কোনো কিছু জমা রাখার জন্য আমরা কী করি? এককালে সিন্দুকে বা গুদামে ভরে রাখতাম এর পর আমরা ডিজিটাল হয়ে গেলাম আর সিন্দুক বা গুদামে রাখা জিনিসগুলোর তথ্য আমরা কম্পিউটারের সাহায্যে ডাটাবেসে রাখা শুরু করলাম। কালে কালে নদীর জল আরও গড়িয়ে সামনে চলে যাচ্ছে আর তথ্য ধরে রাখার জন্য আমরাও নতুন প্রযুক্তির ধারে কাছে চলে এসেছি। যার নাম হচ্ছে ব্লকচেইন প্রযুক্তি। আজ আমরা এই খটমটে নামের বিষয়টাই বোঝার একটু চেষ্টা করব।

ব্লকচেইন কী?

সোজা ভাষায় ব্লকচেইন হল তথ্য ধরে রাখার একটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত ব্যবস্থা। এর উদ্ভাবক হল সাতোশী নাকামোতো নামের কোন একজন বা একদল লোক। এমন ভাবে বলার কারণ হল এই নামের কারো বাস্তব উপস্থিতি এখনো খুজে পাওয়া যায়নি। বিটকয়েনের নাম হয়তো সবাই শুনেছেন, এই বিটকয়েনের জন্যই মুলত প্রথম ব্লকচেইন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়। এই প্রযুক্তি বর্তমানে ইন্টারনেটের খোল নলচেই পাল্টে দিতে বসেছে। এখন আর খালি ডিজিটাল কয়েন না, প্রযুক্তির বিভিন্ন ধরণের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

ব্লকচেইন আসলে কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝার জন্য আগে একটা গল্প বলি। বিরাট বন্যা হয়েছে, কৃষকের মাথায় হাত। মহৎপ্রাণ রহমান সাহেব চাইলেন কিছু একটা করতে। তিনি সবাইকে আহ্বান জানালেন সাধ্যমত টাকা সাহায্য করতে, যেন সেই টাকা গরীব কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা যায়। সেই সাথে তিনি মানুষের সন্দেহবাতিকতার কথাও ভাবলেন। মানুষের আর দোষ কি? চারপাশে এত দুর্নীতি যে তাদের দেয়া টাকা যে সত্যিই বিলি হবে সেটা বিশ্বাস করাও তো দায়। তারা দেখেছে যে ১০০০ টাকা জমা হলে বলা হয় ৫০০ টাকা জমা হয়েছে আবার সেই ৫০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা বিলি করে বলা হয় ৫০০ টাকাই বিলি করা হয়েছে।

দানের টাকা অধিকাংশ সময়ই লোপাট হয়ে যায়; Image Source: Fraud.org

রহমান সাহেব সৎ লোক। তিনি ভাবতে বসলেন কিভাবে এই বিশ্বাসের অভাব দূর করা যায়। ভেবে ভেবে সুন্দর একটা উপায় তিনি বের করলেন। প্রথম যে টাকা দিল তাকে তিনি একটা ছাপা কপি দিলেন যাতে ওই প্রথম ব্যক্তির নাম আর জমা দেয়া টাকার পরিমাণ আর সেই সাথে মোট জমা হওয়া টাকার পরিমাণ লেখা ছিল। যেহেতু সেই প্রথম ব্যক্তি তাই তার দেয়া টাকা আর মোট জমা হওয়া টাকা একি ছিল।

এবার দ্বিতীয় যিনি টাকা দিলেন তাকেও রহমান সাহেব একটা প্রিন্ট কপি দিলেন যাতে আগের জন সহ দ্বিতীয় জনের টাকার পরিমাণ আর মোট হিসেবে দুজনের টাকা যোগ করে দেয়া ছিল। এভাবে যত মানুষই টাকা দিল তাদের সবাইকেই তিনি একটা প্রিন্ট কপি দিলেন যেখানে ওই ব্যক্তি আর তার আগে যতজন টাকা দিয়েছে সবার পরিমাণ লেখা ছিল।

আর একটা হালনাগাদ কপি সবার দেখার ব্যবস্থা ছিল, ফলে একেবারে প্রথমে টাকা দেয়া ব্যক্তিও পরে সেটা দেখেই সবার তথ্য জানতে পারে। এতে করে কেউ আর বলতে পারবেনা যে তার দেয়া টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। রহমান সাহেব টাকা বিলি করার সময়েও এই একি পন্থা মেনে চললেন ফলে ওই টাকা থেকে কে কে কত টাকা পেল তারও একটা স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া গেল।

