আমরা এতদিন ভেবে এসেছি, আধুনিক প্রযুক্তি বুঝি কেবল তথ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আদান-প্রদানেই ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু না, আধুনিক প্রযুক্তি এখন এক্ষেত্রে সরাসরি মানব মস্তিষ্ককেও সম্পৃক্ত করতে সক্ষম, এবং ইতিমধ্যেই সে প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ইদানিং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার ব্যাপারে শোরগোল শোনা যাচ্ছে। যেমন মানুষের মাথায় এক ধরনের চিপ স্থাপন করা, যার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে সেগুলোকে আরো কার্যকর ও উন্নত করে তোলা সম্ভব। প্রস্তাবিত এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন।

মস্তিষ্ক ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দূরীকরণে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন; Image Source: Singularity Hub

মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নানাবিধ সুবিধা পাওয়া সম্ভব। একাধারে এটি যেমন মানুষের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করবে। ফলে তারা অপেক্ষাকৃত বেশি তথ্য তাদের মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করতে পারবে, তেমনই এর মাধ্যমে তাদের অনুভূতি শক্তিও অনেক বেশি প্রখর হবে, ফলে যেকোনো মানবিক অনুভূতিকে তারা পূর্বাপেক্ষা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে।

চলুন পাঠক, জেনে নিই মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে আরো কী কী সুফল লাভ করতে পারবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষ।

স্মৃতি পুনরুদ্ধার

অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক কাজ করে চলেছেন এমন এক ধরনের চিপ তৈরি করার, যার মাধ্যমে মানব মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে বৃদ্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন এমআইটির এক দল আমেরিকান নিউরো বিজ্ঞানী।

পুনরুদ্ধার করা যাবে হারানো স্মৃতি; Image Source: Daily News Dig

২০১৩ সালে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গিয়েছিল, তারা এমন একটি ডিভাইস সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন, যা একটি ছোট্ট মাইক্রোচিপের মাধ্যমেই মানুষের হারানো স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে পারবে। পরবর্তীতে তারা কয়েক দফা কিছু স্বেচ্ছাসেবী মানুষের উপর এই ডিভাইসটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেও দেখেছেন।

আশা করা যাচ্ছে, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যেই এই ডিভাইসটির ব্যাপক প্রচলন শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টেড বার্জার বলেন, তিনি নিজে হয়তো নতুন উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির সুফল ভোগ করে যেতে পারবেন না, কিন্তু তার সন্তানেরা অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই পারবে।

দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার

হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল এমন আরেক ধরনের মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া নিয়েও কাজ করছে, যা অন্ধ ব্যক্তিদের দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে। অবশ্য এই প্রকল্পের সাথে জড়িত গবেষকদেরকে প্রথম দফায় একটি সমস্যার সম্মুখীন হন।তাদের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, কেননা এমন মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের ফলে স্কার টিস্যু গড়ে উঠেছিল, যা মানব মস্তিষ্কের কোষের বৈদ্যুতিক সংযোগকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

অন্ধজনে দেবে আলো; Image Source: Scie News

অবশ্য পরে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তী প্রচেষ্টায় যে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তা মানব মস্তিষ্কে কোনো স্কার টিস্যু সৃষ্টি না করেই পুরনো তথ্য সম্প্রচার করতে পেরেছিল। এই প্রতিস্থাপন পদ্ধতিটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যে, সেটি মানুষের ভিজ্যুয়াল (দর্শন) করটেক্সকে উত্তেজিত করে তুলবে এবং চোখে সংকেত প্রেরণের মাধ্যমে সেটিকে সক্রিয় করে তুলবে।

অবধারণগত দক্ষতা

অন্য এক দল গবেষক আবার এখন চিন্তা করছেন কীভাবে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের অবধারণগত দক্ষতার উন্নতি ঘটানো যায়। এক্ষেত্রে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মাথার চামড়ার ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কে সরাসরি সংকেত প্রেরণ করবে।

বাড়াবে অবধারণগত দক্ষতা; Image Source: defense.gov

এর মাধ্যমে মানুষের স্মরণশক্তি যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তাদের শিক্ষাগ্রহণের দক্ষতারও উৎকর্ষ ঘটবে।অবশ্য কীভাবে এক্ষেত্রে কীভাবে সার্জিকাল ও নন-সার্জিকাল প্রক্রিয়া কাজ করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এলন মাস্কের মতো অনেকেরই ধারণা, লেজার আই সার্জারির মতো এটিও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবহার

হ্যাঁ পাঠক, মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনকে এমনকি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব। এই অভিনব ধারণাটি উঠে এসেছে অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানি ক্যাসপারস্কির ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘আর্থ-২০৫০’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের প্রতিবেদনে।তাদের ধারণা, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মানব মস্তিষ্কে অনেক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনী চিপও প্রবেশ করিয়ে দেয়া হবে।

কীভাবে কাজ করবে সেগুলো?

ধরুন, আপনি চান দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি ভাষা শিখে ফেলতে, কিন্তু সেজন্য আপনি কোনো কষ্টও করতে চান না, আবার অর্থও খরচ করতে চান না। সেক্ষেত্রে আপনি বিনামূল্যের একটি কোর্স চিপ নিজের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করবে। এক রাতের মধ্যেই আপনি ঐ নির্দিষ্ট ভাষাটি শিখে ফেলতে পারবেন।

ব্যবহৃত হবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সাধনেও; Image Source: Wall Street Journal

কিন্তু এর পাশাপাশি আপনার মধ্যে কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও দেখা যাবে। ঐ চিপটি প্রস্তুতে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে হয়তো কোনো একটি জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে চিপটিতে এমন প্রোগ্রামিং করা হয়েছে যে, সেটি আপনার মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপনের ফলে আপনি নির্দিষ্ট ভাষা শিখতে পেরেছেন ঠিকই, পাশাপাশি আপনার মনে ঐ ব্র্যান্ডের জুতা কেনার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে এক পর্যায়ে আপনি ওই জুতার শো-রুমে যাবেন এবং গাঁটের পয়সা খরচ করে তাদের জুতা কিনবেন।

তার মানে বুঝতেই পারছেন, বর্তমান বিশ্বে যেমন কোনো কিছুই আদতে বিনামূল্যে পাওয়া যায় না, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথাই প্রযোজ্য!

শেষ কথা

মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন পদ্ধতিটি যে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে একটি বিপ্লবের সূচনা করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেরই আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর দখল নিয়ে নেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। কিন্তু মানব মস্তিষ্কে যদি এ ধরনের প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়। তাহলে মানুষের বুদ্ধিমত্তাও সাধারণের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। সেক্ষেত্রে মানুষ খুব ভালোভাবেই পারবে রোবট কিংবা অন্য যেকোনো চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সুসংহয়ত রাখতে।