সত্যজিৎ রায় তার সৃষ্ট অমর চরিত্র প্রোফেসর শঙ্কুর মুখ দিয়ে মিশর সম্পর্কে বলিয়েছিলেন, “আমার তো মনে হয় যে কোনও দেশের যে কোনও বৈজ্ঞানিকেরই ঈজিপ্টটা ঘুরে যাওয়া উচিৎ। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগেও এরা বিজ্ঞানে যে আশ্চর্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিল, তা ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে। এ নিয়ে অনেক কিছু গবেষণা করার আছে। এদের কেমিস্ট্রি, এদের গণিতবিজ্ঞান, এদের চিকিৎসাশাস্ত্র, সব কিছুই সেই প্রাচীন যুগে এক অবিশ্বাস্য পরিণতি লাভ করেছিল।”

সত্যিই তাই। পিরামিড তৈরি থেকে শুরু করে মমি সৃষ্টি, কিংবা আধুনিক ক্যালেন্ডার উদ্ভাবন, মনের ভাব লিপিবদ্ধ করার প্রণালী কিংবা আধুনিক অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রের অনুরূপ নানা উপকরণ আবিষ্কার — বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই মিশরীয়দের রয়েছে অবিস্মরণীয় অবদান।

আজ আমরা আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা নিয়ে যতই উচ্ছ্বসিত হই না কেন, সেই প্রাচীন যুগে মিশরীয়রা কী করে গিয়েছিল সে ব্যাপারে না জানলে আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার কখনোই পূর্ণ হবে না।

আধুনিক প্রযুক্তি ঋণী প্রাচীন মিশরের কাছে; Image Source: SF Wallpaper

চলুন পাঠক, আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই প্রাচীন মিশরের তেমনই কিছু প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন সম্পর্কে, যা হয়তো এতদিন আপনাদের অজ্ঞাত ছিল।

ধাতু তৈরি

মিশরীয় ব্রোঞ্জের মূর্তি; Image Source: Wikimedia Commons

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের দিকে মিশরীয়রা আবিষ্কার করে যে, সামান্য পরিমাণ টিন আকরিকের সাথে কপার আকরিকের মিশ্রণের মাধ্যমেই ব্রোঞ্জ তৈরি করা সম্ভব। তখনকার দিনে ব্রোঞ্জ ছিল অন্য যেকোনো ধাতুর চেয়ে শক্ত, মজবুত ও অধিক টেকসই।

আর সেকারণেই, সেই প্রত্নতাত্ত্বিক যুগটি আজ পরিচিতি লাভ করেছে ব্রোঞ্জ যুগ নামে। তখনকাড় দিনের বিভিন্ন দৈনন্দিন উপকরণ, অস্ত্র, যুদ্ধসাজ প্রভৃতি ছিল ব্রোঞ্জেরই তৈরি।

লেখা

মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্স; Image Source: Wikimedia Commons

প্রাচীন মিশরীয়রাই হলো অন্যতম প্রথম গোষ্ঠী যারা লেখা ও স্মৃতি সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। মিশরীয় রচনার একদম প্রথম দিককার নিদর্শন হলো হায়ারোগ্লিফিক্স, যেখানে ছিল লোগোগ্রাফিক, সিলেবিক এবং বিভিন্ন বর্ণ উপকরণ। সব মিলিয়ে সহস্রাধিক ধরনের বর্ণ বা প্রতীক ছিল তাদের বর্ণমালায়।

কুমিরের মমি

কুমিরের মমি; Image Source: Wikimedia Commons

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের মাঝামাঝি সময়কালে রচিত ৪৫টি ব্যক্তিগত নথি পাওয়া গেছে, যেখান থেকে জানা গেছে কুমিরের মমি সম্পর্কে। অর্থাৎ মিশরীয়রা যে কেবল মানুষেরই মমি তৈরি করত তা নয়। তারা অন্তত পাঁচটি কুমিরের মমিও তৈরি করেছিল, যেগুলো পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

কালি

মিশরীয় কালি; Image Source: Balkan Trading Company

প্যাপিরাসের উপর লিখন পদ্ধতি কখনোই আলোর মুখ দেখত না, যদি না উদ্ভাবন ঘটত কালির। প্রাচীন মিশরীয়রা সবজির আঠা, ঝুল এবং মৌমাছির মোম দিয়ে এক ধরনের কালো কালি তৈরি করত।

পরবর্তীতে অবশ্য তারা ঝুলের পরিবর্তে অন্যান্য বিভিন্ন উপকরণ যেমন লাল গিরিমাটির ব্যবহারও শুরু করেছিল, যার মাধ্যমে কালোর বদলে তারা অন্যান্য বিভিন্ন রঙের কালিও তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল।

ষাঁড় চালিত লাঙ্গল

লাঙ্গল; Image Source: Wikimedia Commons

ষাঁড় চালিত বিশেষ ধরনের লাঙ্গলের আগমন ঘটে সেই খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালেই। সেগুলো নির্মিত হতো ব্রোঞ্জ দিয়ে, যে কারণে খুব সহজেই হাল চালিয়ে জমিকে চাষের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হতো।

চাষিরা তখন লাঙ্গল চালিয়ে মাটিকে সারি সারি করে সেখানে বিভিন্ন বীজ বপন করে দিত। এভাবেই নীল নদের তীরে উর্বর মাটিতে প্রাচীন মিশরীয়রা গম এবং বিভিন্ন শাকসবজি ফলাতে পারত।

