ছোটবেলায় যখন সায়েন্স ফিকশান পড়তাম তখন বিজ্ঞানের আপাত জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে যে বিষয়টি মাথায় গেঁথে গিয়েছিল সেটি হলো রোবট। রোবটগুলো ছিল বুদ্ধিমান এবং অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের আবেগ অনুভুতি বুঝতে পারতো। সেসব রোবট সিনেমা বা বইয়ের পাতা থেকে মর্ত্যে নেমে আসতো শুরুতে বেশ জবরজং অবস্থায়। সামান্য ট্যাঁ ফ্যো করতে পারে আর কিলিয়ে পিটিয়ে একটি নির্দিষ্ট কাজ শেখানো যায়।

তারপর দুনিয়ার তাবৎ বিজ্ঞানীরা আদাজল খেয়ে নামলো কিভাবে এই যন্ত্রমানবকে সেই বইয়ের গল্পের মতো শিখিয়ে পড়িয়ে বুদ্ধিমান বানানো যায় যেন আমরা শুয়ে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে তাকে কিছু করতে বললেই সে ‘জি হুজুর’ ভাব নিয়ে সেটা করে ফেলবে। অর্থাৎ আমরা বাসায় একটি যান্ত্রিক কাজের লোক চাই বা অফিসে একটি যান্ত্রিক সহকারী চাই বা বাস ট্রেনের ড্রাইভিং সিটেও একটা যান্ত্রিক ড্রাইভার চাই।

আমাদের কল্পনার রোবট; Image Source: spectrum.ieee.org

যা-ই হোক, আমাদের কল্পনা ছিল আমাদের কাজ সহজে আর নির্ভুল ভাবে করে দেবার জন্য মনুষ্য অবয়বের একটি যন্ত্র দরকার যাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে সে পরিস্থিতি বুঝে নিজেই সব কাজ করতে পারবে। আর সেই লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা বেশ ভালই অগ্রসর হলেন। ঠিক তখন কিছু বুদ্ধিমান মস্তিস্কের মাথায় ঝিলিক দিল; আরে, আমরা গাড়ি চালানোর জন্য সিটে একটি প্রমাণ সাইজের বুদ্ধিমান রোবট না বসিয়ে আস্ত গাড়িটাকেই বুদ্ধিমান করে ফেলি না কেন?

কিংবা ময়লা কাপড় ধোয়ার জন্য রোবট না বানিয়ে স্বয়ং ওয়াশিং মেশিনটাকেই কেন রোবট বানাচ্ছি না? যেই ভাবা সেই কাজ। আস্তে আস্তে আমাদের চারপাশের জিনিসগুলোকে বুদ্ধিমান করে তোলার চেষ্টা শুরু হলো। কিন্তু তখনও ব্যাপারটা ছিল বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত। কারণ একটি বুদ্ধিমান যন্ত্র থেকে সর্বোচ্চ উপযোগ পাবার উপায় হচ্ছে অন্য বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলোর সাথে এর যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। যেন ন্যুনতম নির্দেশনা নিয়েই এরা কাজটা করে ফেলতে পারে বা তার পরের যন্ত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠাতে পারে।

এর জন্য দরকার একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বা নেটওয়ার্ক। আর এটিকেই বলা হচ্ছে ইন্টারনেট অব থিংস বা সংক্ষেপে আইওটি (IoT)। এতক্ষণে অরিন্দম কহিলো বিষাদে! আজ্ঞে হ্যাঁ, এটিই এই ফিচারের আলোচ্য বিষয়। চলুন, জানার চেষ্টা করা যাক, আইওটি কী, কীভাবে এলো, এর দৌড় কতটুকু, কিংবা এর ভাল মন্দ দিকগুলো কী কী।

ইন্টারনেট অব থিংস; Image Source: jssstepnoida.org

আইওটি কী?

