সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে মানুষের উচ্চাশার সীমাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সেই উচ্চাশার পিছনে কারণ হিসেবে যেমন আছে প্রয়োজনের তাগিদ ঠিক তেমনি আছে অন্যদের তাক লাগিয়ে দেবার অদম্য বাসনা। এমন সব মেগা প্রোজেক্টের মধ্যে যেমন আছে সুউচ্চ ভবন, বিশালাকৃতির বিমান বন্দর, তেমনি আছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন বা ডিজনি ওয়ার্ল্ডকে মিকি মাউসের মত ছোট্ট দেখাবে এমন বিশাল আয়তনের বিনোদন কেন্দ্র। চলুন আজ আমরা এমনই কয়েকটি মেগা প্রোজেক্টের বিষয়ে জানি যেগুলোর নির্মাণযজ্ঞ খুব তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়ে যাবে।

আল মাখতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দুবাই

অন্যান্য বিমানবন্দর দেখে যদি আপনি আল মাখতুম বিমানবন্দরকে কল্পনা করে নিতে চান তাহলে আপনি ভুল করবেন। পুরো বিমানবন্দরটির আয়তন প্রায় ২১ বর্গকিলোমিটার এবং এটিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যেন একসাথে ২০০টি বিমানকে একসাথে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালে শেষ হবার কথা থাকলেও শেষ ধাপের সম্প্রসারণের কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এই বিশাল বিমানবন্দরের শুধু দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দুবাইয়ের আল মাখতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; Image Source: Middle East Construction News

জুবাইল ২, সৌদি আরব

জুবাইল ২ সৌদি আরবের ২২ বছর ব্যাপী চলমান এক বিশাল শিল্প শহর প্রকল্প যার, দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে এবং এর বাজেট ধরা হয়েছিল ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটির কাজ সমাপ্ত হলে এখানে ১০০ টি নতুন শিল্প কারখানা ও প্রতিদিন ৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন তেল শোধনাগার স্থাপিত হবে।

জুবাইল ২, সৌদি আরব; Image Source: Construction Week

শুধু তাই না, মরুভুমির লবনাক্ততা দূর করতে ৮ লাখ ঘনমিটার জায়গায় বনায়ন করা হবে। পুরো প্রকল্পে জালের মত ছড়িয়ে থাকবে সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইন। এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হবে ২০২৪ সালে।

দুবাইল্যান্ড, দুবাই

ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ডের বিশালতায় যদি আপনি ভিরমি খেয়ে থাকেন তাহলে শুনে রাখুন দুবাইয়ের নির্মীয়মাণ দুবাইল্যান্ডে ডিজনি ওয়ার্ল্ডকে ৩ বার ভরে ফেলা যাবে। ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট ও ২৭৮ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল পার্কে থাকবে ৬ টি অংশ, থিম পার্ক, স্পোর্টস ভেন্যু, হেলথ ফ্যাসিলিটিস, ইকো ট্যুরিসম, সাইন্স এট্রাকশন এবং হোটেল। বিশ্বের বৃহত্তম এই হোটেলে থাকবে ৬৫০০ রুম। ১০ মিলিয়ন বর্গফুটের এক মলও থাকবে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালে।

দুবাইল্যান্ড; Image Source: Which School Advisor

সাউথ – নর্থ  ওয়াটার ট্র্যান্সফার প্রোজেক্ট, চীন

উত্তর চীনের জনসংখ্যা চীনের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হলেও পানি সম্পদ আছে মাত্র ২০ শতাংশ। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে চীন এক মহাপরিকল্পনা গ্রহন করেছে। ৪৮ বছর ব্যাপী এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন প্রায় ৬০০ কিমি লম্বা ৩টি খালের মাধ্যমে ৩টি প্রধান নদী থেকে পানি দক্ষিণ থেকে উত্তর চীনে নিয়ে যাবে। নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে এই খাল ৩টি প্রতি বছরে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ঘন মিটার পানি উত্তরে বয়ে নিয়ে যাবে।

