বিমানের অধিকাংশ সেবা গ্রহীতাই জানে না সে যে বিমানে চড়ছে সেটি কত টুকু স্বনিয়ন্ত্রিত ভাবে উড়ছে আর কত টুকু পাইলটের সাহায্যে উড়ছে। আবার অন্যদিকে গবেষকরা উঠে পড়ে লেগেছেন বিমানের সব কিছু যেন সে নিজে নিজেই করতে পারে কোন পাইলটের সাহায্য না নিয়ে।

বদলে যেতে পারে বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; Image Source: Fast Company

তবে নিকট অতীতে লায়ন এয়ার এবং ইথিওপিয়ান এয়ারওয়েজের বিমান দুর্ঘটনার ফলে সাধারণ মানুষ ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে ককপিটে বসা হাসিখুশি পাইলটের হাতে নাকি সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বচালিত বিমানের হাতে তাদের জীবন অধিক নিরাপদ। 

তবে কিছু কিছু বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা এখনো মনে করে তাদের বিমান ও বিমানে ভ্রমন করা যাত্রীরা রক্ত মাংসের পাইলটের হাতেই অধিক নিরাপদ থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বিচক্রাফট ১৯০০ এর কথা। ছোট ছোট কমিউটার বিমান পরিচালনা করা এই বিমান সংস্থা বহুদিন আগে থেকে বিমান সেবা প্রদান করে আসছে এবং তাদের কোন বিমানেই অটো পাইলট ব্যবস্থা নেই। 

বিচক্রাফট ১৯০০ বিমান সংস্থা তাদের বিমানে অটো পাইলট ব্যবস্থা রাখে না; Image Source: Pilot’s Post

আবার অন্যদিকে দেখা যায় অধিকাংশ আধুনিক ও জনপ্রিয় বিমান পরিবহন সংস্থা অটো পাইলট ব্যবস্থার উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল। ইঞ্জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন, উড্ডয়নরত অবস্থায় বিমানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিমান অবতরণের ক্ষেত্রেও অটো পাইলটের সাহায্য নেয়া হয়। এই ব্যবস্থা এখনো ঝুঁকি মুক্ত না।

যেমন ২০১৮ সালে লায়ন এয়ার ফ্লাইট ৬১০ এর দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয় এর স্বনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাকে। একই কারণে ২০১৯ এর মার্চে ভূপাতিত হয় ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন ফ্লাইট ৩০২। এসব ঘটনা মানুষকে আতঙ্কিত করলেও তারা এখনও জানেনা তারা যে বিমানে ভ্রমণ করছে তার কতটুকু স্বনিয়ন্ত্রিত বা সামনের বছর গুলোতে আরো কত শতাংশ স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়বে।

গবেষকরা জানার চেষ্টা করছেন যে মানুষ তাদের যাতায়াতের সব গুলো মাধ্যম, এমনকি বিমানের ব্যাপারে স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার উপরে নির্ভর করতে কতটুকু আগ্রহী। শহরের মাঝে চলাচলের জন্যও এখন আকাশপথের কথা ভাবা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও দুই বা চার সিটের স্বনিয়ন্ত্রিত উড়ন্ত ট্যাক্সির পরিকল্পনা করা হচ্ছে যেখানে কোন রক্ত মাংসের পাইলট থাকবেনা। মানুষ যদি বিমানের স্বনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থার উপরে ভরসা না করতে পারে তাহলে বিপুল সম্ভবনার ‘শহুরে উড়ন্ত ট্যাক্সি’ মুখ থুবড়ে পড়বে।

সম্পূর্ন স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বিমানে স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার একটি সমস্যা হলো পাইলটকে সর্বক্ষণ নজর রাখার প্রয়োজন পড়ে না, ফলে ঠিক এই মুহূর্তে কি হচ্ছে সেটা হটাৎ করে পাইলট বুঝতে পারে না। ঠিক এই ঘটনাই দায়ী ২০০৯ সালে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ এর রিও ডি জেনেরিও থেকে প্যারিসে যাবার সময় আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হবার জন্য।

এয়ারস্পিড সেন্সর কাজ না করার কারণে অটো পাইলট সিস্টেম নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেটা বুঝতে পাইলটের দেরি হয়ে যায় এবং কি কারণে এমন হয়েছে বা কি করে এই সমস্যার সমাধান করা যায় সেটাও পাইলট সময় মতো বুঝতে পারেনি। ঠিক একই ভাবে ২০০৯ সালে নিউইয়র্কের বাফেলোতে, কোলগান এয়ার ফ্লাইট ৩৪০৭ অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হবার কারণ হিসেবে দেখানো হয় পাইলটের অসচেতনাকে।

