কনটেন্ট বানাবে না। কেননা ডিজনি প্লাস বাজারে আসার পর থেকে, মার্ভেলের সকল চলচ্চিত্র সম্প্রচার এবং মার্ভেল সুপারহিরোদের নিয়ে নতুন অরিজিনাল কনটেন্ট নির্মাণের অধিকার থাকবে কেবল ডিজনি প্লাসেরই।

মার্ভেলের সাথে যুগলবন্দি এগিয়ে রাখবে ডিজনি প্লাসকে; Image Source: Co-Optimus

মার্ভেলের শীর্ষস্থানীয় চরিত্রগুলো তো আছেই, পাশাপাশি তাদের বি ক্যাটাগরির চরিত্রগুলোকেও নতুন আঙ্গিকে, কিংবা প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিয়ে আসবে ডিজনি প্লাস। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে যেসব চরিত্রের মূল ভূমিকায় আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ, তাদেরকে ডিজনি প্লাস দর্শকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে তাদের অরিজিনাল কনটেন্টের মাধ্যমে। এবং এ কথাও নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সেসব অরিজিনাল কনটেন্টের মাধ্যমে চরিত্রগুলো যদি দর্শকদের মাঝে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়, তাহলে পরবর্তীতে তাদের বড় পর্দায় আগমনেরও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

অন-ডিমান্ড কনটেন্ট

এসবের বাইরে ডিজনির থাকবে অন-ডিমান্ড কনটেন্টের ব্যবস্থাও। তাদের থাকবে একটি বিশাল লাইব্রেরি, যেখানে ঠাঁই হবে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও টিভি শোয়ের। কোম্পানিটির দাবি অনুসারে, এক বছর সময়ের মধ্যেই ডিজনি প্লাসের দখলে থাকবে বিভিন্ন ক্লাসিক টিভি শোয়ের ৭,৫০০টি এপিসোড, এবং সেই সাথে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রও।

ডিজনি প্লাসে থাকবে অসংখ্য ক্লাসিক টিভি শো ও চলচ্চিত্র; Image Source: MovieWeb

শেষ কথা

এভাবেই ওয়াল্ট ডিজনির হাত ধরে বিনোদন জগতে পা রাখা ডিজনি প্লাস রাজত্ব কায়েম করবে স্ট্রিমিং সার্ভিসের জগতেও। কেননা নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রভৃতির চেয়ে ডিজনির ব্র্যান্ড ভ্যালু ও গ্রহণযোগ্যতা অবশ্যই অনেক বেশি হবে। ডিজনি নামের সাথে বহুদিনের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে বলে, অপেক্ষাকৃত বয়স্ক গ্রাহকদের কাছে এর একটি আলাদা ঐতিহাসিক মূল্য থাকবে।

আর মার্ভেলের সম্প্রচার স্বত্ব থাকার কারণে, তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগের কাছেও অন্যান্য স্ট্রিমিং সার্ভিসের চেয়ে এটির আবেদনই থাকবে বেশি। ফলে ডিজনি প্লাসের আগমনের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই আমরা স্ট্রিমিং সার্ভিসের জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখতে চলেছি।