আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে বাস্তবতা আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল কথার কথাতেই সীমাবদ্ধ নেই। আক্ষরিক অর্থেই এখন মানুষ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়েই বাস্তবতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারছে। আর সেক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রধানতম ভূমিকা পালন করছে, তা হলো অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর)। একে কাজে লাগিয়ে আজকের দিনে প্রায় সকল শিল্পেরই গুণগত মান বৃদ্ধি করা যাচ্ছে, যেকোনো সমস্যার দ্রুততম সমাধান বের করা যাচ্ছে, ব্যবহারের অভিজ্ঞতাতেও যোগ করা যাচ্ছে নতুন মাত্রা। সব মিলিয়ে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ক্রমশই প্রযুক্তি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি কী?

মূলত, অগমেন্টেড রিয়েলিটি হলো বিশেষ একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বাস্তব জগতের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যসমূহ গ্রহণ করে, সেগুলোতে কম্পিউটার-উদ্ভূত ইনপুট প্রণয়ন করা হয়। এরপর বাস্তব জগৎ এবং বর্ধিত (অগমেন্টেড) পরিবেশ পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নব্যরূপ লাভ করে, যাকে ডিজিটালি নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সাধনের কাজে লাগানো হয়। অগমেন্টেড রিয়েলিটি যতই পরিণত হয়। এর প্রায়োগিক দিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এটি আমাদের কর্মক্ষেত্র, বিনোদন, বাজার-সদাইসহ দৈনন্দিন সকল ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে থাকে।

কেনাকাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: ARPost

কেনাকাটা

আমরা যখন কেনাকাটা করি, তা জামাকাপড়, জুতা, চশমা বা অন্য যা-ই হোক না কেন, স্বাভাবিকভাবেই আমরা চাই আগে খানিকটা যাচাই করে নিতে যে সেগুলো আমাদের সাথে কতটা মানায়। কিন্তু ধরুন, আমরা যখন আসবাবপত্র কিনবো, তখন কীভাবে যাচাই করা যাবে যে সেই আসবাবপত্রগুলো আমাদের বাসার সাথে মানানসই কি না? সরাসরি তো আসবাবপত্র তুলে নিজেদের বাসায় নিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে খুব সহজেই সম্ভব জেনে নেয়া যায় যে, ঐ আসবাবপত্রগুলো আমাদের বাসায় কেমন দেখাবে।

তাছাড়া এতক্ষণ তো কেবল স্বশরীরে দোকানে গিয়ে জিনিসপত্র কেনার কথা হচ্ছিল। কিন্তু আজকের দিনে কজনই বা মার্কেট ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে চায়! অনলাইনে অর্ডার করতেই অনেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু সাধারণভাবে অনলাইনে অর্ডারের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না একটি জামা পরলে আমাদের কেমন দেখাবে, কিংবা একটি চশমা আমাদের মুখাবয়বে কতটা পরিবর্তন নিয়ে আসবে। তবে অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে এখন সেগুলোও জেনে নেয়া যায়।

আজকাল ক্রেতারা অনেক বেশি সচেতন। তাই ৬০% ক্রেতাই আসবাবপত্র কেনার আগে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহার করে নিতে চান। আবার অগমেন্টেড রিয়েলিটি পণ্যের বিক্রয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে। The Impact of Augmented Reality on Retail শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ৭২% ক্রেতাই এমন সব পণ্য কিনেছে, প্রাথমিকভাবে যেগুলো কেনার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না, কিন্তু অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহারের ফলে তারা ওইসব পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

