স্থাপত্য বা আর্কিটেকচার বিশ্বের সবথেকে সৃজনশীল পেশাগুলোর একটি। নতুন ধারণা, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সম্মিলিত প্রয়োগে এটি সর্বদা পরিবর্তিত ও বিকশিত হতে থাকে। এখনই চারপাশে কত নিত্য নতুন নকশার আকাশচুম্বী ভবন, নান্দনিক শৈলীর জাদুঘর, স্তম্ভ, ঘরবাড়ি দেখে বিমোহিত হই, তাহলে ভাবুন আরও ১০০ বছর পরে স্থাপত্যকলা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে।

তবে কিছু মানুষ আছে যারা আর ১০ জন সাধারণ মানুষ থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে কল্পনা করতে পারেন। অনেক মেধাবী মানুষ যেমন আছেন যারা প্রথাগত দুনিয়ার বাইরে নতুন কিছু ভাবতে পারেন, তেমনি অনেক সৃজনশীল স্থপতিও আছেন যারা এই ভাবনাকে সুন্দর করে সাজিয়ে বাস্তবে উপস্থাপন করতে পারেন। আজ আমরা তেমনই ৫টি স্থাপত্য প্রকল্পের কথা জানব যেগুলো বর্তমান প্রেক্ষিতে আপাত অসম্ভব মনে হলেও কিছু স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষের কল্যাণে আমরা একদিন বাস্তবে দেখতে পাবো।

১. অ্যাকোয়ারিয়া, ভাসমান শহর

অ্যাকোয়ারিয়া নামের প্রকল্পটির নকশা করা হয় রিও ডি জেনিরো শহরের উপকূলীয় এলাকার সাগরের মধ্যে একটি শহর বানানোর কথা মাথায় রেখে। শহরটি এমন ভাবে নকশা করা হয়েছে যেন এটি নিজের প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিদ্যুৎ ও পানি পুনঃ নবায়ন করে নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। এই সাহসী প্রকল্পটি বেলজিয়ান স্থপতি ভিনসেন্ট ক্যাললেবটের মস্তিষ্কপ্রসূত। এর ডোম আকৃতির ভবনগুলো ঘনসন্নিবেশিত অবস্থায় ভাসমান থাকবে এবং প্রতি ফ্লোরে বনায়ন করা হবে।

অ্যাকোয়ারিয়া; Image Source: Dezeen

এই গাছগুলো তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে পানি থেকে। সাগরের লোনা পানি প্রক্রিয়াজাত করে সুপেয় করে পুরো শহরে সরবরাহ করা হবে। আর এর ভিতরের ভবন গুলোতে যাতায়াতের জন্য খাল থাকবে। শুধু আকাশচুম্বী ভবন আর পরিবেশের কথা ভেবেই এটি বানানো হয়নি, এখান থেকে রিও ডি জেনিরোর মন মাতানো সাগরের দৃশ্য আর অপরূপ সূর্যাস্তও মন ভরে দেখা যাবে।

২. বায়ো-পিরামিড

এই বিনোদন মূলক কমপ্লেক্সটি বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে কায়রো শহর এবং পিরামিডগুলোর মাঝে। যদিও বিনোদন মূলক বলা হচ্ছে তবুও এর বিশাল আকার এবং নকশা যেকোনো মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। আমাদের বর্তমান পৃথিবী ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। মরুকরণের শিকার হয়ে সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে।

বায়ো-পিরামিড; Image Source: eVolo

এরই মাঝে এই বায়ো-পিরামিড পৃথিবীর সব থেকে বড় মরুভূমির মাঝে সবুজের জয়গান গাইবে। এর নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যেন পিরামিডের ভিতরে সব সময় সবুজ গাছপালার আচ্ছাদন থাকবে। কে জানে বহু যুগ আগের বানানো পিরামিড যেমন এখনো আমাদের মনে বিস্ময় জাগায় তেমনি এই বায়ো-পিরামিডও হয়ত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনন্ত বিস্ময় হয়ে থাকবে।