বিমানের অটো পাইলট ঠিক মতো কাজ না করার কারণে বিমান স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বেশ খানিকটা নিচে নেমে আসে এবং এখানেও পাইলট ব্যাপারটা সময় মতো খেয়াল করতে পারেনি। যখন পাইলট খেয়াল করে সাহায্য চেয়েছে ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

অটো পাইলট ব্যবস্থার যান্ত্রিক ভুলে দুর্ঘটনায় পরে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ Image Source: Spiegel Online

যে সমস্ত পাইলট ককপিটে অনেক লম্বা সময় অটো পাইলটের মাধ্যমে বিমান পরিচালনা করেন, তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের অনেক কমে আসে। বোয়িং বা এয়ারবাসের মতো বিমান সংস্থার অধিকাংশ পাইলট সম্পূর্ণ উড়ানের মাত্র ৩ থেকে ৬ শতাংশ সময়ে নিজের হাতে বিমান নিয়ন্ত্রণ করেন। সাধারণত উড্ডয়ন আর অবতরণের কাজ তারা নিজে করেন আর বাকি সময় নেভিগেশন সিস্টেমের সাহায্য নিয়ে অটো পাইলটের মাধ্যমে বিমান পরিচালিত হয়। বিমান শিল্পের নিয়ন্ত্রকেরা চায় স্বয়ংক্রিয়তা

বিমান সংস্থা ও উৎপাদকদের মতে দক্ষ পাইলটের সংখ্যা অনেক কম তাই অদক্ষ পাইলটের হাতে বিমান ছেড়ে দেবার চাইতে স্বচালিত বিমান অধিক সাশ্রয়ী হবে। তাছাড়া বিমানের সামনে যদি পাইলটের বসার জন্য আলাদা জায়গা ছাড়তে না হয় তাহলে বিমানের নকশা আরো কার্যকরী করা যাবে ফলে বিমান হবে আরও সাশ্রয়ী ও গতিশীল।

ব্যবহারকারীদের মতামত কী?

নির্মাতারা যাই বলুক না কেন, স্বনিয়ন্ত্রিত বিমান আসলেই বাস্তব হবে কিনা সেটা পুরোপুরি নির্ভর করছে ভোক্তা শ্রেণীর উপরে। তবে সমস্যা হলো যারা নিয়মিত বিমানে যাতায়াত করেন তারাও জানেন না যে ওই বিমান কতটুকু পাইলট দ্বারা পরিচালিত আর কতটুকু স্বনিয়ন্ত্রিত। বরং তারা মনে করে পাইলটের হাতেই তাদের বিমান পরিচালিত হচ্ছে। 

যাত্রীরা এখনও ভরসা করে মানবিক পাইলটের উপরে; Image Source: The Spruce

২০১৪ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় মানুষ স্বনিয়ন্ত্রিত বিমান বা দূর থেকে কোন মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিমানে চড়ার চাইতে তাদের সাথে একই বিমানে যাত্রা করা রক্ত মাংসের পাইলটের উপরেই বেশি ভরসা করে। তবে সবাই এমন না, ২০১৮ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় আমেরিকার ৩০% মানুষ চায় বিমান ভ্রমণ হোক সম্পূর্ণ স্বনিয়ন্ত্রিত।

আবার এর মাঝে কিছু লোক দ্বিধায় থাকলেও ৬০% লোক সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে আস্থার অভাবের কারণে। তারা ভয় পায় যেখানে ককপিটে কোন পাইলট নেই সেখানে মাঝ আকাশে যদি দুটি বিমান মুখোমুখি চলে আসে তাহলে সংঘর্ষ থেকে কে বাঁচাবে? বা বিমান নিজে নিজে ঠিক মতো রানওয়েতে অবতরণ করতে পারবে কিনা?

তবে ভবিষ্যৎ পাল্টাবে; Image Source: The Walrus

তবে মানুষের আস্থা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এমনিতেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে প্রযুক্তি আর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি জেঁকে বসছে সেখানে যানবাহন বা বিমানও স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। বিমান সংস্থা বা গবেষকেরাও বসে নেই। তারাও রান দিন এক করে ফেলছেন স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তাই সকল আশংকা দূরে ঠেলে হয়তো একদিন আকাশে পাখা মেলবে পাইলট বিহীন কোন বিমান।