মিশরীয় কাস্তে

কাস্তে; Image Source: UCL

মিশরীয়রা এক ধরনের বিশেষ ধারালো ফলাযুক্ত কাস্তে তৈরি করেছিল, যা ব্যবহৃত হতো গম, বার্লি প্রভৃতি ফসল ফলাতে ও কাটতে।

খাল ও সেচ খনন

প্রাচীন মিশরীয়দের কৃষিকাজ; Image Source: Historical Eve

প্রাচীন মিশরীয়রাই কৃষিকাজে খাল ও নালা খনন ও সেচ ব্যবস্থার উদ্ভাবক ছিল। এভাবে তারা নীল নদের পানি বহু দূরের চাষের জমিতেও নিয়ে যেতে পারত। এছাড়া তারা খাল ও নালা মুখে দরজাও তৈরি করেছিল, যাতে করে তারা পানির ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। হোঁজ বা জলাধারও তাদেরই অবদান, যাতে করে খরা মৌসুমের জন্য পানি সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব হয়।

ক্যালেন্ডার

পূর্বাকাশে লুব্ধকের উদয়ের উপর ভিত্তি করে মিশরীয়রা প্রায় নিখুঁত একটি সৌর বর্ষপঞ্জি গঠন করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, লুব্ধক উদয়ের সময়েই নীল নদে বার্ষিক বন্যা হতো। মিশরীয় এই বর্ষপঞ্জিতে এক বছর সমান ৩৬৫ দিন ছিল, এবং তা ১২টি মাসে বিভক্ত ছিল।

প্রাচীন মিশরীয় বর্ষপঞ্জি; Image Source: Experience Ancient Egypt

প্রতি মাসে সাধারণত ৩০ দিন করে থাকত, যদিও প্রতি বছর পাঁচটি করে অতিরিক্ত উৎসবের দিন সংরক্ষিত থাকত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এক সৌর বর্ষ সমান ৩৬৫.২৫ দিন, যে কারণে ধীরে ধীরে মিশরীয়দের বর্ষপঞ্জিটি তার নির্ভুলতা হারায়। অবশ্য পরবর্তীতে তৃতীয় টলেমি এ সমস্যার সমাধান করেন। টলেমাইক বর্ষপঞ্জিতে প্রতি চার বছর অন্তর ৩৬৫ দিনের সাথে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়।

ঘড়ি

সূর্য ঘড়ি; Image Source: iStock

মিশরীয়রা তাদের বিখ্যাত অবেলিস্ক বা স্মারক স্তম্ভকে ব্যবহার করত সান ডায়াল হিসেবে, অর্থাৎ এর মাধ্যমে দেখা হতো দিনের বিভিন্ন সময়ে স্তম্ভটি কীরূপ ছায়া দিচ্ছে। এর মাধ্যমেই প্রাচীন মিশরীয়রা বছরের সবচেয়ে বড় ও ছোট দিন নিরূপন করতে পারত।

গ্লাস

রঙিন গ্লাস; Image Source: Walls with Stories

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের আগেই মিশরীয় কারিগররা নানা রঙের গ্লাস ও পানি রাখার পাত্র তৈরি করতে থাকে। তারা পাত্রটিকে আকৃতি প্রদান করত সিরামিক সদৃশ কাঠামোর চারদিকে উষ্ণ ও রঙিন কাঁচের প্রলেপ দিয়ে। এরপর তারা পাত্রটিতে হাতল ও বেড় লাগাত, এবং ঠাণ্ডা হয়ে এলে কাঠামোটি খুলে ফেলত।

আসবাব

আসবাব; Image Source: The Met

প্রাচীন মিশরীয়রা বিভিন্ন আসবাব তৈরির প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করে। প্রাথমিকভাবে তারা টেবিল তৈরি করেছিল কোনো জিনিস মাটি থেকে কিছুটা উপরে রাখার জন্য। এরপর তারা টেবিলকে কাজে লাগাতে থাকে খাবার খাওয়া ও নানা ধরনের খেলার কাজে। সেনেট নামের বোর্ড গেমটির উল্লেখ পাওয়া যায় সেই খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালের একটি হায়ারোগ্লিফে।

টুথপেস্ট

প্রাচীন মিশরীয়দের দাঁতের মাজনের ব্যবহার; Image Source: Realm of History

দাঁতের মাজনও প্রাচীন মিশরীয়দের উদ্ভাবন। তারা ষাঁড়ের খুরের চূর্ণ, ছাই, পোড়া ডিমের খোলস ও ঝামা পাথর দিয়ে এক ধরনের মাজন তৈরি করত। এছাড়া পরবর্তীতে তারা আরো শ্রেয় স্বাদের একটি রেসিপি উদ্ভাবন করেছিল, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল পাথুরে লবন, পুদিনা, শুকনো আইরিশ ফুল ও মরিচ।

এ মাজনটির জন্য তারা যে বিজ্ঞাপন দিত, তাতে লেখা হতো, “সাদা ও নিখুঁত দাঁতের জন্য পাউডার”। অর্থাৎ একুশ শতকে যে ধরনের বিজ্ঞাপনী ভাষা ব্যবহৃত হয়, তা-ও হাজার হাজার বছর আগে ব্যবহার করে গেছে প্রাচীন মিশরীয়রা!