সম্প্রতি চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি অনন্য উপযোগিতা খুঁজে পেয়েছেন, তা হল কোন মানুষের অকাল মৃত্যুর পূর্বাভাস দিতে পারা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের এক দশক ধরে জমা দেয়া স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা ধরণের উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমকে প্রস্তুত করেছেন। তারপর ওই সিস্টেমকে নির্দেশ দেয়া হয় কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনকালের আগে মৃত্যুর সম্ভবনা আছে কিনা তা যাচাই করে দেখতে। বা সহজ করে বললে একজন মানুষের যে সাধারণ জীবনকাল তার আগেই কোন ধরণের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার সম্ভবনা কতটুকু।

এর ফলাফল ছিল বেশ চমকে দেবার মত। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের মহামারী ও তথ্য বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর স্টিফেন ওয়েন এক বিবৃতিতে বলেন, মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার না করা অন্যান্য সাধারণ মডেল থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা মডেল ছিল উল্লেখযোগ্য রকম নির্ভুল। বিশেষ করে সম্পূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস দেবার ব্যাপারে এই মডেল অপরাপর মডেল থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে ছিল।

AI কি পারবে মৃত্যুর পূর্বাভাস দিতে? Image Source: Daily Herald Business

কোন মানুষের অকাল মৃত্যুর সম্ভবনা যাচাই করতে গবেষকেরা ২ ধরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন।  এর একটি হল “ডিপ লার্নিং”। যেখানে অনেকগুলো স্তরে ভাগ করা তথ্য বিশ্লেষণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি কম্পিউটারকে অসংখ্য উদাহরণ থেকে শিখতে সাহায্য করে। আর অন্যটি হল “র‍্যান্ডম ফরেস্ট”, যেখানে অসংখ্য শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট মডেলকে একীভূত করে সেখান থেকে সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনা করতে পারে।

এরপর তারা এই দুই ধরণের ফলাফলকে তুলনা করেন “কক্স মডেল” নামের একটি আদর্শ এলগরিদমের সাথে, আর এখান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল থেকেই তারা সিদ্ধান্তে পৌছান। আর এজন্য তারা ব্যবহার করেন ইউকে বায়োব্যংক। এটি একটি উন্মুক্ত ডাটাবেস যেখানে ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ লক্ষ লোকের স্বাস্থ্য, শারীরিক এবং জেনেটিক তথ্য সংরক্ষিত আছে। এই ১০ বছর সময়কালের মধ্যে ৫ লক্ষ লোকের মধ্যে প্রায় ১৪৫০০ লোকের মৃত্যু হয় হৃদরোগ, ক্যান্সার ও শ্বাসকষ্ট জনিত নানাবিধ রোগের কারণে।

মেশিন লার্নিং; Image Source: Towards Data Science

পরীক্ষার বিভিন্ন চলক

একজন মানুষের মৃত্যুর সম্ভবনা কত তা অনুমান করতে বেশ কিছু সাধারণ চলক নিয়ে যাচাই করা হয়, যেমন – লিঙ্গ, বয়স, ধূমপানের ইতিহাস বা পূর্বে ক্যান্সারের মত কোন জটিল রোগের ইতিহাস ছিল কিনা। কিন্তু গবেষকেরা লক্ষ করেন যে এই সব সাধারণ চলকের বাইরেও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চলক আছে। এই তিনটি মডেলই আলাদা আলাদা ভাবে কিছু নির্দিষ্ট চলকের উপরে ভিত্তি করে ফলাফল প্রদান করে। কক্স মডেলটি ব্যপকভাবে নির্ভর করে শারীরিক এবং জাতিগত ক্রিয়াকলাপের উপরে।

