সৃষ্টির শুরু থেকেই লেনদেনের চল আছে। মানুষের প্রয়োজনীয় সব কিছু কারও কাছে মজুদ থাকা একপ্রকার অসম্ভব, কারও কাছে চাল থাকতে পারে কিন্তু কাপড় নেই, আবার কারও কাছে মাছ আছে তো চাল নেই। এই সমস্যা কিছুটা মেটালো বিনিময় প্রথা। কারও মাছের প্রয়োজন হলে যার কাছে মাছ আছে তাকে চাল দিয়ে মাছ নেয়া যায়। তবে এখানে একটা সমস্যা আছে।

আমার চাল আছে, মাছ দরকার তাই যার মাছ আছে তাকে চাল দিয়ে মাছ নেয়া যায়, কিন্তু তার যদি চালের দরকার না থাকে তাহলে সে চালের বিনিময়ে মাছ কেন দেবে? এই সমস্যা সমাধানে দরকার ছিল একক কোন বিনিময় ব্যবস্থা যেটা মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে যেকোন বিনিময়কে সহজ করে দেবে। প্রাচীন কালে মুল্যবান ধাতু যেমন তামা বা সোনা এই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে আর যার ধারাবাহিকতায় পরে এসেছে কাগজের মুদ্রা।

বিনিময় প্রথা ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলনা; Image Source: instacks.in

প্রতিটা দেশ তার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের মাধ্যমে চাহিদা আর জোগানের সামঞ্জস্য করে কাগজের মুদ্রা ছাপে যা দেশ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। তবে তাতেও আসলে সব সমস্যার সমাধান হলনা। যেমন একেক দেশের মুদ্রার মুল্যমান একেক রকম ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য বা বিনিময় শতভাগ ঝামেলামুক্ত তা বলা যাবেনা।

সেই সাথে আছে ছিনতাই, ব্যাংক থেকে ডাকাতি বা ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবার মত ব্যপার। শুধু তাই না, এখন আবার ব্যাংকের টাকাও হ্যাকিং হয়ে বেমালুম গায়েব হয়ে যাচ্ছে! তবে একটা কথা আছে “প্রয়োজনই সকল উদ্ভাবনের জন্মদাত্রী” তাই প্রয়োজনের খাতিরেই মানুষ একের পর এক বিস্ময় উপহার দিয়ে যাচ্ছে। আজ আমরা সেইরকম এক বিস্ময়ের সাথেই পরিচিত হব।

ক্রিপ্টোকারেন্সির পটভূমি

আমরা অধিকাংশ সময়েই লেনদেনের ব্যপারে কোন না কোন তৃতীয় পক্ষের উপরে নির্ভর করি আর অধিকাংশ সময়েই এই তৃতীয় পক্ষ হল ব্যাংক বা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেই সাথে আমরা চাই যেন আমাদের এই লেনদেন শতভাগ নিরাপদ থাকে এবং গোপন থাকে। আস্থার অভাব এখানে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

এখন যদি কোন তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়াই যদি নিরাপদ আর নিশ্চিন্তে নগদ ছাড়া টাকার লেনদেন করা যেত তাহলে সেটা অনেক সহজ হত, সময়ও কম লাগত। এই রকমই একটা ব্যবস্থা ক্রিপ্টোকারেন্সি। এই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বলা হচ্ছে আর্থিক লেনদেনের ভবিষ্যৎ যা কাজ করে ব্লকচেইন নামক প্রযুক্তির উপরে ভিত্তি করে।

আর প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি হল বিটকয়েন যা উদ্ভাবিত হয় সাতোশি নাকামোতোর হাত ধরে। এই সাতোশি নাকামোতো নামটি বেশ ধোয়াটে, কেউ জানে না কে এই ব্যক্তি। এমনকি এটি কোন এক ব্যক্তির নাম নাকি কোন গোষ্ঠীর নাম সেটাও অজানা।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা আর জটিলতাই ডিজিটাল মুদ্রার ধারণাকে বেগবান করেছে; Image Source: freepik.com

ক্রিপ্টোকারেন্সি কী

সোজা কথায় ক্রিপ্টোকারেন্সি হল ডিজিটাল কারেন্সি যার কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এটি কোন সরকার বা ব্যাংক তৈরি করে না বরং এটি মাইনিং করতে হয়। আর অনেক জটিল সব ব্লকচেইন অ্যালগরিদম এবং এনক্রিপশন পদ্ধতি পার করে এক একটি কয়েন তৈরি করতে হয়।

ব্লকচেইন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রথম দিকে বেশ কম সময়ে একটি কয়েন তৈরি করা গেলেও আস্তে আস্তে তৈরি করার সময় যেমন বেড়ে যায় আর সেই সাথে এর দামও হু হু করে বেড়ে যায়। এখানে লক্ষণীয় যে প্রচলিত মুদ্রা যেমন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং তারা চাইলে এর উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির বেলায় সেটা সম্ভব না। চাইলেই কেউ ইচ্ছামত এটা বানাতে পারবেনা আবার মাইনিং করেও অঢেল কয়েন বানিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।

