ডিজিটাল প্রযুক্তিই এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজাচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যতীত একটি দিনও এখন আমরা কল্পনা করতে পারি না। এবং যে হারে প্রযুক্তিক্ষেত্রে নিত্যনতুন উপাদানের সংযোজন ঘটছে, তাতে করে সে দিন আর বেশি দূরে নেই, যেদিন আমাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রাই পরিচালিত হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে।

যেহেতু জন্মগতভাবেই আমরা সবাই বাজারব্যবস্থার সাথে জড়িত, এবং নিত্যকার চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে আমাদেরকে প্রচলিত বাজারব্যবস্থার শরণাপন্ন হতে হয়, তাই সেই বাজারব্যবস্থার মূল প্রচারক তথা বিজ্ঞাপনকে প্রযুক্তি কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেটিও জানা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।

ইতিমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞাপনী কার্যক্রমের জয়যাত্রা। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির কারণে বিজ্ঞাপন জগতে আরো অনেক নিত্যনতুন সংযোজনেরও সম্ভাবনা রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে আমাদের বাজারব্যবস্থায় নবজাগরণের সৃষ্টি করবে।

চলুন পাঠক, জেনে নিই আধুনিক প্রযুক্তির ফলে কীভাবে পরিবর্তন সাধন হবে বিজ্ঞাপন ও বাজারব্যবস্থায়।

ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স

বর্তমান সময়ে ই-কমার্স দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য ইতিমধ্যেই অসংখ্য ওয়েবসাইট গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও অনেকে নিজেদের অনলাইন শপ খুলে বসেছে। সাধারণ মানুষও এগুলোতে খুবই সাড়া দিচ্ছে। যেহেতু মানুষের অবসর সময় এখন খুবই কমে গেছে, তাই তারা অনলাইনে কেনাকাটা সেরে ফেলাকেই বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করছে।

ই-কমার্স ওয়েবসাইটের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে; Image Source: Moneycontrol

আর অনলাইনে কেনাকাটা একাধারে যেমন সাধারণ ক্রেতাদের জীবনকে সহজ করে দিচ্ছে, তেমনই ব্যবসায় উত্তরোত্তর উন্নতির সুযোগ করে দিচ্ছে বিক্রেতাদেরকেও। তারা এখন তাদের ওয়েবসাইট বা পেজের বিভিন্ন ফিচারের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যকে এমনভাবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারছে যে, সম্ভাব্য ক্রেতারা সহজেই তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে, এবং ওই পণ্য কেনার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলছে। অর্থাৎ ক্রেতাদেরকে প্রলুব্ধ করা এখন আরো সহজ হয়ে উঠেছে, যা ইন্টারনেট পূর্ববর্তী যুগে একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপারই ছিল।

আগ্রহী ক্রেতা চিহ্নিতকরণ

বাস্তব জগতের বাজারব্যবস্থায় দেখা যায়, বিক্রেতারা অনেক সময়ই সম্ভাব্য ক্রেতা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। যেমন, দোকানিরা হয়তো এমন একজনকে কোনো একটি বই কেনার জন্য রাজি করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে, যে মানুষটি কোনোদিন কোনো বই-ই উলটে পালটে দেখেনি। কিন্তু অনলাইনভিত্তিক বাজারব্যবস্থায় এমন বৃথা সময় নষ্টের কোনো আশঙ্কাই থাকবে না। বিক্রেতারা তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়ার আগেই জেনে নেবে ক্রেতার আগ্রহের বিষয় সম্পর্কে, এবং সেই সংস্লিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপনই তারা দেখাতে থাকবে।

ক্রেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখানো হবে; Image Source: B&T

যদি একজন ব্যক্তি সার্চ ইঞ্জিনে জামাকাপড় নিয়ে বেশি খোঁজ করে, কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামাকাপড় সংস্লিষ্ট পেজে বেশি লাইক দেয়, নিজেও পোস্ট করতে থাকে, তাহলে তাকে জামাকাপড় নিয়েই বেশি বিজ্ঞাপন দেখানো হবে, এবং জামাকাপড়ের উপর বিভিন্ন লোভনীয় অফারও তাকে দেয়া হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেসব বিজ্ঞাপন দেখে ওই ব্যক্তি খুব সহজেই আকৃষ্ট হবে।

চ্যাটবট

অনলাইন শপগুলোতে ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য ক্রেতার বিভ্রান্তি দূর করার জন্য দুইটি উপায় আছে। একটি হলো কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার, আর অপরটি ফ্রিকুয়েন্টলি আস্কড কোয়েশ্চন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজাররা অনেক সময়ই ব্যস্ত থাকে। যতক্ষণে তারা ক্রেতার প্রশ্নের সদুত্তর দেয়, ততক্ষণে অনেকেরই আগ্রহ চলে যায়। আবার ফ্রিকুয়েন্টলি আস্কড কোয়েশ্চন ফিচারটিও অনেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই পছন্দ করে না। তারা চায় নিজেরা প্রশ্ন করতে, এবং অন্য কারো কাছ থেকে সরাসরি সেই প্রশ্নের জবাব পেতে।