সাউথ – নর্থ  ওয়াটার ট্র্যান্সফার প্রোজেক্ট; Image Source: MDPI

লন্ডন ক্রসরেইল প্রোজেক্ট

লন্ডনে বিশ্বের প্রথম ভূগর্ভস্থ ট্রেন সিস্টেমের কাজ এগিয়ে চলেছে। কয়েকটি ধাপে ভাগ করা এই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শেষ হবে এই ২০১৯ সালে আর এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২৬ মাইল লম্বা প্রথম টানেলে ষ্টেশন থাকবে ৪০ টি আর এর নাম দেয়া হয়েছে – দ্য এলিজাবেথ লাইন।

লন্ডন ক্রসরেইল; Image Source: John Sisk and Son

হাই স্পিড রেলওয়ে, ক্যালিফোর্নিয়া

এই উচ্চ গতির রেলওয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ১০টি বড় শহরের মধ্যে ৮টিতে সংযোগ স্থাপন করবে। দুটি পর্যায়ে ভাগ করা এই প্রকল্পের প্রথম ভাগে লস এঞ্জেলসকে সান ফ্রান্সিসকোতে সংযুক্ত করবে এবং অন্য ভাগে সাক্রামেন্টোকে সান ডিয়েগোর সাথে সংযুক্ত করবে। সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলা এই ট্রেনের গতি উঠবে ২০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। এর নির্মাণকাজ ২০২৯ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়া হাই স্পিড রেলওয়ে; Image Source: California Globe

চু সিঙ্কানসেন, জাপান

এটি একটি উচ্চ গতির রেললাইন যা প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় যাত্রীদের মাত্র ৪০ মিনিটে টোকিও থেকে ২৮৬ কিলোমিটার দূরে নাগোয়াতে পৌছিয়ে দেবে। এই রেললাইনের ৮৬ শতাংশ হবে ভূগর্ভস্থ। এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২৭ সালে এবং পরবর্তীতে এই লাইন ওসাকা পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই ম্যাগলেভ ট্রেনই হবে পৃথিবীর দ্রুততম ট্রেন।

চু সিঙ্কানসেন রেললাইনের ম্যাপ; Image Source: Japan Rail Pass

বেইজিং বিমানবন্দর, চীন

শুরুতে যে আল মাখতুম বিমানবন্দরের কথা বলা হল, বেইজিং বিমানবন্দর খরচ, আয়তন, বিমান ও যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা সব দিক থেকেই তাকে ছাড়িয়ে যাবে। বেইজিং অলিম্পিক উপলক্ষে ২০০৪ সালে এই বিমানবন্দরের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হলেও পুরো প্রকল্প শেষ হবে ২০২৫ সালে। নকশার দিক থেকে অভিনব এই বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ এর নকশা করেছেন জাহা হাদিদ।

বেইজিং বিমানবন্দর; Image Source: China Daily

গ্রেট ম্যান-মেড রিভার প্রোজেক্ট, লিবিয়া

সেই ১৯৮৫ সাল থেকে লিবিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম সেচ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এর নাম গ্রেট ম্যান-মেড রিভার প্রজেক্ট। এর কাজ শেষ হবার কথা ২০৩০ সালে।  এটি শেষ হলে ৩ লাখ ৫০ হাজার একর জমি সেচের আওতায় আসবে এবং এটি লিবিয়ার অধিকাংশ শহুরে এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহ করবে। এই প্রকল্পের পানির উৎস হল বিশাল নুবিয়ান এলাকার ভূগর্ভস্থ বেলেপাথরের মাধ্যমে পরিশোধিত পানি।

গ্রেট ম্যান মেড রিভার প্রোজেক্ট; Image Source: Systech International

আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন

সবার শেষে যার কথা বলব সেটি এই ভুগোলকের কোন বিশাল প্রকল্প না, এর অবস্থান মহাশূন্যে। আইএসএস বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস ষ্টেশন প্রতি ৯২ মিনিটে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। এটি কোন একক দেশের তৈরি না, বরং ১৫ টি দেশ ও ৫ টি মহাকাশ সংস্থা মিলে প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে এটি নির্মাণ করেছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন; Image Source: Asgardia

কিন্তু এটি এর পরিকল্পিত আকারের খুব ছোট্ট পর্যায়ে আছে। এটির সম্পূর্ণ নির্মাণ করতে খরচ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে আর তখন এটি পৃথিবীর বাইরে প্রায় ১ মিলিয়ন অধিবাসীর আবাসস্থল হতে পারে।