অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আমাদের রোজকার জীবনে এদের ব্যবহার ও প্রভাব প্রতিনিয়ত এতটাই বেড়ে চলেছে যে, আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমবিহীন জীবনের কথা চিন্তাও করা যায় না।

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এগুলো কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের একদমই সাম্প্রতিক ফলাফল, এবং ভবিষ্যতে এদের আরো অনেক বিবর্তন ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতিকে আমরা যেভাবে দেখছি, কয়েক দশক পর তা আমূল পাল্টে যেতে পারে। এমন নতুন অনেক উপাদানেরই সংযোজন ঘটতে পারে, যা হয়তো আমরা এই মুহূর্তে কল্পনাও করতে পারছি না।

তারপরও, সাম্প্রতিক পরিবর্তনসমূহের কথা মাথায় রেখে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যেতেই পারে। তাহলে চলুন পাঠক, জেনে নিই ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কী কী পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পর্ক পাবে সর্বাধিক গুরুত্ব; Image Source: Quora

সম্পর্কের উপর আরো বেশি গুরুত্বারোপ

একদম প্রথম দিককার সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর একটি ছিল ফ্রেন্ডস্টার। নাম থেকেই এর কার্যপ্রণালীর ব্যাপারে বুঝে যাওয়া যায়, আর তা হলো: নতুন বন্ধুত্ব সৃষ্টি ও তার রক্ষণাবেক্ষণ। ঠিক একইভাবে সূচনা ঘটেছিল ফেসবুক ও মাইস্পেসেরও।

তবে যতই সময় এগিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আর কেবল সম্পর্ক সৃষ্টির কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা প্রত্যেকের আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে এখন এমন অনেক ব্যবহারকারীকেই দেখা যায়, যারা সারাদিন ফেসবুক-টুইটারে পড়ে থাকলেও, সরাসরি কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি তো দূরে থাক, এমনকি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াটা পর্যন্ত হয় না। তবে প্রতিনিয়ত নেটওয়ার্কগুলো যেভাবে নিজেদেরকে রিলেশন-ফ্রেন্ডলি হিসেবে গড়ে তুলছে, তাতে আশা করাই যায় যে অদূর ভবিষ্যতে আবারো মূল ফোকাস ফিরে যাবে সম্পর্কের উপরই।

বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টের বৈচিত্র্য; Image Source: SponServe

পোস্টের বৈচিত্র্য

একটা সময় পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলো কেবল টেক্সট এবং ছবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর জোয়ার আসে ভিডিও পোস্টিংয়ের। এখন তো লাইভ স্ট্রিমিং দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া পোলিংও বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বিভিন্ন মিম, ট্রল।

এছাড়াও আছে টিকটক বা মিউজিক্যালির মাধ্যমে অন্যের অডিওর সাথে নিজের ঠোঁট মেলানো, কিংবা সারাহাহ-প্রোফাউন্ডলির মাধ্যমে গোপনে কাউকে বার্তা পাঠানো ইত্যাদি। এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টিংয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই আরো নতুন অনেক ফিচারের আগমন ঘটবে।

আসবে নানা প্রিমিয়াম সার্ভিস; Image Source: Tech World

প্রিমিয়াম সার্ভিস

এখন অবধি প্রায় সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। তাই প্রিমিয়াম সার্ভিসের বিষয়টি অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, এমন অনেক মানুষই আছে যারা বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্মেলনকে খুব একটা ভালো চোখে দেখতে পারছে না।

তাদের মতে, এর কারণে নেটওয়ার্কগুলোর শুরুর দিককার স্বকীয়তা ও আভিজাত্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্য কিছু প্রিমিয়াম সার্ভিস আসতে পারে, যেখানে কেবল তাদেরই অ্যাক্সেস থাকবে, এবং কেবল তারাই সর্বোচ্চ কোয়ালিটির ছবি, ভিডিও, অডিওসহ অন্যান্য সুবিধা পাবে।