ক্রেতার সাথে বিক্রেতার দূরত্ব ঘোচাবে চ্যাটবট; Image Source: Chatbot Magazine

এই দুই সমস্যার সমাধান করবে চ্যাটবট। অদূর ভবিষ্যতেই প্রায় সকল অনলাইন শপেই চ্যাটবটের উপস্থিতি থাকবে, যারা সদা প্রস্তুত থাকবে সম্ভাব্য ক্রেতার যেকোনো প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিচালিত এই চ্যাটবটরা এমনভাবে ক্রেতার সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেবে যে, ক্রেতার মনে হবে যেন তারা কোনো রক্তমাংসের মানুষের সাথেই কথা বলছে। আবার চ্যাটবট তাৎক্ষণিকভাবেই সকল সমস্যার সমাধান দেবে বলে, ক্রেতার মধ্যেও একটি ইতিবাচক মানসিকতার সৃষ্টি হবে, এবং তার কোনো একটি পণ্য ক্রয়ের সম্ভাবনা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি

ক্রেতার পণ্য পছন্দে সাহায্য করবে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: Euronews

শারীরিক বাজারব্যবস্থার সাথে ভার্চুয়াল বাজারব্যবস্থার একটি বড় ফারাক হলো, প্রথমটিতে ক্রেতারা চাইলেই যেকোনো পণ্যের ট্রায়াল দিয়ে দেখতে পারে যে সেটি তার সাথে কেমন মানায়। যেমন, দোকানে গিয়ে ক্রেতার যদি একটি পোশাক পছন্দ হয়, তবে সে নিজে সেই পোশাকটি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যাচাই করে দেখতে পারে।

কিন্তু অনলাইনে অর্ডার দেয়ার আগে এতদিন সে এমন কোনো সুবিধা পেত না। তাই অনলাইনে অর্ডার দিয়ে পণ্য কেনা ছিল অনেকটাই আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো। এই ঝুঁকির কারণে অনেকেই অনলাইন শপিংকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু ভবিষ্যতে সকল অনলাইন শপেই অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে ক্রেতা খুব সহজেই জেনে নিতে পারবে যে তার পছন্দের পোশাক বা অন্য কোনো পণ্য নির্দিষ্ট কাঠামো বা অবস্থার সাথে কেমন মানাবে।

এভাবে অনলাইনে অর্ডার দেয়ার আগেই পণ্যটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেয়া সম্ভব বলে, ক্রেতারা নিশ্চিন্তমনে অতীতের চেয়ে বহুগুণে বেশি পণ্য কিনতে শুরু করবে অনলাইন থেকে।

ইন্টারনেট অফ থিংস

নিত্যব্যবহার্য সবকিছুর সাথেই থাকবে ইন্টারনেটের সংযোগ; Image Source: Just Creative

অদূর ভবিষ্যতে প্রায় সকল ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য বা গ্যাজেটেরই থাকবে সরাসরি কিংবা কোনো একটি ডেডিকেটেড অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষমতা। এর মানে হলো, শুধু কম্পিউটার, মোবাইল বা ট্যাবলেটই নয়, ভবিষ্যতে এয়ার কন্ডিশনার থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেটর, কিংবা কুকার বা ওয়াশিং মেশিন, সবকিছুই যুক্ত থাকবে ইন্টারনেটের সাথে।

তাই বাজার নির্ধারকদের পক্ষে খুব সহজেই সম্ভব হবে ভোক্তা কর্তৃক ওই পণ্য ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতাসমূহ সম্পর্কে জানা। এতে করে তারা প্রতিটি ভোক্তার ব্যাপারে নতুন নতুন তথ্য লাভ করতে পারবে, তার অভ্যাস সম্পর্কে জানতে পারবে, এবং সে অনুযায়ী তার কাছে আরো বিভিন্ন ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির হতে পারবে, যেগুলো ওই ভোক্তার আসলেই কেনার সম্ভাবনা রয়েছে।

মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন

ভবিষ্যতে অনেক ব্যক্তিই তাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি কিংবা নিউরন সংক্রান্ত নানাবিধ সমস্যার সমাধানে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করবে, অর্থাৎ মস্তিষ্কে ছোট ছোট মাইক্রোচিপ লাগাবে। ওইসব মাইক্রোচিপ খুব কম খরচেই লাগানো সম্ভব হবে, কেননা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাইক্রোচিপগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করবে।

ক্রেতার মস্তিষ্কে সৃষ্টি করা হবে কৃত্রিম চাহিদা; Image Source: Wall Street Journal

পরবর্তীতে দেখা যাবে, ওই মাইক্রোচিপগুলো তাদের হোস্টের মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরনের চাহিদার সৃষ্টি করছে, এবং নির্দিষ্ট কোনো পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে তাকে আগ্রহী করে তুলছে। এভাবে সরাসরি মানুষের মাথার ভিতরে ঢুকেও বিজ্ঞাপন দিতে থাকবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির কাছে তাদের পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।