পাবলিক কি, প্রাইভেট কি দিয়ে এনক্রিপ্সশন ডিক্রিপ্সশন; Image Source: SSL2BUY.com

রহমান সাহেবের এই সিস্টেমটাই সোজা ভাষায় ব্লকচেইন এর কাজের ধরন। ব্লকচেইন মানে হল অনেক গুলো ব্লকের একটা চেইন যেখানে প্রতিটা ব্লক কোন একটা তথ্য ধারণ করে। আর সকল ব্লকই সিস্টেমের অন্তর্গত সকল সদস্যের কাছে উন্মুক্ত থাকে। এই চেইনে নতুন কোন ব্লক যোগ হলে বা পুরনো ব্লক আপডেট হলে ওই নেটওয়ার্কের সবার কাছেই ওই আপডেট চলে যায়। এ পর্যন্ত এসে মনে একটা খটকা লাগা স্বাভাবিক।

সেটা হলো সবাই যদি সব কিছু আপডেট পেয়েই যায় তাহলে নিজের তথ্যের গোপনীয়তা বলে কিছু থাকলনা। এ তো ভরা বাজারে টাকার থলে রেখে দেবার মত ব্যপার! না ভয় পাবার কিছু নেই, ব্লকচেইনে সব তথ্যই এনক্রিপ্টেড অবস্থায় থাকে। যে তথ্য পাঠাচ্ছে সে একটা পাবলিক ‘কি’ আর সেই পাবলিক ‘কি’ এর মধ্যে একটা প্রাইভেট কি দিয়ে তথ্য এনক্রিপ্ট করে রাখে আর এই ‘কি’ জানবে শুধুমাত্র যার কাছে তথ্য পাঠান হচ্ছে সে। ফলে অন্য সবাই বাজারের মধ্যে খালি ব্যাগ দেখবে, ওই ব্যাগে টাকা আছে না ইট আছে সেটা দেখতে পাবেনা।  

কিভাবে কাজ করে ব্লকচেইন?

ব্লকচেইনের মাধ্যমে বিটকয়েন যেভাবে কাজ করে; Image Source: cashforgoldandcoins2.com

এখন প্রশ্ন করতে পারেন যে, বোঝা গেল যে ব্যাগে কি আছে সেটা জানা যাবে না। কিন্তু কেউ যদি অত জানার ঝামেলায় না গিয়ে ব্যাগ নিয়ে দৌড় মারে! তখন কি হবে? না, ব্যাগ নিয়ে দৌড়ও দেয়া যাবেনা। কারণ ব্লকচেইনে একবার একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটা আর কেউ মুছে ফেলতে পারবেনা।

ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ; Image Source: blockchainhub.net

প্রতিটি ব্লকচেইনের কিছু নির্দিষ্ট অংশ থাকে। যেমন ব্লকের প্রথমেই থাকে এর আগের লিঙ্ক করা ব্লকের হ্যাশ। সোজা কথায় বলতে গেলে হ্যাশ হল একটা অ্যাড্রেস যেটা দিয়ে ব্লকটা ভ্যালিড কিনা সেটা দেখা হয় আর আবার এটা দিয়ে আগের বা পরের ব্লকের সাথে লিঙ্ক ও করা হয়। তো এই হ্যাশ এর পরে থাকে টাইমস্ট্যাম্প। এর মাধ্যমে ব্লকের হিস্ট্রি মনে রাখা হয়, মানে কখন এই ব্লক চেইনে যুক্ত হল। এর পরে থাকে মুল ডাটা। সেটা যে কোন ধরণের ডাটা হতে পারে, যেমন কোন অর্থ বিনিময়ের তথ্য। এর পরে আবার থাকে হ্যাশ, যেটা দিয়ে এই ব্লক ভ্যালিড কিনা সেটা চেক করে দেখা হয়। এর পরে থাকে একটা সংখ্যা। এই সংখ্যা নির্দেশ করে এই ব্লকের নির্দিষ্ট ডাটা রাখতে পুরো সিস্টেমকে কতবার পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছে। একে বলা হয় Nonce.

ব্লচকচেইন ই-ভবিষ্যৎ; Image Source: techbullion.com

এভাবে একের পর এক ব্লক যুক্ত হতে থাকে আর সিস্টেমের ভিতরে থাকা সবার কাছে ডিস্ট্রিবিউট হতে থাকে। এর সব থেকে বড় সুবিধা হল এটা কোন একক পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কুক্ষিভুত থাকেনা। এটা বিকেন্দ্রিও একটা ব্যবস্থা তাই চাইলেই কেউ এর উপরে কর্তৃত্ব ফলাতে পারেনা। ক্রিপ্টোগ্রাফিক ডাটা ব্যবহারের ফলে ব্লকচেইন নিরাপদও। বলা হয় যে বিংশ শতাব্দীর ইন্টারনেট যেমন তেমনি একবিংশ শতাব্দী নিয়ন্ত্রন করবে ব্লকচেইন। আস্তে আস্তে ডিজিটাল লেনদেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমনকি যোগাযোগ বা শিক্ষা ব্যবস্থাও পরিচালিত হবে ব্লকচেইন নির্মিত আধুকিন স্মার্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে।