মানুষকে বলা হয়ে থাকে সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু মানবজাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা ভিন্নতা সহ্য করতে পারে না। তাই তো যুগে যুগে ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, সংস্কৃতি প্রভৃতির কারণে এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর চড়াও হয়েছে। শক্তিশালীদের হাতে পরাস্ত হয়েছে দুর্বলেরা। তাই কৌতূহলী মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে বাধ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমান হয়ে যাবে, তখন কি মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটদের সাথেও প্রতিযোগিতা শুরু করবে?

এক্ষেত্রে দুইটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, মানুষ হয়তো স্বাধীন রোবটজাতির সাথে মিলেমিশে, পাশাপাশি বাস করবে, যেমন আমরা দেখেছি স্টার ওয়ার্সে। কিংবা আবার এমনও হতে পারে যে, মানবজাতি দাসে পরিণত করছে রোবটজাতিকে, যেমনটি দেখা গেছে ব্লেড রানার ফ্র্যাঞ্চাইজির চলচ্চিত্রগুলোতে।

মানুষ নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কে কার উপর ছড়ি ঘোরাবে? Image Source: Better World International

বাস্তবে যে কোনটি ঘটবে, তা আমরা কেউই জানে না। কিন্তু এ ব্যাপারে পূর্বানুমান এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। কেননা বিশেষজ্ঞরা, যারা কাজ করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন যে, হয়তো চলতি শতকের মাঝামাঝি পর্যায় থেকেই পৃথিবীর বুকে মানবজাতির পাশাপাশি নতুন জাতি হিসেবে উদ্ভব ঘটবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটের। মানুষ কি কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিযোগিতা করে পেরে উঠবে?

বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, মানুষ পারবে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে যেসব গড়পড়তা মানুষ ছিল, তারাই ছিল গুণেমানে এমনকি সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার থেকেও ঢের গিয়ে। তাছাড়া আজকালকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হলো কৃত্রিম ‘সংকুচিত’ বুদ্ধিমত্তা। অর্থাৎ তারা কোনো নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে এত বেশি চৌকস যে, মানুষ তাদের ধারেকাছেও যেতে পারবে না। কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া, বাকি সকল ক্ষেত্রেই তাদের ক্ষমতা একেবারে শূন্য; কিছুই পারবে না তারা। মানুষের ক্ষেত্রে কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। অনেক লম্বা সময় ধরে এই পৃথিবীর বুকে অন্য বিভিন্ন জীবজন্তুর সাথে মানুষের সহাবস্থান এবং তাদের রয়েছে অভিযোজন ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তারা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথেই নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারে।

অনেকের মতেই এ যুদ্ধ অসম্ভব; Image Source: Economie et Politique

মানুষ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জীবজন্তুর মধ্যে এই অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে, যা তাদের কোনো দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না। একজন মানুষ বা একটি জীবকে যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হোক না কেন, এ কথা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয় যে তার ভিতর ঠিক কতটুকু অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে। তার মানে হলো, অভিযোজন ক্ষমতা হলো অদৃশ্য, অতিপ্রাকৃত একটি শক্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট এই ক্ষমতা অর্জন করছে, ততক্ষণ তারা কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রেই তাদের কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে পারবে, বাকি সব জায়গায় নিতান্তই খেলো বস্তু হিসেবে পরিগণিত হবে।

এখন অনেকেই ভাবতে পারেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও হয়তো ধীরে ধীরে অভিযোজন ক্ষমতা লাভ করবে এবং তখন তাদের পক্ষে মানবজাতিকে হারিয়ে দেওয়া কঠিন কিছু হবে না। এ সম্ভাবনা কেউই উড়িয়ে দিতে পারবে না। তবে মনে রাখতে হবে, বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে জৈব মস্তিষ্ক সৃষ্টি করতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লেগেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও সেই পর্যায়ে যেতে লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে, যখন তারা নিজেরাই তাদের হার্ডওয়্যারের উন্নতি ঘটাতে পারবে এবং চক্রাকারে বছর, মাস, এমনকি দিনভেদেও তাদের সফটওয়্যারের পরিবর্তন করতে পারে।

লড়াইটা কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে প্রকৃতির; Image Source: Dribble

তবে সেই সময়ে মানবজাতির বিবর্তনও কিন্তু থেমে থাকবে না। কেননা এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া শুধু অব্যাহতই নেই, জিন প্রকৌশলের কল্যাণে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উন্নতিও ঘটতে শুরু করেছে।

মানুষের মস্তিষ্ক; Image Source: Medical Xpress

অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন, জিন প্রকৌশলীরা এখন পর্যন্ত ৬৯টি পৃথক জিন চিহ্নিত করতে পেয়েছেন, যেগুলো মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে তারা মানুষের বুদ্ধিমত্তায় প্রভাব ফেলে মাত্র ৮ শতাংশ। এর মানে হলো, এখনো আরো শত শত, এমনকি হাজার হাজার জিনেরও অস্তিত্ব থাকতে পারে যা মানুষের বুদ্ধিমত্তায় প্রভাব ফেলে, কিন্তু সেগুলোর সন্ধান আমরা এখনো পাইনি। তাই জিন প্রকৌশলীদের অনুসন্ধান অব্যহত থাকবে এবং তারা শতভাগ সফল হতে পারলে, মানুষের জিনগত বুদ্ধিমত্তা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে, যা এখনো হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

আশা করা যাচ্ছে, ২০৪০ এর মাঝামাঝি পর্যায়ে উপর্যুক্ত অনুসন্ধান একটি পরিণত পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে জিন প্রকৌশলীরা ২০৫০ সালের মধ্যেই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অকল্পনীয় উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

লড়াইয়ে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকবে মানুষই; Image Source: dreamstime.com

এর মানে হলো, ঠিক যে সময়টায় পৃথিবীর বুকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ বিচরণ শুরু হবে, সেই একই সময়ে পৃথিবীর মানুষও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে বহুগুণে এগিয়ে যাবে। সুতরাং মানুষ তখন থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তুলনায় যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। তাই সাধারণ মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে, এটি একদমই উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিংবা আকাশ-কুসুম কোনো কল্পনা নয়।

তবে যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে মানুষের বুদ্ধিমত্তা মার খেয়ে যাবে, এমন একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েই গেছে, তাই এ ব্যাপারে আরো সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা যখন গবেষণাগারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করেন, তখন তাদের এটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে তারা যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো ক্ষমতা দিয়ে না বসেন। অপর দিকে মানুষের বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন যেহেতু জিন প্রকৌশলের উপর নির্ভর করে আছে, তাই এক্ষেত্রেও সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি জিন প্রকৌশলীদেরও উচিৎ হবে নিজ কাজ আরো গুরুত্বের সাথে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পাদন করা।