যেসব নিয়মকানুন মেনে ওষুধ সেবন করতে বলা হয়, বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই সেই নিয়মকানুন ও পরিমাণ মেনে চলা সম্ভব হয় না। কয়েকটি ওষুধ সেবন করার পর ভালো বোধ করলেই ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন অনেকে। অনেকে আবার ভুলে যান ওষুধ খাওয়ার নির্ধারিত নিয়ম এবং সময়ের কথা। একবার ওষুধ শেষ হয়ে গেলে আবার ওষুধ কেনার ব্যাপারটিও মাথায় রাখেন না অনেকে।

আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটি খুব স্বাভাবিক কিছু মনে হলেও, এর ফল ভোগ করতে হয় দীর্ঘদিন ধরে। ওষুধ নিয়ম মেনে সেবন করলেই যে সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যেতো, সেখানে প্রচুর টাকা খরচ করতে হয় তাকে। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক নানা সমস্যায়ও ভুগে থাকে মানুষ এই অবহেলার কারণে।

নানারকম ওষুধ সেবন করে বিরক্ত? Image Source: ajp.com.au

এ তো গেলো ওষুধ সেবনে অবহেলা করার কথা। অনেক রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ কষ্টকর হয় যেমন ডায়াবেটিস, অস্টিওপোরোসিস ইত্যাদি রোগে রোগীকে ইনজেকশন ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় ওষুধ রোগীর নানারকম সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান করে।

এই সমস্যাগুলো থেকে রোগীকে দূরে সরিয়ে তাকে সুস্থ রাখতেই এবার আনা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে একজন রোগী ওষুধ সেবনের কথা ভুলে গেলেও ঠিকই ওষুধ তার কাজ শুরু করে দেবে রোগীর শরীরে।

সম্প্রতি ‘সায়েন্স’ এর একটি গবেষণায় এমন একটি ক্যাপসুলের কথা জানানো হয় যেটি রোগীর শরীরে নিজ থেকেই ওষুধ প্রবেশ করাতে পারবে নির্দিষ্ট সময়ে। এক্ষেত্রে পেটের টিস্যুর উপরের ধাপে ওষুধ প্রবেশ করানো সম্ভব হবে।

এক পরীক্ষায় সহজে গলঃধকরণযোগ্য (সোয়ালেবল), নিজ থেকে কাজ করতে পারা (সেলফ ওরিয়েন্টিং), মিলিমিটাল স্কেলে কাজ করা (মিলিমিটার-স্কেল অ্যাপ্লিকেটর) বা সোমা (SOMA) নামক এই ক্যাপসুলটি ব্যবহার করে শূকরের শরীরে ইনসুলিন প্রবেশ করানো হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ চিকিৎসা নিতে ভয় পায় বা দেরি করে। কারণ এতে ইনজেকশন ব্যবহারের দরকার পড়ে। এই পদ্ধতিতে এমন কোনো সমস্যাই পোহাতে হয় না।

এই নতুন প্রক্রিয়াটির ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এগিয়েছেন মূলত দুইটি ব্যাপারের উপরে ভিত্তি করে। প্রথম ব্যাপারটি হচ্ছে, পেটের আলসারের ক্ষেত্রে ‘অ্যাড্রেনালিন ইঞ্জেকশন’ ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে এটা জানা যায় যে, কোনো রোগীর পেট পর্যন্ত ওষুধ পৌঁছানো গেলে, সেটি পুরো শরীরে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারে। তবে ক্যাপসুলটি আসলেই কাজ করবে কিনা এবং পেটের নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত পৌঁছে কাজ করা শুরু করবে কিনা সেটা নিয়েই চিন্তিত ছিলেন সবাই।

প্রকৃতি থেকেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজে পান গবেষকেরা। এক্ষেত্রে গবেষকেরা দ্বিতীয় ব্যাপারটি খুঁজে পান। আর সেটি হলো লোপার্ড টরটয়েজ। আকৃতিতে বিশাল হলেও এই কচ্ছপেরা নিজেদের সূচালো খোলসের কারণে ইচ্ছা হলেই উল্টো হয়ে যেতে পারে। এখান থেকেই ক্যাপসুলের আকৃতিতে কচ্ছপের খোলসের আকৃতি ব্যবহারের কথা ভাবা হয়।  