নির্মাণকাজে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: YouTube

নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ

অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী, ডেভেলপার এবং ক্লায়েন্টরা কোনো নির্মাণকাজ শুরুর আগেই জানতে পারেন যে, প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী কাজ করলে, নির্মাণ কাঠামোটি শেষ পর্যন্ত কেমন দেখাবে। তাছাড়া শুধু কেমন দেখা যাবে সেটিই নয়, নির্মাণকাজের মাঝপথে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে, সেটিও অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে আগেভাগে জেনে নেওয়া যায়। ফলে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই প্রকৌশলীরা সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিতে পারেন।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি কোনো নির্মাণাধীন ভবন বা পণ্যের রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্ভিস ম্যানুয়ালসমূহ পারস্পরিক ক্রিয়াশীল থ্রি-ডি অ্যানিমেশন এবং অন্যান্য নির্দেশাবলী শারীরিক পরিবেশের মাধ্যমে দেখানো যায়। অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে ক্রেতারা ঘরে বসেই তাদের ভবন বা পণ্যের সংস্কারের হালনাগাদ তথ্য লাভ করতে পারেন। অনভিজ্ঞ কর্মীদেরকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং তাদের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি মূল্যবান অবদান রাখতে পারে।

পর্যটন শিল্পে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: Yeppar

পর্যটনশিল্প

পর্যটন প্রতিষ্ঠানসমূহ এখন চাইলেই অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য মক্কেলদের কাছে ভ্রমণবিষয়ক ধারণা এবং কী কী অভিজ্ঞতা তারা লাভ করবে তা তুলে ধরতে পারে। কোনো একটি ভ্রমণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কবে কোথায় যাওয়া হবে, কোন রুট অনুসরণ করা হবে, কোন হোটেল বা রিসোর্টে থাকা হবে, এই সকল বিষয়কে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে।

শিক্ষাক্ষেত্রে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: BBN Times

শিক্ষাব্যবস্থা

শিক্ষাব্যবস্থায় অগমেন্টেড রিয়েলিটি ঠিক কতটা কার্যকর হতে পারে, তা এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এটুকু নিঃসন্দেহেই বলা যায় যে, এক্ষেত্রে সম্ভাবনা অসীম। ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি বা EdTech প্রতি বছর ১৭% করে বৃদ্ধি পাবে এবং ২০২০ সালে তার মূল্যমান ২৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পৌঁছাবে। পাশাপাশি এ-ও আশা করা হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে সব বয়সের ও সব ধাপের শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে।

অগমেন্টেড রিয়েলিটির সাহায্যে শিক্ষাবিদরা শ্রেণীকক্ষে থ্রি-ডি মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে সংস্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীদেরকে আরো সম্পৃক্ত করতে পারবেন, বিনোদনমূলক শিক্ষা প্রদান করতে পারবেন এবং ঐ বিষয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি তথ্য পরিবেশন করতে পারবেন। এভাবে শিক্ষাদানের ফলে, শিক্ষার্থীদের কল্পনাশক্তি আরো সমৃদ্ধ হবে এবং কল্পনার বিষয়বস্তুকে তারা থ্রি-ডি বা ডিজিটাল রেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বাস্তবে প্রতিফলিত হতে দেখবে।

স্বাস্থ্যসেবায় অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: Yeppar

স্বাস্থ্যসেবা

অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে সার্জনদের জন্য থ্রি-ডি ফরম্যাটে ডিজিটাল ছবি তৈরি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত সম্ভব। ফলে কোনো সফল অস্ত্রোপচারের জন্য সার্জনদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদির জন্য আর নিজেদের ক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে হবে না। ডিজিটাল অস্ত্রোপচার, থ্রি-ডি মেডিকেল ইমেজিং প্রভৃতিকে সহায়তার লক্ষ্যে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন কার্যকর অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রযুক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নেভিগেশন সিস্টেমে অগমেন্টেড রিয়েলিটি; Image Source: YouTube

নেভিগেশন সিস্টেম

নেভিগেশন অ্যাপ্লিকেশনসমূহকে আরো নিরাপদ করে তোলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি। স্মার্টফোনের জিপিএসের সাথে এ প্রযুক্তির সমন্বয়ে গাড়ি চালকদেরকে সহায়তার উপযোগী ভার্চুয়াল পথের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে গাড়ির আশেপাশের বাস্তব পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুকেও দেখানো হচ্ছে, যাতে করে জিপিএস দেখে গাড়ি চালাতে গিয়ে চালকেরা কোনো দুর্ঘটনার শিকার না হয়।