আমাদের চারপাশের সবকিছুই নিয়ত পরিবর্তনশীল। গতকাল একটি জিনিসকে যেমন দেখেছি, আজও কি সেটি ঠিক তেমনই আছে? একদমই না। কিছুটা পরিবর্তন তো হয়েছেই। সময়ের ব্যবধান খুব কম হওয়ায়, সূক্ষ্ম সেই পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ছে না।

একই কথা কিন্তু প্রযোজ্য আমাদের নিত্য ব্যবহার্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও। সকালবেলা চোখ মেলার পরই যে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে ঢুঁ মারছি, যেখানে দিনের লম্বা একটা সময়ের ব্যয় কিংবা অপব্যয় করছি, সেগুলো কি সবসময়ই একরকম রয়েছে? না, রোজই একটু একটু করে বদল হচ্ছে সেগুলো। একটু বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করলে, দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করলে পরিবর্তনগুলো সহজেই চোখে পড়বে।

Image Source: Point Visible

মাত্র এক বা দেড় দশক আগেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে আমরা যে রূপে দেখেছি, তার সাথে আজকের রয়েছে বিশাল পরিবর্তন। এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল জগৎ যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে, তাতে ভবিষ্যতে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আরো অজস্র বিবর্তন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে, সে কথা বলাই বাহুল্য।

দুই পর্বের এই লেখার প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সম্ভাব্য কয়েকটি ভবিষ্যৎ পরিবর্তন সম্পর্কে। চলুন, এবার জেনে নেয়া যাক বাকি পরিবর্তনগুলোর ব্যাপারেও।

ভবিষ্যতে আমূল পরিবর্তন ঘটবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে; Image Source: Point Visible

ইতিবাচক উত্তরাধিকার সৃষ্টি

বলা হয়ে থাকে, ইন্টারনেটে সবকিছুই দোয়াত কলমে লেখা। অর্থাৎ কোনো কিছু একবার লেখা হলে, সেগুলো আর মুছে ফেলা যায় না। ব্যাপারটি যে কতটা গুরুতর, কখনো কি ভেবে দেখেছেন?

আজ থেকে একশো বছর পর হয়তো আপনি, আমি আর এই পৃথিবীর বুকে বিরাজ করব না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের প্রোফাইলগুলো ঠিকই রয়ে যাবে। সকলেই সেগুলো দেখতে পাবে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের গোটা জীবন ইতিহাসই প্রামাণ্য চিত্রের মতো ফুটে উঠবে। তারা চাইলেই আমাদের ব্যাপারে যেকোনো কিছু জেনে নিতে পারবে।

এর মানে হলো, আজ স্রেফ খেয়ালের বশে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেগুলো পোস্ট করছি, শুধুমাত্র কিছু লাইক-কমেন্ট-শেয়ারেই সেগুলোর গুরুত্ব সীমাবদ্ধ নয়। সেগুলো চিরকাল ধরে আমাদের জীবন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলবে। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা এখনো সেভাবে ভেবে দেখিনি, কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো আমরা খুব বেশি মৃত মানুষের প্রোফাইল দেখি না।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও দৃশ্যমান হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কর্মকান্ড; Image Source: Facebook

কিন্তু আর একটি প্রজন্ম পরেই, কিংবা আজ থেকে ৫০ বছর পর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর মৃত প্রোফাইল দেখা যাবে। সেসব প্রোফাইল ঘুরে ঘুরে দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপলব্ধি হবে যে, তারাও একদিন থাকবে না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া তাদের পোস্টগুলো ঠিকই রয়ে যাবে। আর তখন থেকেই তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মসচেতনতা সৃষ্টি হবে।

তাই এখনের মতো ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেকোনো কিছু পোস্ট করবে না। তারা অনেক ভেবেচিন্তে, কেবল সেগুলোই পোস্ট করতে উদ্যত হবে, যেগুলো উত্তরসূরীদের কাছে তাদের একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তির জন্ম দেয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা বৃদ্ধি

এখন পর্যন্ত প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই অনেক সাবধানে, দেখে-শুনে পা ফেলেছে। কারণ হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও উন্মাদনা সৃষ্টি হলেও, কেউই নিশ্চিত ছিল না যে এই জনপ্রিয়তা ও উন্মাদনা কতদিন স্থায়ী হবে। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল, কোনো এক সময় হয়তো মানুষের আগ্রহ মরে যাবে, ঠিক যেভাবে অন্যান্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নতুন কোনো ইস্যু পেলে পুরনো ইস্যুকে ভুলে যায় মানুষ। আর তাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিয়ন্ত্রকরা চাইলেও অনেক উদ্ভাবনী ধারণার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে পারেনি।