এতক্ষণে মোটামুটি সবাই বুঝে গেছেন যে, ইন্টারনেট অব থিংস আসলে কী আর অনেকে ইতোমধ্যে গোঁফে তা দেয়াও শুরু করে দিয়েছেন যে, এই মক্কেলের লেজ ধরে কী কী করে ফেলবেন সেই চিন্তা করে! পুরো ব্যপারটা কায়দামতো হজম এখনো না হলেও এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেল যে, এই বস্তু কাজের। মোটা দাগে বলতে গেলে সামনে যা পাবো সেটার মধ্যে ইন্টারনেট জুড়ে দেয়া।

লে হালুয়া! এটা কেমন কথা? যা পাবো তার মাঝে ইন্টারনেট জুড়ে দেব? ডেস্কটপ, ল্যাপটপ এমনকি হালের মোবাইলেও না হয় ইন্টারনেট জুড়ে দেওয়া গেল, তাই বলে টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনেও? তাও না হয় ঢোক গিলে মেনে নিলাম কিন্তু সবকিছু মানে কি জামাকাপড় বা জুতাতেও? কিংবা আরামের বিছানাতেও?

উত্তরটা হচ্ছে হ্যাঁ। বর্তমানের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে যদি সুদূর ভবিষ্যতে দৃষ্টি রাখি তাহলে এর উত্তর হবে, হ্যাঁ, সবকিছুতেই। আইওটি এর আসল লক্ষ্য ব্যবহার্য সবকিছুকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের ভেতরে নিয়ে এসে সিনক্রোনাইজ করা যাতে একটি থেকে আরেকটি যন্ত্র তথ্য উপাত্ত নিয়ে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে এবং অন্য যন্ত্রের কাছে তথ্য এবং নির্দেশনা পাঠাতে পারে। কিন্তু এত বুক চাপড়ানোর কিছু নেই। আপনার ডাটা যেন চোর ছ্যাঁচড়ে হাতিয়ে না নেয় সেজন্য কিছু মানুষ রাত দিন এক করে ফেলছেন।

আপন ঘর হোক আইওটি অ্যাপ্লিকেশন সমৃদ্ধ উন্নত ঘর; Image Source: medium.com

মোদ্দা কথা, একটি বস্তু তখন আর কেবলমাত্র একটি বস্তু হিসেবে থাকবে না। কারণ আপনার হাতের ঘড়িটি বা বাসার ফ্রিজটি কেবল আপনার সাথেই সম্পৃক্ত নয়, বরং আশেপাশের আরও অনেক বস্তু আর ডাটাবেজের সাথে যোগাযোগ করে একটি পরিবেষ্টিত বুদ্ধিমত্তা হিসেবে কাজ করবে। আর যেকোনো বস্তুকেই আপনি আইওটি ডিভাইসে পরিণত করতে পারেন যদি সেটা ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারে আর তাকে ইন্টারনেটের মাধ্যমেই পরিচালিত করা যায়।

যদিও চিন্তা অনেক সুদূরপ্রসারী তবে এরই মধ্যে আইওটি এর প্রভাব আমরা বাস্তব জীবনে দেখতে পেতে পারি। যেমন মোশন সেন্সর যুক্ত রাস্তার আলো। আলাদা আলাদা বাতিতে মোশন সেন্সর যুক্ত করে তাকে আমরা স্মার্ট বানাতে পারি বটে কিন্তু বাতিটা একটি নিঃসঙ্গ শেরপার মতোই থেকে যাবে। কোনো কারণে এটি নষ্ট হলে বা ভেঙে গেলে কেউ না দেখা পর্যন্ত এভাবেই পড়ে থাকবে, কিন্তু যদি আইওটি এর মাধ্যমে হাজার হাজার সেন্সর যুক্ত বাতির নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় তাহলে যেমন বিদ্যুতের অপচয় রোধ করে সারা শহর আলোকিত করা যাবে তেমনি সারা শহরে না ঘুরেও এক জায়গায় বসে বলে দেয়া যায় যে সব বাতি কাজ করছে কিনা বা না করলে কোথায় কোনটা কাজ করছে না।  

মোশন সেন্সর যুক্ত রাস্তার আলো; Image Source: mavensystems.com

আজ এতুকুই থাক। কথায় কথায় বেলা হয়ে গেল। সামনে আমরা আইওটি এর ইতিহাস, এর অ্যাপ্লিকেশন, সুবিধা এমনকি অসুবিধা নিয়েও ফিচার করবো।