নতুন এই ক্যাপসুলটির নাম সোমা; Image Source: www.wokv.com

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা চিনির আস্তরণে মোড়া একটি ওষুধের মধ্যে এক মিলিগ্রাম ইনসুলিন ভর্তি করেন। পিলটি পেটের কাছাকাছি পৌঁছতেই পেটের দেয়ালে নিজের অবস্থান করে নেয়। সেখানকার তরল ও অন্যান্য পদার্থ ওষুধটিকে ভেঙ্গে ফেলে এবং সাত মিলিমিটারের এক সুঁই ইনজেকশন ওষুধকে শরীরের সাথে মিশিয়ে দেয়।

এর কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন, আদতে এই পদ্ধতি কাজ করে কিনা। তাদের দুশ্চিন্তাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গবেষণাটি পুরোপুরি সফল হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবার এই ওষুধের পরিমাণ বাড়ানোরও চিন্তা করছেন তারা।

নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলোজির সহকারি অধ্যাপক অমৃতা ব্যানার্জি এই পুরো প্রক্রিয়াটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, সাধারণত মুখের মাধ্যমে শরীরে নেওয়া ওষুধ সবচাইতে সহজ এবং উপকারী। এটি গ্রহণের জন্য কোনো রোগীকেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না। তবে এই মুখ দিয়ে খাওয়ার ওষুধগুলোর আকার একটু বড় হলে সেটি ইনসুলিন, টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি হলে সেক্ষেত্রে ব্যাপারটি জটিল হয়ে যায়।

অনেক সময় দেখা যায় যে, ওষুধ পেট পর্যন্ত পৌঁছে রক্তে মেশার আগেই ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যায়। তবে সোমা’র ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি এর নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে তবেই কাজ শুরু করবে।  

এক্ষেত্রে আপনাকে আর সময় মেনে ওষুধ সেবন করতে হবে না; Image Source: familydoctor.org

অন্যদিকে, ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি এ ব্যাপারে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। তারা এমন একটি ওষুধ তৈরির কথা জানিয়েছেন, যেটি পেটের ভেতরে যাওয়ার পর একটি পিং পং বলের আকার ধারণ করবে। আর তারপর সেখান থেকেই মাসব্যাপী নির্দিষ্ট সময় পরপর ধীরে ধীরে ওষুধ নিঃসরণ করবে। এই ধারণাটিও বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন প্রকৃতি থেকে।

পাফার ফিশ ভয় পেলেই নিজেদেরকে ফুলিয়ে ফেলে। এই চিন্তা থেকেই দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির কথা ভাবেন তারা। একটি বহিরাবরণ তৈরি করবে এবং অন্যটি তরল শুষে নেবে এবং প্রবেশের ১৫ মিনিটের মধ্যেই নিজের আকৃতির ১০০ গুণ বাড়িয়ে তুলবে; এই দুটোকে একসাথে করে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন তারা।

খুব তাড়াতাড়িই হয়তো এই পদ্ধতি হাতে পাবেন আপনিও; Image Source: i2.wp.com

ভাবছেন, একবার পেটের ভেতরে ওষুধ প্রবেশ করলে সেটা কীভাবে বের করে আনা যাবে? খুব সহজ। এক্ষেত্রে, ওষুধ শরীর থেকে বের করতে হলে রোগীকে হাইড্রোজেল গ্রহণ করলেই হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই এই ওষুধ নিয়ে কাজ করা শুরু হয়েছে। আপনিও যদি এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অপেক্ষাটা আর খুব বেশি দিনের নয়। হয়তো খুব তাড়াতাড়িই বাংলাদেশেও হাতের কাছেই পাওয়া যাবে এই অসাধারণ পদ্ধতিটি।