বিভিন্ন ফিচার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ঝুঁকি গ্রহণের হার বাড়বে; Image Source: Getty Images

কিন্তু আজ থেকে ৫০ বছর পরও যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, তাহলে প্রমাণ হয়ে যাবে যে এই সাম্রাজ্যের আকস্মিক পতন ঘটবে না। তখন উদ্ভাবকদের মনে সাহস সঞ্চার হবে নতুন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার। সেগুলো সবই যে অনেক ভালো কিছুর জন্ম দেবে, তা হয়তো নয়। কিন্তু এ কথা মানতেই হবে যে, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অনলাইনের গুমোট একঘেয়েমি কেটে গিয়ে তাজা বাতাসের প্রবেশ ঘটবে।

মোবাইল-ফ্রেন্ডলি ইন্টারফেস

শুরুর দিকে যেসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এসেছে, সেগুলো কোনোটিই কিন্তু মোবাইল ব্যবহারকারীদের কথা চিন্তা করে ডেভেলপ করা হয়নি। কারণ তখনো বিশ্বব্যাপী মোবাইলের এত বেশি জনপ্রিয়তা ছিল না। ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য বেশিরভাগ মানুষ কম্পিউটারই ব্যবহার করত। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের জন্য মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করে থাকে। তাই ভবিষ্যতে কেবল মোবাইল-উপযোগী অনেক নতুন প্ল্যাটফর্মও তৈরি হবে, এবং সেগুলোর সামগ্রিক ইন্টারফেসই মোবাইলের জন্য উৎসর্গ করা হবে। এখন যেমন শুরুতে ডেস্কটপ সংস্করণ তৈরি করে, পরে সেগুলোর মোবাইল সংস্করণ তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়া হয়, তা আর ভবিষ্যতে হবে না।

কেবল মোবাইলের কথা মাথায় রেখেই ডেভেলপ করা হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম; Image Source: Oracol Tech

সম্পর্কের মানোন্নয়ন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্ধু ও পরিবারের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই প্রাথমিক লক্ষ্য থেকে বর্তমানে অনেকটাই সরে এসেছে ব্যবহারকারীরা। মোবাইলের পর্দায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ব্রাউজ করতে গিয়ে, তারা ভুলে যাচ্ছে সামনে থাকা রক্ত-মাংসের বন্ধু বা পারিবারিক সদস্যটির কথা। এভাবে সম্পর্কের গাঁথুনি আলগা হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক মজবুত করতে গিয়ে, মানুষ হারিয়ে ফেলছে তাদের বাস্তব জগতের সম্পর্কগুলোকে।

বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে অনলাইনকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার এই প্রবণতা কমবে; Image Source: Study Breaks Magazine

এর দায়ভার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এড়াতে পারবে না। এগুলো এমন নকশায় তৈরি করা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষ তার ফাঁদে পা দিতে বাধ্য। কিন্তু আশার কথা হলো, দেরিতে হলেও ডেভেলপাররা তাদের ভুল বুঝতে পারছে। তাই তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফিচারগুলোকে এমনভাবে উন্নত করে তোলার, যাতে সেগুলো ব্যবহারকারীদের সম্পর্ককে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।

ভিডিও, ভিডিও, এবং আরো ভিডিও

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় ফিচার হলো ভিডিও। এগুলো ব্যবহার করে আমরা কোনো প্রিয়জনকে সরাসরি স্পর্শ করতে পারছি না বটে, তবে সবচেয়ে কাছাকাছি যে কাজটি করতে পারছি, তা হলো প্রতি মুহূর্তে তাদেরকে ভিডিওতে দেখতে পারছি। যতদিন না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোর্ট-কি বা ফ্লু পাউডার জাতীয় কিছুর আবির্ভাব ঘটবে, ততদিন ভিডিওই বিবেচিত হবে সবচেয়ে সম্মানজনক বিকল্প হিসেবে। আর ততদিন ভিডিওর চাহিদা বাড়তেই থাকবে। ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণ ও ঘন ঘন লাইভে আসার প্রবণতাও বাড়বে।

ভিডিওর চাহিদা ও ব্যবহার আরো বাড়বে; Image Source: Wipster

ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে লাইভ ভিডিও টেলিকাস্টসহ ভিডিওর বিভিন্ন ফিচার চালু হয়েছে। ভবিষ্যতে স্ট্রিমিং সাইটগুলোর মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রিমিয়াম ভিডিও কনটেন্ট এবং লাইভ টিভির দেখা মিলবে। এর বাইরেও ভিডিও-কেন্দ্রিক আরো অনেক কিছুই আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলো যে কী, তা জানার জন্য আমাদেরকে আরো খানিকটা সময় অপেক্ষা করতেই হবে।