সেখানে র‍্যান্ডম ফরেস্ট মডেল বিবেচনা করে শরীরের কোন অংশে কত শতাংশ চর্বি আছে, কোমরের পরিধি কত, কি পরিমাণ সবজি বা ফল ওই ব্যক্তি খেয়েছে এমনকি ত্বকের রঙ কেমন। আর ডিপ লার্নিং মডেল এর বিবেচ্য বিষয়গুলো হল- কার্যক্ষেত্রের সাথে সম্পর্কিত বিপদসমূহ, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ, অ্যালকোহল গ্রহনের মাত্রা, নির্দিষ্ট ধরণের ঔষধ গ্রহনের মাত্রা ইত্যাদি।

ডিপ লার্নিং পারিপার্শ্বিক সকল অবস্থা পর্যালোচনা করে; Image Source: Forbes

সকল তথ্য বিশ্লেষণের পড়ে দেখা যায় এই তিন মডেলের মধ্যে ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম সব থেকে ভাল ফলাফল দেয়। এটির সাকসেস রেট ৭৬ শতাংশ। মানে হলো এই সমীক্ষা চলাকালীন সময়ে এটি ৭৬ শতাংশ মানুষ যারা ওই সময়ের মধ্যে মারা গিয়েছিল, তাদের ব্যপারে সঠিক ভাবে পূর্ব অনুমান করতে পেরেছিল। সেখানে র‍্যান্ডম ফরেস্ট মডেলের সাফল্যের হার ছিল ৬৪ শতাংশ আর কক্স মডেলের বেলায় সাফল্যের হার ছিল কেবল ৪৪ শতাংশ।

র‍্যান্ডম ফরেস্ট মডেল; Image Source: Medium

স্বাস্থ্যসেবার বেলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যতবাণী দেবার ক্ষমতার ব্যবহার এবারই প্রথম নয়। অন্য আরেকদল গবেষক ২০১৭ সালে দেখান যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারে। তাদের তৈরি এআই মডেল মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমান করতে পারে যে ওই মানুষের মধ্যে পরবর্তীতে আলঝেইমার রোগের বিকাশ ঘটবে কিনা। এক্ষেত্রে সফল ভাবে ভবিষ্যতবাণী করতে পারার হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

অন্য আরও একটি গবেষণা হয়েছে অটিসমের উপরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ অনুমান ক্ষমতা নিয়ে। সেখানেও দেখা গেছে ৬ মাস বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বেশ সফল ভাবেই অটিসমে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা আছে কিনা সেটা পূর্বানুমান করা গেছে। রেটিনা স্ক্যান বিশ্লেষণ করে আসন্ন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার উপরেও পূর্বাভাস দেয়া গেছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, এই একই রেটিনা স্ক্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার বিষয়েও বেশ সফলভাবেই পূর্বানুমান করা গেছে।

হৃদরোগে আক্রান্ত হবার পূর্বাভাসও দেয়া সম্ভব; Image Source: healthimaging.com

উক্ত গবেষণা প্রবন্ধের সহলেখক, জাতিসংঘের প্রাইমারী কেয়ারের সহ অধ্যাপক জো কাইয়ের মতে, সাবধানতার সাথে বিশ্লেষণ করে মেশিন লার্নিঙয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মৃত্যুর সম্ভবনা নিয়ে সফলতার সাথেই ভবিষ্যতবাণী করতে পারবে। কাইয়ের মতে স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এই বিষয়ে যারা পেশাদার তাদের কাছে অপরিচিত বা অদ্ভুত লাগতে পারে, তবে গবেষণায় এই পদ্ধতিগুলো অনুসরন করলে তা এই উত্তেজনাপূর্ণ ক্ষেত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

তারমানে এই দাঁড়াচ্ছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোন বোতলের জীন না যে হুট করে বলে দেবে যে আপনি অমুকদিন মারা যাবেন। তবে এটা আপনার সকল স্বাস্থ্যগত তথ্য, জীবনযাপনের ধারা, অতীতের রোগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে একটা অনুমান করতে পারবে যেটা বাইরের অন্য কোন প্রভাবকের কারণে বাধাপ্রাপ্ত না হলে মোটামুটি মিলে যাবে।