গ্রুপ সুবিধা চালু করেছিল গুগল প্লাস; Image Source: Circles

নানা ধরনের গ্রুপ

এটি যে একেবারেই নতুন কোনো ধারণা, সে কথা কিন্তু বলা যাবে না। কেননা ইতিপূর্বে গুগলও এটির প্রচলনের চেষ্টা করেছে গুগল প্লাসের মাধ্যমে। তারা চেয়েছে বিভিন্ন মানসিকতার মানুষের জন্য আলাদা আলাদা গ্রুপের ব্যবস্থা করতে, যাতে কারো সাথে কারো মতভেদ বা সংঘর্ষের উপক্রম না হয়। কিন্তু সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে গুগল তাদের ধারণাটিকে সফল করতে পারেনি।

তবে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কগুলোতেও যখন এ ধরনের ফিচার আসবে, তখন ধারণাটি নতুন করে সাফল্য লাভ করতে পারে। কারণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই ফিচারটি দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন ধরুন, আপনার এক বন্ধু হয়তো রাজনীতি পছন্দ করে, তাই তাকে আপনি রাজনৈতিক গ্রুপে রাখলেন।

আবার রাজনীতি পছন্দ করে না এমন বন্ধুটিকে রাখলেন অরাজনৈতিক গ্রুপে। এভাবে উভয় বন্ধুর সাথেই কিন্তু তাদের মতো করে আপনি সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলেন। বর্তমানে প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সুবিধাটি নেই বলেই ব্যবহারকারীদের অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

প্রাইভেসির প্রাধান্য হবে সর্বোচ্চ; Image Source: Facebook

প্রাইভেসিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উন্মেষকাল থেকেই প্রাইভেসি একটি বহুল চর্চিত বিষয় হয়ে ছিল। এবং যতই দিন যাচ্ছে, এ সংক্রান্ত আলোচনা বাড়ছে বৈ কমছে না। এবং তা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গতও বটে। কেননা শুরুর দিকে মানুষ কেবল শখের বশে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি চালাত। কিন্তু এখন তারা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে, কিংবা নিজেদের বাস্তব কর্মজীবনের বিস্তৃতি হিসেবে এগুলোকে ব্যবহার করছে। তাই এখানে তাদেরকে এমন অনেক স্পর্শকাতর এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সন্নিবেশ ঘটাতে হচ্ছে, যা প্রকাশ্যে এলে তাদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

অথচ সাম্প্রতিক সময়েই ব্যবহারকারীদের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে, যার ফলে অনেক ব্যবহারকারীই বীতশ্রুদ্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখছে। এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রকরাও খেয়াল করেছে। তাই তারা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আরো জোরদারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের। অদূর ভবিষ্যতে এর বাস্তবায়ন দেখতে পারব আমরা।

চলবে আসক্তি কমানোর প্রচেষ্টা; Image Source: Tech Co

আসক্তিহীন, দীর্ঘমেয়াদি কনটেন্ট

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বড় সমস্যা হলো, এর কনটেন্টগুলো অনেক বেশি পরিমাণ আসক্তিসম্পন্ন। কোনো কোনো হিট কনটেন্ট এত বেশি আসক্ত করে তোলে ব্যবহারকারীদের যে তারা দিনের বেশিরভাগ সময় ওই কনটেন্টটির পেছনেই পড়ে থাকে। যেমন, প্রথম যখন লুডু স্টার এসেছিল, অনেকেই সারাদিন এই গেমসটি নিয়েই পড়ে থাকত। আবার লাইভ ফিচার আসার পর মানুষজন কারণে-অকারণেই লাইভে আসতে থাকত।

এভাবে ব্যবহারকারীরা কোনো একটি কনটেন্ট নিয়ে প্রাথমিকভাবে অনেক বেশি আসক্ত হয়ে গিয়ে নিজেদের অনেক ক্ষতি করে ফেলে। কিন্তু পরে আবার ওই কনটেন্টের প্রতি একঘেয়েমি চলে এলে, তাদের গড় স্ক্রিন টাইম আবারো কমে যায়। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী হিট কনটেন্টের বদলে এমন সব দীর্ঘস্থায়ী কনটেন্ট নিয়ে আসতে, যেগুলো রাতারাতি হিট হবে না, ব্যবহারকারীদেরকে আসক্ত করে তুলবে না, কিন্তু তাদের নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার ঠিকই নিশ্চিত করবে।