এর অ্যালগরিদম এমনই যে কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি কয়েন একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি তৈরি করা সম্ভব না। যেমন Onecoin নামক ক্রিপ্টোকারেন্সিটি সর্বোচ্চ ২১ কোটি কয়েন তৈরি করতে পারবে আর জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই সংখ্যক কয়েন তৈরি করতে ২১৪০ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে। বিষয়টা অনেকটা খনি থেকে সোনা তোলার মত।

একটা খনি থেকে চাহিদা মত সোনা তোলা হলেও এর দাম আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে আর সব সোনা তোলা হয়ে গেলেও কিন্তু দাম থেমে যায়না বরং চাহিদা বাড়তে থাকে আর ওই নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনাই বাড়তি দামে হাতবদল হতে থাকে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ইচ্ছামত তৈরি করা যায়না; Image Source: hackernoon.com

ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপদ্ধতি

এই ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন হয় ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। আর এর এনক্রিপশনের জন্য ব্যবহৃত হয় ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ ফাংশনের একটি সেট যা SHA-256 নামে পরিচিত। এটির পরিকল্পনায় ছিল ইউএস ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি। এখন আপনি যখন ইলেকট্রিক মাধ্যমে কোন লেনদেন করবেন তখন সেখানে আপনাকে একটি নিজস্ব সিকিউরিটি কি দিতে হবে যা আপনার লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এবার এটা পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে এবং এটি ভেরিফাইড হবে কোন এক মাইনারের মাধ্যমে। যখন কোন ডাটা হ্যাশ ফাংশনের মাধ্যমে এনক্রিপটেড করা হয় তখন রুপ হয় 000001abace3785d515987041af0a7 এরকম একটি বিদঘুটে জিনিষের মত। তবে এটি কিন্তু একেবারে এলোমেলো না। একি ধরনের ডাটার হ্যাশ সেট দেখতে একি রকম হবে। এর পর সারা দুনিয়ার তাবৎ মাইনাররা চেষ্টা করবে এই নির্দিষ্ট প্যাটার্নের হ্যাশ সেটের সাথে আর কোন সেটের হুবহু মিল আছে। যখন কোন মাইনার সেটি খুজে পাবে তখন এই লেনদেন অনুমোদিত লেনদেন হিসেবে একটি ব্লক তৈরি করবে আর ব্লকচেইনের মাধ্যমে অন্য সব লেনদেনের সাথে যুক্ত হবে।

যে মাইনার এটি খুঁজে পাবে সে একটি কয়েন টোকেন লাভ করবে। আর অন্য মাইনাররা ভেরিফাই করবে এই বিজয়ী মাইনারের ফলাফল সঠিক কিনা। শতকরা হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মাইনারের ভেরিফিকেশনের পরেই একটি ব্লক পরীক্ষিত হিসেবে ব্লকচেইনের অন্তর্গত হয়।

মাইনাররা সঠিক ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে নতুন কয়েন তৈরি করতে পারে; Image Source: finder.com.au

ক্রিপ্টোকারেন্সির ভবিষ্যৎ

প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে বিটকয়েনের যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। এর পর থেকে এর ব্যপক সাড়া আর নিরাপত্তা জনিত গ্রহণযোগ্যতার কারণে মনে করা হচ্ছে যে এটিই আগামীর অর্থনীতির বাহক হয়ে দাঁড়াবে। যে কারণগুলোর জন্য এটি এত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেগুলো হলঃ

  1. এখন যেমন লেনদেনের জন্য ব্যাংকে যেতে হয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে লেনদেনের জন্য কোথাও যেতে হবেনা। ঘরে বসেই যেকোন সময়ে এটা করা যাবে।
  2. এটি একদম নিরাপদ এবং ব্যবহারকারীর গোপনিয়তাও শতভাগ নিশ্চিত থাকে।
  3. হ্যাকাররা যদি আপনার ডাটা হ্যাক করতে চায় তাহলে তাদের একি সময়ে অসংখ্য ব্লক হ্যাক করে আপনার ডাটা খুজে বের করতে হবে যা একপ্রকার অসম্ভব। কারণ প্রতিটা ব্লকের নিরাপত্তা কি আলাদা আলাদা।

ক্রিপ্টোকারেন্সিই মুদ্রা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ; Image Source: steemit.com

ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো মুদ্রা হিসেবে কোন দেশে স্বীকৃতি পায়নি। তবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এখনি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে সবথেকে প্রচলিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন গ্রহন করে। আর এর জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিল গেটস তো বলেই দিয়েছেন

“Bitcoin is better than any other currency”.