৩. ইকোরিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়া জাতীয় ইকোলজিকাল ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে প্রায় ৩৩০০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে এই ইকোরিয়াম প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি অনন্যসাধারণ জায়গা হবে মূলত এর কীলক আকৃতির গ্রিনহাউজগুলোর জন্য। এটি মূলত একটি গবেষণাগার হবে যেখানে পরিবেশগত নানা দিক নিয়ে গবেষণা করা হবে। এর কেন্দ্রীয় ভবনগুলো এমন ভাবে নির্মাণ করা হবে যেন বাইরের পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে ভিতরের পরিবেশ পরিবর্তিত হয়।

ইকোরিয়াম; Image Source: Archinect

এতে প্রচুর পরিমাণে শক্তি বেঁচে যাবে। আমরা যদি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা তাপমাত্রা আর এই তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে বা পরিবেশ শীতল রাখতে যে পরিমাণ শক্তি খরচ করি তার হিসাব করি এবং বিদ্যুতের দাম হিসেবে রাখি তাহলে ইকোরিয়ামের মত আধুনিক নকশা আমাদের ভবিষ্যতের ভবন নির্মাণের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

৪. কোবরা টাওয়ার, কুয়েত

ইন্টারনেট দুনিয়ার সবথেকে আলোচিত স্থাপত্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম এই কোবরা টাওয়ার প্রোজেক্ট। কুয়েতে ২০৩০ সাল নাগাদ এই গগনচুম্বী অট্টালিকা বানানোর পরিকল্পনা আছে। এই টাওয়ারটির উচ্চতা হবে ১ কিলোমিটার বা ৩২৮০ ফুট। বিশাল এই ভবনটি দেখলে মনে হবে অতিকায় দুটি সাপ একে অন্যকে পেঁচিয়ে ধরে উপরে উঠে গেছে।

কোবরা টাওয়ার; Image Source: Tech and Facts

তবে শুধু উচ্চতা বা এটি দেখতে কেমন হবে তা নিয়েই যে মাতামাতি চলছে এমনটি না, এর লিফটগুলো কিভাবে কাজ করবে সেটি নিয়েও অনেক জল্পনা কল্পনা আছে। এর আকারের জন্যই প্রথাগত লিফট এখানে কাজ করবেনা। সেক্ষেত্রে হয়ত টিউবের মধ্যে দিয়ে সংকুচিত বায়ু দ্বারা এই সকল লিফট কাজ করবে। তাই বলা যায় এই টাওয়ারটি শুধু উচ্চতার কারণে না, সৌন্দর্য এবং নতুন প্রযুক্তির কারণেও এই অট্টালিকা আমাদের মুগ্ধ করবে।

৫. ডুবো হোটেল

বিনোদনের ক্ষেত্রে চাহিদার কোন সীমা পরিসীমা নেই। আমাদের গাঁটের পয়সা বের করে নেবার জন্য নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে হাজির হচ্ছে বিনোদন ব্যবসায়ীরা। আমরাও চাই পয়সা যখন খরচ করবই তাহলে কাটানো সময়টাও যেন মনে রাখার মত হয়। এরকমই একটি নতুন ধারণা ডুবো হোটেল মানে পানির নিচে হোটেল।

“১০৩ ইন্টারন্যাশনাল” থেকে স্থপতিদের একটি দল এই আন্ডারওয়াটার রিসোর্ট প্রকল্পটি তৈরি করেছে। এর আকারটাও নেহায়েত কম না। প্রায় ৮০০০০ বর্গমিটার। এটির রুমগুলো থাকবে পানির নিচে। রুমের চারদিকে থাকবে পানির চাপ সহনশীল কাঁচের জানালা, যেখান থেকে আপনি আক্ষরিক অর্থেই “সী ভিউ” পাবেন। এটির বিনোদন কমপ্লেক্স বা রেস্টুরেন্টের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

ডুবো হোটেল; Image Source: Buzzativ!

খেতে খেতে আপনি দেখতে পাবেন মাথার উপরে কাঁচের বাইরে দিয়ে জলজ্যান্ত হাঙর সাঁতার কাটছে। তবে আপনি যদি প্রথাগত ভ্রমণকারী হন তাহলে আপনার জন্যও পানির উপরে হোটেলটির একটি অংশ রয়েছে।